পীরজাদা বললেন, আপনি তাদের ছেড়ে এসেছেন ২৫ মার্চ। তারা একা একা যুদ্ধ করেছে। তাদের খোঁজ আমরা কেউ নিইনি। তারা সৈন্য চেয়েছে। দিইনি। অস্ত্র চেয়েছে। আমাদের কাছে অস্ত্র নেই।
গুল বললেন, আমাদের ভালো করে একটা চিঠি দেওয়া উচিত ইস্টার্ন কমান্ডকে। আর মালিকের পাছায় একটা লাথি মারা উচিত।
ইয়াহিয়া বললেন, বুড়া মানুষ। ভুলে যাও।
পীরজাদা একটা বার্তা মুসাবিদা করলেন। একটুখানি হুইস্কি পেটে পড়লে তার লেখাটা আসে ভালো। সেটা টাইপ করে ইয়াহিয়াকে দেখানো হলো।
গভর্নরের বার্তার প্রসঙ্গে। তোমরা বিরূপ পরিস্থিতিতে বীরোচিত যুদ্ধ করেছ। জাতি তোমাদের নিয়ে গর্বিত। পৃথিবী মুগ্ধ। মানুষের পক্ষে যা করা সম্ভব আমি একটা সমাধানের চেষ্টায় তা করেছি। তোমরা এখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছ যেখানে আর কোনো প্রতিরোধ গড়া মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এতে কোনো লাভও হবে না। তা শুধু প্রাণহানি আর ধ্বংস ডেকে আনবে। এখন তোমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নাও যাতে সশস্ত্র বাহিনী, পশ্চিম পাকিস্তানি এবং আমাদের অনুগত মানুষদের সবার প্রাণ রক্ষা পায়। এরই মধ্যে আমি জাতিসংঘের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, যাতে তারা ভারতীয় বাহিনীকে বলে পূর্ব পাকিস্তানে হামলা বন্ধ করতে, আর সশস্ত্র বাহিনী ও অন্য লোকদের নিরাপত্তা বিধান করে, যারা দুষ্কৃতকারীদের টার্গেট।
ইয়াহিয়া বার্তাটা দেখলেন। মদে তার নেশা ধরেছে, হাত কাঁপছে। তিনি বললেন, পূর্ব পাকিস্তান গোল্লায় যাক। আমাদের মানুষগুলোকে বাঁচাও। রেকর্ড প্লেয়ারে একটা গান ছেড়ে দাও। গজল…ম্যাডাম নুরির গজল…
.
নিয়াজি, রাও ফরমান আলী আর জামশেদ রহিম ঢাকার হেডকোয়ার্টারের ভূগর্ভস্থ নিরাপদ কক্ষে বসে এই টেলিগ্রামের মানে খুঁজতে লাগলেন! প্রেসিডেন্ট কী বললেন? আত্মসমর্পণ করতে বললেন নাকি না! এদিকে মাথার ওপর আবাবিল পাখির ঢিলের মতো হাজার হাজার লিফলেট নেমে আসছে। পাকিস্তানি সৈন্য ও অফিসাররা, মিলিটারির প্রতি এটা মিলিটারির আহ্বান। সারেন্ডার করো। জেনেভা কনভেনশন অনুসারে তোমাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা দেওয়া হবে।
নিয়াজি বললেন, চলো, আমরা চীনের কূটনীতিকদের কাছে যাই। রাও ফরমান বললেন, ইন্ডিয়া চীনকে একটা পয়সা পাত্তা দেবে না।
বিকেল চারটায় নিয়াজি আর রাও রওনা হলেন তেজগাও-কুর্মিটোলা ক্যান্টনমেন্ট হেডকোয়ার্টার থেকে মতিঝিল আদমজী কোর্ট ভবনের দিকে। আমেরিকার কনসুলেট অফিস।
তারা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন।
হার্বার্ট স্পিভাক সেখানে ছিলেন।
নিয়াজি বললেন, আপনি আমাদের বন্ধু। আমেরিকা পাকিস্তানের অকৃত্রিম বন্ধু। দুঃসময়ের বন্ধুই প্রকৃত বন্ধু।
স্পিভাক বললেন, বলুন আমি আপনাদের কীভাবে সাহায্য করতে পারি?
আপনি জাতিসংঘের মাধ্যমে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করার ব্যবস্থা করুন।
স্পিভাক করুণ মুখে হাসলেন। বললেন, বসুন। আমেরিকা, চীন, রাশিয়া প্রাণপণে ১০ দিন ধরে চেষ্টা করছে যুদ্ধবিরতির। আমাদের প্রেসিডেন্ট, আমাদের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, আমাদের জাতিসংঘ প্রতিনিধি পুরো স্টেট ডিপার্টমেন্ট পারছে না। আমি এখান থেকে জাতিসংঘে কী করতে পারব? আপনারা জাতিসংঘের কাছে যান।
আপনি বুঝতে পারছেন না পরিস্থিতি ভয়াবহ। ঢাকায় রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ হবে। ভারতীয়রা বোমা মেরে পুরো ঢাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করবে। মানুষের জীবন রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য।
স্পিভাক বললেন, আপনারা যুদ্ধ শুরু করেছিলেন কেন? এটা তো একজন বোকাও জানে যে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে আপনারা পারবেন না। পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, এটা তো এক বছর আগে থেকে সবারই জানা।
আমরা আপনার কাছে সাহায্য চাই।
আমেরিকা আপনাদের কোনো রকমের সাহায্য করতে পারবে না। আমি একটা কাজই করতে পারি। আমাদের যোগাযোগ করার যন্ত্র আছে। আপনার বার্তা আমি ভারতীয়দের কাছে পাঠাতে পারি। মনে রাখবেন, এটা হলো শুধু একটা যন্ত্রের ব্যবহার। আমরা কমিউনিকেশন টুল। আমরা যোগাযোগকারী নই। আমরা মধ্যস্থতাকারীও নই। আমার সরকার সেই এখতিয়ার আমাকে দেয়নি।
রাও ফরমান আর নিয়াজি বসে বার্তা তৈরি করলেন। এর আগে রাও যে বার্তা তৈরি করেছিলেন, এটা সে রকমেরই। গভর্নর মালিকের বার্তায় পূর্ব পাকিস্তানের শাসনভার আওয়ামী লীগের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল। এটাতে তা নেই। সব পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য, নাগরিক, সমর্থকদের নিরাপত্তা সাপেক্ষে যুদ্ধবিরতি ছিল বার্তার মূল কথা।
নিয়াজি সই করলেন। রাও সই করলেন। বার্তাটা স্পিভাকের হাতে তুলে দিয়ে তাঁরা চলে এলেন হেডকোয়ার্টারে।
স্পিভাক আমেরিকান কূটনীতিক। তিনি বার্তা সরাসরি ভারতের কাছে পাঠাতে পারেনই না। তিনি পাঠালেন ওয়াশিংটনে। পাঠালেন রাওয়ালপিন্ডিতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডের কাছে।
রাওয়ালপিন্ডিতে ফারল্যান্ড বার্তার কপি পাঠালেন ইয়াহিয়ার কাছে। এটাতে কি প্রেসিডেন্টের সম্মতি আছে? প্রেসিডেন্ট অফিসে ছিলেন না। তিনি তাঁর বিনোদনের জলসায় বসে মদ্যপান করছেন। তাঁর প্রমোদসঙ্গিনীরা তার মাথার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছে। তাদের দিকে তাকানোর মতো জোরও তিনি পাচ্ছেন না। মিসেস শামীম বিদায় নিয়ে যাচ্ছে অস্ট্রিয়ার রাষ্ট্রদূত হয়ে। ব্ল্যাক বিউটি। তার সম্মানে পার্টি।
