রাও বললেন, এত দিন ধরে আমি বাঙালিদের সঙ্গে মিশছি। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি। ঠিক না থেকেই পারে না।
.
১০ ডিসেম্বর রাত ১২টা।
ইত্তেফাক-এর বার্তা সম্পাদক শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, মুজিব যাকে ডাকেন লাল মিয়া বলে, সেই সিরাজুদ্দীন হোসেন কাগজের কাজ সেরে। এসেছেন। খেয়েদেয়ে ঘুমুতে যাবেন, অমনি দরজায় কিসের যেন শব্দ হলো। ভয়ে ভয়ে দরজা খুললেন। দেখলেন, একটা কুকুর শীতে এসে দরজার কপাটে গা ঘষছে।
সিরাজুদ্দীন বললেন, একটা কুকুরকে ভয় পেলাম।
তারপর ঘুমুতে গেলেন। শুভানুধ্যায়ীরা তাঁকে পরামর্শ দিয়েছেন, বাসায় থাকবেন না। এতগুলো ছেলেমেয়ে পুষ্যিদের রেখে তিনি একা কোথায় যাবেন? কোথায় থাকবেন?
রাত তিনটার সময় ঠিক পাশের ফ্ল্যাটে থাকা বাড়িওয়ালা ডাক্তার সাহেব বললেন, শাহীন শাহীন, দরজা খোলো।
দরজায় তখন প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা চলছে। তার ছেলে শাহীনের নাম ধরে কে ডাকছে? সিরাজুদ্দীন উঠলেন। তিনি লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা।
বাড়ির সামনে লাল গাড়ি, কাদালেপা। মুখোশধারী মাংকি টুপিরা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে লোকগুলো বলল, সিরাজুদ্দীন হোসেন নাম তো?
হ্যাঁ।
একটু যেতে হবে।
আমি পাঞ্জাবি পরে নিই।
না, লাগবে না। যেখানে যাবেন সেখানে গরম কাপড় আছে। একটা গামছা হবে বাড়িতে?
ছেলেদের কেউ একজন গামছা এনে দিলেন। ৪২ বছর বয়স্ক সিরাজুদ্দীন তাঁর নাবালক ছেলেগুলোর দিকে তাকালেন। স্ত্রীর দিকে তাকালেন। তিনি চলে গেলে এদের কী হবে?
সিরাজুদ্দীন হোসেনের স্ত্রী কাঁদছেন। ছোট ছোট ছেলেরা কাঁদছে। আটজন ছেলে তার।
তাঁকে মাইক্রোবাসে তুলল আততায়ীরা। রাত তখন তিনটা কি সাড়ে তিনটা। সেই যে সিরাজুদ্দীন হোসেন গেলেন। আর ফিরলেন না।
১১ তারিখ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলল তালিকা ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে আলবদরদের বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক পেশাজীবীদের ডেকে নেওয়া। এই তালিকা অতি দীর্ঘ। বাংলার শ্রেষ্ঠ মানুষদের ধরে নিয়ে গেল ঘাতকেরা। সিরাজুদ্দীন হোসেন ছিলেন ডিসেম্বরের বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের প্রথম শিকার। এরপর নজমুল হক, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, নিজামুদ্দীন আহমেদ, সেলিনা পারভীন, মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার, আনোয়ার পাশা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, রাশীদুল হাসান, ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. ফজলে রাব্বি…বাংলার শ্রেষ্ঠ মানুষগুলো।
মুনীর চৌধুরীর মতো শিক্ষক, নাট্যকার আর কোথায় পাবে বাংলাদেশ?
কোথায় পাবে আনোয়ার পাশার মতো কবি, কথাসাহিত্যিককে?
শহীদুল্লা কায়সারের মতো বড় মাপের সাংবাদিক, সাহিত্যিক তো আর জন্ম নেবে না।
তাঁরা পড়ে রইলেন চোখ বাঁধা, হাত পেছনে বাঁধা অবস্থায় মোহাম্মদপুর, মিরপুরের বিলের পানিতে। গুলিবিদ্ধ…শহীদ…
১০৪
৩ ডিসেম্বরে লাহোরের উত্তর দিকে বাঙালি ইনফ্যান্ট্রি রেজিমেন্টকে নিয়োজিত করা হয়। তাদের চালচলন, মনোভাব বিষয়ে সন্দেহ করলেন জেনারেল শের বাহাদুর। তিনি পাকিস্তানের চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল গুল হাসানকে জানালেন, এই বাঙালি রেজিমেন্টকে সীমান্তে রাখা ঠিক হচ্ছে না। গুল বললেন, ওদের ফেরত পাঠান।
ওরা ওখান থেকেও তো পালিয়ে যেতে পারে?
ওদের পাহারা দিয়ে রাখা যাবে।
বাঙালিদের আর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়নি।
গোটা ব্যাটালিয়ন যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতীয়দের সঙ্গে যোগ দিল। তাদের সহকর্মীরা বাঙালিরা দেশ শত্রুমুক্ত করার জন্য একই কাজ করেছে, ভারতে গেছে, যৌথ কমান্ড গঠন করেছে, আর তারা ভারতীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে না।
.
১৪ ডিসেম্বর গভর্নর ভবন থেকে বেরিয়ে নিয়াজি গেলেন তাঁর হেডকোয়ার্টারে। প্রেসিডেন্টকে তারবার্তা পাঠালেন। আর কোনো উপায় নেই। প্রেসিডেন্ট ভবনের টেলিপ্রিন্টারে একের পর এক বার্তা আসছে। নিয়াজির বার্তা। পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা খারাপ। ঢাকা ডিফেন্ড করার মতো। সৈন্য নেই। অস্ত্র ও রসদ নেই। স্থানীয় মানুষ বৈরী। জীবন ও সম্পদ রক্ষার কোনো উপায় নেই। যুদ্ধবিরতি একমাত্র উপায়। এরপরে একে একে তারবার্তা আসতে লাগল গভর্নরের পদত্যাগের, পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার পদত্যাগের, সেক্রেটারিদের পদত্যাগের…
সেই টেলিগ্রাম বার্তার প্রিন্ট নিয়ে একান্ত সচিব প্রেসিডেন্টের দরজায় গেলেন।
পরিচারককে বললেন, ভেতরে কি যাওয়া যাবে?
.
ইয়াহিয়া মদের পিপে নিয়ে বসলেন। তিনি মদ খাচ্ছেন। আজকের মদটা খুব ভালো। ব্লাক ডগ। এটা খেতে হয় কোনো রকমের বরফ ছাড়া। এখন একটু নুরজাহানের গান শুনতে পারলে ভালো লাগত। নুরজাহানকে কি ডাকা হবে? নাকি ডাকব তারানাকে? নাকি ব্ল্যাক বিউটিকে!
এই সময় তাঁর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার জেনারেল পীরজাদা, চিফ অব স্টাফ জেনারেল হামিদ, চিফ অব জেনারেল স্টাফ গুল হাসান একত্র হয়েছেন। তাদের হাতে ঢাকা থেকে আসা পদত্যাগপত্র আর নিয়াজির এসওএস বার্তা। তাঁরা ঢুকে পড়লেন প্রেসিডেন্টের খাসকামরায়।
এসো হামিদ, এসো গুল, এসো পীরজাদা। একা একা পান করে দুঃখী মানুষ। আমি দুঃখী নই।
পীরজাদা বললেন, পরিস্থিতি খুবই সিরিয়াস। ঢাকার পতন ঘটে যাচ্ছে। আপনার নির্দেশ দরকার।
ইয়াহিয়া বললেন, নিয়াজিকে জানিয়ে দাও, তার নিজের যা মনে হয় তা-ই করুক। উত্তরের বন্ধু, দক্ষিণের বন্ধু কেউ আসবে না। সে যা সিদ্ধান্ত নেবে, তাতেই আমি রাজি…
