বাকি তিনজন পাইলটকে বলা হয়নি। রেডিওতে বলতে পারেন, কিন্তু সবাই শুনে ফেলবে। আগে ঢাকা যাই। তারপর বলব। ওই তিনটা মিগ তো তাকে অনুসরণই করবে।
চারটা মিগ আকাশে উড়ে গেল।
.
ডা. মালিক বললেন, নিয়াজি সাব। পিন্ডি থেকে কোনো খবর এল?
না।
চীন-আমেরিকা থেকে কোনো আশা?
বুলশিট।
তাহলে আমরা কী করব?
নিয়াজি বললেন, আপনি গভর্নর। আপনি যা বলবেন। আপনি বললে, লড়ব। আপনি না বললে বসে থাকব।
উইং কমান্ডার বিস্ময় ঢাকার কাছে এসেছেন। সামনে তাঁর মিগ। তাঁর একটু পেছনে দুপাশে দুইটা। তার পেছনে একটা। একটা ঘুড়ির আকার নিয়েছে চার মিগ।
বিস্ময় বললেন, আমরা সার্কিট হাউস নয়, গভর্নর ভবনে অ্যাটাক করছি। আমাকে ফলো করো।
তারা গভর্নর ভবনের চারপাশে চক্কর মারলেন একবার। বিস্ময় বললেন, আমাদের বাঁ দিকে সেন্টারে যে গম্বুজওয়ালা সুন্দর ভবনটা দেখা যাচ্ছে, ওইটা আমাদের টার্গেট। নেক্সট টার্নের পর আমরা টার্গেটের দিকে যাব।
চারটা মিগ নেমে আসছে। এত নিচে যে মতিঝিলের উঁচু ভবনের জানালা থেকে পাইলটদের স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
তাঁরা ডিআইটির দিকের রাজপথ ধরে গভর্নর ভবনের কাছে গিয়ে রকেট চার্জ করতে লাগলেন।
.
ড. মালিকের মনে হলো, কেয়ামত নেমে এসেছে-ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ আর প্রচণ্ড ঝাঁকুনি, যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে। তার ভবনের নিচে সুড়ঙ্গ আছে। তিনি দৌড়ে সেখানে আশ্রয় নিলেন। মন্ত্রীরা তার পিছু নিল কেউ কেউ। মিলিটারিরা কেউ কেউ ভবনের বাইরে এসে গাছের নিচে দাঁড়ালেন।
রাও ফরমান আলী বললেন, আবার আসছে। সবাই শুয়ে পড়ুন।
অনেক অফিসার সভাকক্ষের টেবিলের নিচে গিয়ে বসলেন।
কেয়ামত বেশিক্ষণ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। গভর্নর হাউসের গম্বুজ আর লাইব্রেরি গুঁড়িয়ে দিয়ে মিগগুলো চলে গেল।
আগুন জ্বলছে।
ডা. মালিক কাঁপতে লাগলেন। নিচের সুড়ঙ্গে বসেই তিনি পদত্যাগপত্র লিখলেন। অন্য অফিসার ও মন্ত্রীরাও পদত্যাগপত্র লিখলেন।
কাঁপতে কাঁপতে তিনি তাঁর কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিলেন, এই পদত্যাগপত্র পিন্ডিতে পাঠাও।
তারপর কপিটা নিয়ে বাইরে এসে ড্রাইভারকে বললেন, গাড়িতে সাদা পতাকা লাগাও। তার পরিবারও এসে গাড়িতে বসল।
তাঁকে অনুসরণ করলেন মন্ত্রীরা, উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। সবাই পদত্যাগ করেছেন।
তাঁরা চললেন শাহবাগে, ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে। সেটা রেডক্রস এলাকা। নিরপেক্ষ জোন। গেটে পদত্যাগপত্র দেখিয়ে তারা ভেতরে ঢুকলেন। ঢাকায় আর কোনো সরকার রইল না।
.
রাও ফরমান আলী তখনো গভর্নর হাউসে। তিনি মালিক সরকারের উপদেষ্টা। এখন কোনো সরকার নেই। এখন তিনি কী করবেন?
তিনি তার ড্রয়ার থেকে বুদ্ধিজীবীদের তালিকা বের করলেন। একবার দেখে নিলেন। সব ঠিক আছে। তিনি ডাকলেন মেজর জেনারেল জামশেদকে। বললেন, আলবদরদের দিয়ে বাকি কাজটা করিয়ে নাও। আমার কথা তো এখন আর কেউ শুনবে না।
জামশেদ বললেন, কাজ ঠিকমতো এগোচ্ছে। ১০ ডিসেম্বর রাত থেকেই শুরু হচ্ছে। জামায়াতের নেতাদের সহযোগিতা খুব মূল্যবান। আলবদরগুলো সাচ্চা সৈনিক। তারা কাজটা করছে সুচারুভাবে। দ্যাখো, এতগুলো লোক নাই হয়ে গেল, কোথাও টু শব্দটি নাই। অথচ ঢাকা গিজগিজ করছে বিদেশি সাংবাদিকে।
জামশেদ চলে গেলেন।
জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে রাও ফরমান আলীর কথা হলো। তাদের তিনি বললেন, মেজর জেনারেল জামশেদ বাকি কাজটুকু দেখভাল করবে। কোনো সাপোর্ট লাগলে তাকে বলবে। আমি আর গভর্নরের সঙ্গে থাকছি না। হেডকোয়ার্টারে আমার কিছু জরুরি কাজ আছে।
ওরা বলল, কাফের কতল করার কাজে আমাদের ইমানই আমাদের বড় শক্তি। তারপরও কিছু লাগলে নিশ্চয়ই বলব। ইসলামের শত্রুদের নিশ্চিহ্ন না করে আমাদের ক্ষান্তি নাই।
১০৩
কাদালেপা মাইক্রোবাসগুলো ডিসেম্বরের শেষ দিনগুলোতে ছুটছে। মুখোশ পরা একদল হিংস্র মানুষ তার আরোহী। তাদের পরনে কালো পোশাক। কারও-বা সাদা পোশাক। তাদের মাথায় কানঢাকা মাংকি টুপি। তারা বাংলায় কথা বলে। প্রত্যেকের হাতে অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্র।
তারা একটা তালিকা ধরে এগোচ্ছে। তাতে পাকিস্তানের শত্রুদের নাম আর তাদের ঠিকানা দেওয়া আছে। এই শত্রুরা কেবল পাকিস্তানের শত্রু নয়, তারা ইসলামের শত্রু। তারা নামে মুসলমান। কিন্তু কেউবা আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। কেউবা কমিউনিস্ট। প্রত্যেকেরই একটা দোষ অভিন্ন, প্রত্যেকেই ইন্ডিয়ার দালাল। পাকিস্তানকে ভাঙতে চায়। মুক্তিদের সাহায্য, সহযোগিতা করে। তাদের বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। আলবদরদের নেতারা বলেছেন, আলবদর মানেই হলো একটা বিশ্বাস। একটা টর্নেডো। সেই টর্নেডো এখন বয়ে যাবে এই কাফেরগুলোর ওপর দিয়ে।
১০ ডিসেম্বর পিলখানায় আসেন জেনারেল রাও ফরমান আলী খান, মেজর জেনারেল জামশেদ খান। নিয়াজির কাছ থেকে অর্ডার পেয়েই তারা কাজে নেমেছেন।
তারা তত্ত্বাবধান করতে আসেন, সবকিছু ঠিক আছে কি না। রাও ফরমান দেখেন, অনেকগুলো কাদালেপা মাইক্রোবাস।
আজ রাত থেকেই তাহলে শুরু হচ্ছে অপারেশন? রাও জানতে চান।
জামশেদ বলেন, আজ থেকে শুরু হবে। প্রথমে সাংবাদিকদের ধরা হবে। তারপর আস্তে আস্তে অন্য বুদ্ধিজীবীদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া হবে ১৪-তে। তোমার তালিকা ঠিক আছে তো?
