হ্যাঁ। মোশতাক সাহেব এবং চাষী–এদের ওপরে নজর রাখতে হবে।
১০২
গভর্নর ডাক্তার মালিক জরুরি সভা ডেকেছেন। তাঁর মন্ত্রীরা আছেন, পুলিশের আইজি, তাঁর প্রধান সচিব, সামরিক উপদেষ্টা জেনারেল রাও ফরমান আলী খান। তারা অপেক্ষা করছেন জেনারেল নিয়াজির জন্য।
নিয়াজি এলেন দরবার হলে। তাকে খুবই চিন্তিত দেখাচ্ছে।
তিনি আশা করেছিলেন চীন আর আমেরিকা থেকে সৈন্য আসবে। তারা যুদ্ধে যোগ দেবে।
কিন্তু সেই সাহায্য আসার কোনো নাম নেই। ঢাকা রক্ষার মতো তাঁর হাতে কোনো ফোর্স নেই। পুলিশ, রাজাকার, ইঞ্জিনিয়ার কোর, ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্স, আলবদর মিলিয়ে কুড়িয়ে-কাড়িয়ে ৫০০০ জন হয়। এদের হাতে অস্ত্র নেই। অস্ত্র থাকলে গোলা নেই। একজনকে রিকোয়েললেস রাইফেল দেওয়া হয়েছে। সে গুলি ভরতে গিয়ে দেখল, গুলি ভিন্ন অস্ত্রের। একজনকে এলএমজি দেওয়া হয়েছে। সে দেখল, এটা আসলে অকেজো। মর্টারের বোমা আছে, কিন্তু কোনো সাইট নেই। নিয়াজি ব্রিগেডিয়ার বকরকে বলেছেন, একটা ব্রিগেড ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় আনতে। বকর কুমিল্লায় ব্রিগেডিয়ার আতিফকে বললেন, ঢাকায় চলে আসো, চিফের অর্ডার। আতিফ আসে নাই। নিয়াজি বললেন, আতিফ আসতে চায় না কেন? বকর বলল, ঢাকায় এসে মরতে চায় না সে। ভৈরব থেকে মেজর জেনারেল কাজিকে আসতে বলা হলো। তিনি বললেন, নদী পার হতে পারছি না। যমুনার অপর পার থেকে মেজর জেনারেল নজর হোসেনকে একটা ব্রিগেড সৈন্য পাঠানোর জন্য বার্তা পাঠানো হলো। এক ব্রিগেড সৈন্যকে তিনি ছাড়লেন। কিন্তু তারা নদী পার হবে কী করে?
মেজর জেনারেল জামশেদকে ডাকলেন নিয়াজি। দেখো, যেকোনো জায়গা থেকে একটা ব্রিগেড আনতেই হবে।
জামশেদ জামালপুর, ময়মনসিংহকে বললেন, ঢাকায় সৈন্য পাঠাও।
ব্রিগেডিয়ার কাদির একমাত্র লোক যিনি কথা শুনলেন। ঢাকার দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। কিন্তু রাস্তায় মুক্তিবাহিনী তাকে বন্দী করেছে।
এই সময় ব্রিগেডিয়ার বকর পরামর্শ দিলেন, ঢাকায় আমরা স্ট্রিটফাইট করব।
তখন আরেকজন বললেন, ঢাকার রাস্তায় বের হলে বাঙালি সাধারণ মানুষই পিটিয়ে ভর্তা করে ফেলবে।
মেজর জেনারেল রহিম ছিলেন চাঁদপুরে। সেখান থেকে পালিয়ে আসার সময় আহত হন। এসে আশ্রয় নেন গভর্নর ভবনে। রাও ফরমান আলীর পাশের রুমে। তাকে দেখতে গেলেন নিয়াজি।
নিয়াজি তাঁকে বললেন, ঢাকা আমরা রক্ষা করতে পারব তো? কী বলো।
রহিম বললেন, না। একমাত্র উপায় হলো যুদ্ধবিরতি করা। জামশেদ। খান, রাও ফরমান আলীও ছিলেন। তাঁদের সবার মত দাঁড়াল, মুক্তিবাহিনীর হাতে পড়ে সবাই মিলে মারা পড়ার কোনো মানে হয় না। রাওয়ালপিন্ডিকে তারবার্তা পাঠাতে হবে।
নিয়াজি বললেন রাওকে, এখান থেকে বার্তা পাঠাও।
রাও বললেন, না। হেডকোয়ার্টার থেকে পাঠান। চিফ সেক্রেটারি মোজাফফর এসে বললেন, এটা কোনো ব্যাপার না। এখান থেকে পাঠানো যা, ওখান থেকে পাঠানো তা।
মোজাফফর যুদ্ধবিরতির বার্তা মুসাবিদা করলেন। নিয়াজি চলে এসেছেন সেখান থেকে। যুদ্ধবিরতির কথা বলার দায়িত্ব তিনি নেবেন না।
সেই প্রস্তাব রাওয়ালপিন্ডিতে গেছে। উত্তর আসেনি।
এখন গভর্নর তাদের ডেকেছেন। এ অবস্থায় করণীয় কী জানতে।
.
গভর্নর ঢাকার সব গুরুত্বপূর্ণ লোককে নিয়ে বৈঠক করছেন, এই খবর ভারতের গোয়েন্দারা পাঠিয়ে দিল ভারতের কাছে। জেনারেল জ্যাকবের কাছে সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্সের প্রধান কর্নেল পি সি ভল্ল ছুটে এসেছেন। জরুরি খবর। ঢাকার গভর্নর হাই অফিশিয়ালদের নিয়ে বৈঠক করবেন।
তখন বাজে সাড়ে ৯টা। বৈঠক বসার কথা ১১টায়। জেনারেল জ্যাকব সঙ্গে সঙ্গে জানালেন ইস্টার্ন জোনের বিমানবাহিনীর সিনিয়র স্টাফ অফিসার এয়ার ভাইস মার্শাল দেবরকে। তিনি তখন শিলংয়ে। শিলংয়েই তাদের বিমানবাহিনী হেডকোয়ার্টার। জরুরি বার্তা। ১১টার মধ্যে ঢাকায় সার্কিট হাউসে বোমা ফেলতে হবে। ওখানে হাই লেভেল বৈঠক বসবে।
একই বার্তা মুক্তিবাহিনী পাঠাল র-কে। র জানাল ইন্দিরা গান্ধীকে। ইন্দিরা গান্ধী ফোন করলেন বিমানবাহিনীর প্রধানকে। পি সি লাল। তোমার সামনে সুবর্ণ সুযোগ। গভর্নর তাঁর নীতিনির্ধারকদের নিয়ে বসতে যাচ্ছে ঢাকায়। কী করবে করো।
বিমানবাহিনীর ইন্টেলিজেন্স অফিসার ছুটল অপারেশন রুমে। উইং কমান্ডার বিস্ময়কে জানাল হেডকোয়ার্টারের আদেশ।
১১টার মধ্যে ঢাকায় সার্কিট হাউসে বোমা ফেলতে হবে।
বিস্ময় ঘড়ি দেখলেন। এখন বাজে ১০টা। ঢাকা যেতে লাগবে ২১ মিনিট। প্লেন রেডি করতে হবে। রকেট ভরতে হবে।
তিনি চিফ অপারেটিং অফিসারকে নির্দেশ দিলেন, চারটা মিগ ২১ লোড করো। প্রতিটায় ৩২টা করে উচ্চক্ষমতার বিস্ফোরক ভরো।
বিস্ময় বললেন, সার্কিট হাউস কোনটা?
একটা টুরিস্ট ম্যাপ আনা হলো ঢাকার। সার্কিট হাউস চিহ্নিত করা হলো। বিস্ময় তিনজন পাইলটকে ডেকে নিলেন। তাঁদের দেখালেন, এই হলো সার্কিট হাউস। আমরা ১১টার মধ্যে সেখানে যাচ্ছি আর অ্যাটাক করছি।
তারা দৌড়ে প্লেনে উঠলেন।
সিঁড়ি দিয়ে উঠে দেখলেন দরজায় একটা কার্ড ঝুলছে। সার্কিট হাউস নয়, গভর্নর ভবন।
ওকে। আগে ঢাকা যাই। তিনি ম্যাপ বের করে গভর্নর ভবনটা দেখে নিলেন। ওকে। এটা আরও স্পষ্ট।
