আর একটা কারণ চীন ভারতকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে পুরোপুরি ঠেলে দিতে চায়নি। হুয়াং হুয়ার সঙ্গে হেইগের আলাপের আগের দিন ইন্দিরা গান্ধী চৌ এন লাইকে চিঠি পাঠান। তিনি লেখেন, আমরা চীনের বন্ধুত্ব চাই। আপনি কি আপনার সঙ্গে ইয়াহিয়াকে বোঝাতে পারেন না যে বাঙালিদের অধিকার তাদের দিতে হবে?
তিন নম্বর কারণ : চীন মনে করেছে, যা-ই হোক না কেন, বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকানো যেত না। সপ্তম নৌবহর তাদের ভরসা দেয়নি। তারা। দেখেছে, তাকে ঘিরে রেখেছে সোভিয়েত যুদ্ধতরি।
গ্যারি জে ব্যাস তাঁর বই ব্লাড টেলিগ্রাম-এ বলেছেন, চীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুদ্ধে যেতে রাজি ছিল না। লাখ লাখ সোভিয়েত সৈন্য চীনে ঢুকে পড়ছে, এটা তারা কল্পনাও করতে পারছিল না।
হাসান ফেরদৌস মুক্তিযুদ্ধে সোভিয়েত বন্ধুরা বইয়ে জানিয়েছেন, চীন সোভিয়েত সীমান্তে চীনা সেনা ছিল ১২ ডিভিশন, সোভিয়েত সৈন্য ছিল ৯০ ডিভিশন।
শ্রীনাথ রাঘবন আরও দুটো কারণ অনুমান করেছেন, চীনের যুদ্ধে না যাওয়া নিয়ে। এক. চীন তো যেকোনো জাতীয় মুক্তি আন্দালনকে সমর্থন করতে প্রকাশ্যে অঙ্গীকারবদ্ধ। চীন বিভিন্ন দেশে যেসব বিদ্রোহ বা মুক্তি আন্দোলনকে সমর্থন করে, তার চেয়ে বাঙালিদের সংগ্রাম অনেক বেশি। জনসমর্থিত ছিল। চীন বাঙালিদের মধ্যে তার যে অবস্থান ছিল, তা নষ্ট করতে চায়নি। তারা ভুলে যায়নি যে, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আওয়ামী লীগের নেতা, পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে প্রথম চীন সফর করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে এসেছিলেন তরুণ শেখ মুজিব–সে ১৯৫৬ সালের কথা। চৌ এন লাই ঢাকা সফরে এলে তাকে যে সংবর্ধনা দেওয়া হয়, তার নেতা ছিলেন শেখ মুজিব, তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তা চৌ এন লাইয়ের ভুলে যাওয়ার কথা নয়। তার ওপরে মওলানা ভাসানী পিকিংপন্থী, আরও একটা পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি আছে, ইয়াহিয়া খানের সৈন্যদের নৃশংস আক্রমণের শিকার তারাও হয়েছে।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, শেখ মুজিব ১৯৫২ সালে প্রথম চীন যান। বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে। সেইখানে তিনি ভাষণ দিছিলেন বাংলায়। চীনারা তার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে। সেইটা জয় বাংলা পত্রিকায় ৯ জুলাই ১৯৭১ আবার ছাপায়া দেওয়া হয়।
ব্যাঙ্গমি বলে, আর মওলানা ভাসানী ইন্ডিয়াতে যাওয়ার আগে-পরে মাও সে তুংরে বড় বড় চিঠি লেখছিলেন বাংলাদেশকে সমর্থন দেওনের অনুরোধ কইরা।
.
সুতরাং চীন মার্চের পরেই সিদ্ধান্ত নেয় যে তারা এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান চায়, সামরিক সমাধান নয়।
১০১
মুজিবনগরে খন্দকার মোশতাক আর তার মন্ত্রণালয়ের অব্যাহতিপ্রাপ্ত সচিব ব্লু আয়েড বয় মাহবুবুল আলম চাষীর ষড়যন্ত্র শেষ হয় না।
মোশতাক দাঁত খিলান করতে করতে ভাবতে লাগলেন, এইটা কোনো কথা! তাজউদ্দীনের মতো একটা লোক প্রধানমন্ত্রী। আর তাঁর নেতৃত্বে মুজিবনগর সরকার একটা যুদ্ধ কইরা বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে চলে গেল! আর এত দিন ধরে শেখ মুজিবের সঙ্গে থেকে, জেল খেটে, শেখ মুজিবের সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও তিনি, মোশতাক কিছুই করতে পারলেন না। এখন শেখ মুজিব যদি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে আসেন, তাঁর সামনে মোশতাক দাঁড়াবেন কী করে? বলবেনটা কী? তাজউদ্দীন তো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবেন। দুই নম্বর হলো : ইন্ডিয়া আর রাশিয়ার সমর্থন অংশগ্রহণ নিয়ে দেশ স্বাধীন হবে? তিনি বেঁচে থাকতে কমিউনিস্ট আর হিন্দুদের সহযোগিতা নিতে হচ্ছে। আমেরিকার মধ্যস্থতার মাধ্যমে জিনিসটা করা গেলে কি তাঁর নিজের এক জীবনের আদর্শ ও মতবাদের প্রতি ন্যায়বিচার করা হতো না!
তিনি ডাকলেন মাহবুবুল আলম চাষীকে। আমেরিকার কানেকশন কী হলো? তারা কি মধ্যস্থতা করে যুদ্ধ বন্ধ করে মুজিবকে মুক্ত করে তার হাতে ক্ষমতা দিয়ে দিতে পারে না?
মাহবুবুল আলম কলকাতার কনসুলেটের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন। তাঁরা একটা প্রস্তাব খাড়া করলেন। মাহবুব ছুটলেন সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে। প্রস্তাবটা হলো, বাংলাদেশ সরকার বলছে, যদি এই মুহূর্তেই শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করে দেওয়া হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশ যুদ্ধবিরতিতে যাবে।
সৈয়দ নজরুল বললেন, কী ব্যাপার মাহবুব?
স্যার আপনাকে একটা বিবৃতিতে সাইন করতে হবে।
কী বিবৃতি। সাথে কলম তো নাই। কলম আমার কাছে আছে স্যার।
বিবৃতিটা কী?
বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তি। তা যদি হয় তাহলে আমরা যুদ্ধবিরতি করব। বাকিটা বঙ্গবন্ধু নিজে ঠিক করবেন। আমরা তাঁর নির্দেশ মোতাবেক স্বাধীনতা অর্জন করব। সব দিক থেকে ভালো হবে।
সৈয়দ নজরুল বললেন, যুদ্ধ হচ্ছে যৌথ কমান্ডে। আমি কী করে বলি আমি যুদ্ধবিরতি করব। রাখেন দেখি বিবৃতিটা।
সৈয়দ নজরুল বিবৃতিটা নিয়ে নিজে উঠে গেলেন তাজউদ্দীনের কাছে। এটা দেখেই তাজউদ্দীনের চোখমুখ লাল হয়ে গেল!
কই পেলেন এই স্টেটমেন্ট?
মাহবুবুল আলম চাষীর কাছে।
সর্বনাশা উদ্যোগ। এটা থামাতে হবে। দেশ শত্রুমুক্ত হওয়া এখন সময়ের ব্যাপারমাত্র।
চাষী তো সপ্তম নৌবহরের কথা বলে।
আমার সঙ্গে দিল্লির যোগাযোগ আছে। ইন্দিরা গান্ধী এসবে ভীত নন।
ঠিক আছে। আমি মাহবুবুল আলম চাষীকে থামাব।
