আরে না না। একদম মনোবল হারাবে না। চীন আসছে। আমেরিকা আসছে। ভারতীয়রা কাপুরুষ। তারা ইঁদুরের গর্তে লুকাবে।
কিন্তু যদি আসে তখন আমাদের কে বাঁচাবে? ওদের হাতে ইজ্জত হারানোর চেয়ে মৃত্যুই কি উত্তম নয়?
ও মৃত্যু নিয়ে চিন্তা কোরো না। যদি মুক্তি আসেই তার আগেই আমরাই তোমাদের মেরে ফেলব। ততগুলো গুলি এখনো আমাদের হাতে আছে।
.
তিনি দমাদম মাস্ত কালান্দার গাইতে গাইতে গাড়িতে উঠলেন। এবার তিনি যাবেন এয়ারপোর্টে। ওখানে বিমানবিধ্বংসী কামান নিয়ে সদাসতর্ক আছে। কয়েকজন সৈনিক। তিনি তাদের কাছে গেলেন। বললেন, তোমাদের দৃষ্টি কোথায়?
তারা বলল, আকাশে।
না। শুধু আকাশে তাকালে হবে না। মাটিতেও তাকাতে হবে। কারণ শত্রু শুধু আকাশ দিয়ে আসতে পারে তা-ই নয়। তারা তো স্থলপথেও আসতে পারে। শোনো, তোমাদের কাছে নিজেদের অস্ত্র আছে তো। সেটাও রেডি রেখো। এমন তো হতে পারে, হাতাহাতি লড়াই। বুঝতে পেরেছ?
ইয়েস স্যার।
ভয় পেয়ো না। চীনারা আসবে। তারা প্যারাট্রুপার নামাবে। জাহাজ রওনা দিয়ে দিয়েছে। আমেরিকান সৈন্যরা আসছে। আর দুটো দিন।
তাঁরা গাড়িতে ওঠার জন্য এয়ারপোর্টের রাস্তার দিকে হাঁটতে লাগলেন।
এয়ারপোর্টে ভিড় করে আছেন বিদেশি সাংবাদিকেরা। এঁদের মধ্যে একটা সাদা লোক গায়ে একটা কমলা রঙের জামা পরে হাতে একটা মাইক্রোফোন। ধরে আছেন। নিয়াজিকে দেখেই তিনি দৌড়ে এলেন। আরও সাংবাদিকেরা ছুটে এলেন তাঁর পিছু পিছু।
নিয়াজি বললেন, সিদ্দিক!
ইয়েস স্যার।
আমার কি এই সুযোগ নেওয়া উচিত নয়? এরা আমাদের সম্পর্কে অনেক মিথ্যা রটনা ছড়িয়েছে। ওদের কিছু সত্য জানানো কি উচিত নয়?
ইয়েস স্যার।
তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে হাত নাড়লেন। হ্যালো জেন্টলমেন…
একজন সাংবাদিক বললেন, ইন্ডিয়া বলছে তারা ঢাকার প্রবেশদ্বারে চলে এসেছে। আসলে তারা কত দূর?
আমি তো কোনো ইন্ডিয়ান সৈন্য দেখতে পাচ্ছি না। আপনি দেখেছেন? তাহলে নিজে যান আর গজ ফিতা দিয়ে মেপে দেখুন তারা ঢাকা থেকে কত দূরে!
আপনার পরের পরিকল্পনা কী? সারেন্ডার করছেন?
প্রশ্নই আসে না। আমি আমার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করব।
আপনি কি ইন্ডিয়ানদের হাতে ঢাকার পতন রোধ করতে পারবেন?
ঢাকার পতন? অসম্ভব। সেটা যদি হয় আমার লাশের ওপর দিয়ে হতে হবে। আমি বেঁচে থাকতে ইন্ডিয়ানদের ঢাকার আশপাশে ভিড়তে দেব না!
তিনি দৌড়ে গাড়িতে উঠলেন। গাড়িতে উঠে বললেন, তোমাকে কি একটা নার্স জোক বলতে পারি। একজন সৈনিক গুলি খেয়ে অচেতন। একটা নার্স তাকে সেবা করছে। লোকটার কম্বল তাঁবু হয়ে যেতে লাগল…
তিনি সেনা সদর দপ্তরের মাটির নিচে তার আশ্রয়ে গিয়ে ঢুকলেন।
সেনা সদর দপ্তর থেকে, গভর্নরের দপ্তর থেকে যোগাযোগ করা হলো চীনা উপদূতাবাস আর আমেরিকান কনসুলেটের সঙ্গে। তোমরা নাকি আমাদের পাশে এসে যুদ্ধ করবে? কত দূর আছে তোমাদের সৈনিকেরা? দুই দূতাবাসের কূটনৈতিকেরা বলল, আমরা এই ধরনের কথা তোমাদের মুখ ছাড়া আর। কোথাও শুনিনি।
ঢাকা থেকে পিন্ডিতে আধঘণ্টা পরপর ফোন করা হলো। আমাদের বন্ধুরা কখন আসছে?
খুব তাড়াতাড়ি।
এক দিন যায়। দুই দিন যায়। চীনারা আসে না। আমেরিকা আসে না।
আবার ফোন। খুব তাড়াতাড়িটা কত তাড়াতাড়ি?
আর ছত্রিশ ঘণ্টা।
কত ছত্রিশ ঘণ্টা গেল। কই কেউ তো আসে না।
ব্যাঙ্গমা বলে, আসলে চীন সিদ্ধান্ত নিয়া রাখছিল তারা এই যুদ্ধে জড়াইব না।
ব্যাঙ্গমি বলে, হ। তারা জাতিসংঘে বড় বড় কথা বইলা নিন্দা করা ছাড়া আর কিছুই করতে রাজি আছিল না।
কিসিঞ্জার হুয়াং হুয়াকে যুদ্ধে জড়ানোর যে আহ্বান জানাইছিলেন, তার। জবাবে হুয়াং হুয়া হেইগকে পিকিং থাইকা আসা বার্তা পইড়া শোনান। চীন বলে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আবার বৈঠক ডাকুক। আমরা জোর কইরা যুদ্ধবিরতি করাইতে চাই। সৈন্য প্রত্যাহার করাইতে হইব। হেইগ কইলেন, তোমাদের কিসিঞ্জার অনুরোধ করছে সৈন্য পাঠাইতে, তোমরা এইটা কী কও? হেইগ বলে, আমারে পিকিং যা বার্তা পাঠাইছে তার বাইরে আমি কী কমু। মানে বুঝেন না? বোকা নাকি। আমরা রাশিয়ার লগে যুদ্ধ করুম না।
.
চীনারা কথা বলতে পছন্দ করে প্রবাদ দিয়ে। হুয়াং হুয়া বলেন, যদি পুবে আলো না ফোটে, নিশ্চয়ই পশ্চিমে আলো আসছে, যদি দক্ষিণে আঁধার আসে, নিশ্চয়ই উত্তরে আলো ফুটছে।
.
ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমি বলাবলি করে, এটার কারণ কী? শ্রীনাথ রাঘবন তাঁর বই ১৯৭১: গ্লোবাল হিস্ট্রি অব দ্য ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ-এ এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছেন। কেন চীন যুদ্ধে জড়াল না! তার হিসাবে রাঘবন। বলছেন :
১. ১৯৬৯ সালে চীনের পিপলস রিপাবলিক আর্মিতে মাও সে তুংয়ের নিজের ক্ষমতা পাকা করার লড়াই শুরু হয়। ১৯৬৮ ও ১৯৬৯ সালে চীন-সোভিয়েত যুদ্ধের পর মার্শাল লিন বিয়াও, ভাইস চেয়ারম্যান, ১০ লাখ সৈনিক, ৪০০০ যুদ্ধবিমান, ৬০০ যুদ্ধজাহাজ সমবেত করেন। মাও দেখলেন, এত বড় ঘটনার হুকুম কেবল তিনিই দিতে পারেন। তার মানে লিন তাঁকে মানছেন না। লিন এবং অনুসারীদের মাও বলেন আত্মসমালোচনা করতে। ১৯৭১ সালের মে মাসে কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় লিন অনুপস্থিত থাকেন। জুলাই মাসে চৌ এন লাইয়ের কাছে মাও লিনের বিরুদ্ধে অনেক কথা বলেন। আগস্ট, সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এ মাও দক্ষিণ চীনে সফর করে লিনের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ঘোষণা করতে থাকেন। লিনের ছেলে, বিমানবাহিনীর এক কর্তা, মাওকে খুন করার একটা ছেলেমানুষি পরিকল্পনা করে ব্যর্থ হন। লিন পালিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে উড়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা নেন। তাঁর প্লেন যখন মঙ্গোলিয়ার ওপরে, চৌ এন লাই বলেন, প্লেনটা উড়িয়ে দেব কি না। মাও বলেন, বৃষ্টিকে পড়তেই হয়, বালিকাদের বিয়ে করতেই হয়, এই ধরনের ঘটনা ঘটবেই, তাদের যেতে দাও। কিন্তু লিনের প্লেন মঙ্গোলিয়াতেই ভেঙে পড়ে। সম্ভবত তেল ফুরিয়ে গিয়েছিল। এরপর মাও সেনাবাহিনী থেকে লিনের সহযোগীদের ধরে ধরে বিচার করতে শুরু করেন। এই অবস্থায় তাদের রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করার অবকাশই ছিল না।
