রেনু দেয়াল টপকে নিজেদের বাড়িতে গিয়েছিলেন। দরজা সিলগালা করে দিয়ে গেছে। তিনি এ-ঘর ও-ঘরের বারান্দা দিয়ে ভেতরে তাকিয়েছিলেন। কামালের ঘরের জানালার কাঁচ নেই। কাঁচের গুড়া পড়ে আছে বারান্দায়। তিনি ভেতরে খুব ভালো করে খেয়াল করে দেখছিলেন। না, কোথাও কামাল নেই। তিনি মেঝেতে বিছানায় ভালো করে তাকালেন। কোথাও লাশ পড়ে নেই তো! এই চিন্তা করার সঙ্গে সঙ্গে শরীর-মন অবশ। হয়ে গিয়েছিল। না, লাশের মতো কিছু দেখা যায়নি। রক্তের দাগও না। শুধু ২৫ মার্চ রাতের রক্তচিহ্নগুলো শুকিয়ে কালো হয়ে ছিল নিচতলায়। নতুন করে রক্তপাত ঘটেনি এ বাড়িতে।
.
কামাল কোথায় গেল? এই দুর্ভাবনা অক্টোপাসের মতো রেনুকে চারপাশ থেকে জাপটে ধরে থাকে। মোরশেদ মাহমুদের বাসার ড্রয়িংরুমে সোফায় রাসেলকে কোলে করে বসে আছেন তিনি। ওদের বাঁধাছাদা, তৈরি হওয়ার ব্যস্ততার দিকে একবারের জন্য অসহায় দৃষ্টি মেলে ধরে নিজের ভাবনার জগতে ডুবে থাকেন রেনু। এত উদ্বেগ, এত অনিশ্চয়তা, এত আতঙ্ক। মাথা ঠিক রেখে কোনো কিছু চিন্তাও তো করা যাচ্ছে না।
খোকা গাড়ি নিয়ে এসেছেন, ভাবি, ওঠেন।
ভাইয়েরা, তাহলে আসি। মোরশেদ মাহমুদের বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে মমিনুল হক খোকার গাড়িতে উঠলেন রেনু, জামাল, রাসেল।
রেনু বললেন, কামাল বেঁচে আছে না মরে গেছে, কিছুই জানি না। তোর কি মনে হয় ভাইডি, কামাল বেঁচে আছে তো, তাই না?
খোকা বললেন, আল্লাহকে ডাকেন ভাবি। নিশ্চয়ই বেঁচে আছে।
রেনু বললেন, আবদুলকে বলেছি বানরটাকে আর গরুগুলোকে ছেড়ে দিতে।
জামাল বললেন, আবদুল গরু ছেড়ে দিয়েছে। বানরটাকেও ছেড়ে দিয়েছে। বানরটাকে আমরা আমাদের সাথে আনতে পারতাম।
রেনু বললেন, মানুষই বাঁচে না আর বানর। ছেড়ে দিলে বানরটা হয়তো বাঁচবে। আমাদের সাথে থাকলি না-ও বাঁচতে পারে।
গাড়ি চলছে। ঢাকার রাস্তায় মানুষ বনপোড়া হরিণপালের মতো দৌড়াচ্ছে। যে যেখানে পারছে, সরে যাচ্ছে।
জামাল বললেন, চাচা, আমরা কই যাব?
মমিনুল হক খোকার স্টিয়ারিংয়ে এক হাত, গিয়ারে আরেক হাত, তিনি বা হাতটা শূন্যে নেড়ে বললেন, জানি না রে। একটা কাজ করতে পারি। রহমানের বাসা যেতে পারি। ১৫ নম্বরে থাকে।
রেনু বললেন, বশীরের ওখানে?
মমিনুল হক খোকা মাথা নাড়লেন, জি ভাবি।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, এইহানে আমরা বানরটার কথা খানিক কইয়া লইতে পারি।
ব্যাঙ্গমি বলল, হ। তা তো পারিই।
ব্যাঙ্গমা বলল, শেখ মুজিবের বাড়ির সাথেই আরেকটা বাড়ি আছিল, জাপানি কনসাল জেনারেলের বাড়ি। তার নাম আছিল হিগাকি। হিগাকি তো ২৫ মার্চ-২৬ মার্চের গোলাগুলির মধ্যে পইড়া ভ্যাবাচেকা খাইছেন। একটাই সুবিধা আছিল, বউ-বাচ্চারে আগেই জাপান পাঠায়া দিছিলেন। ২৭ তারিখে কারফিউ তুইলা দিলে তিনি উঁকিঝুঁকি মারা শুরু করলেন। ৬৭৭ নম্বর বাড়ি থাইকা শেখ সাহেবরে ধইরা নিয়া গেছে, এইটা তিনি খোঁজখবর পাইলেন নিজের বাড়ির কাজের লোক, ড্রাইভার, নানাজনের কাছ থাইকা।
এইবার তিনি ছাদে উইঠা শেখ সাহেবের বাড়ি আগাগোড়া নিরীক্ষণ করলেন। গুলির খোসা তার বাড়ির ছাদেও পাওয়া গেল। শেখ সাহেবের বাড়ির পায়রাগুলো উড়তাছে, ছাদে বসতাছে, সানশেডে বসতাছে, তারা তাগো মালিকরে খুঁজতাছে। আহা! রোজ শেখ সাহেব কবুতরগুলারে খাইতে দিতেন। হিগাকি নিচে তাকাইলেন। গরুগুলা নাই। ওই ওইখানে বাথানে গরু বান্ধা থাকে। ওই চাড়িতে গরুগুলান পানি-খইল খায়। হঠাৎ তার চোখে পড়ল একটা বাঁদর। একটা সানশেডে বইসা অসহায়ভাবে তাঁর দিকে চায়া আছে।
তিনি কইলেন, আবুল কাশেম। একটা কাজ করো। ওই বানরটা শেখ সাহেবের বড় প্রিয় ছিল আমি জানি। না খেতে পেয়ে বানরটা মারা যাবে–এটা আমি চাই না। ওকে আমাদের মেহমান করে নিয়ে এসো।
চৌকিদার আবুল কাশেম তাই করল। দুটো পাকা কলা (দুদিন আগে কেনা, পাইকা গইলা গেছে) হাতে নিয়া দেয়াল টপকায়া নাইমা গেল পোড়োবাড়ি ৬৭৭-এ। বানরটার দিকে আবুল কাশেম কলা বাড়ায়া ধরতেই সে দুই লাফে সানশেড থাইকা নাইমা আবুল কাশেমের বাড়ায়া ধরা হাতে বসল।
এরপর থাইকা বানরটা জাপানি কনসাল জেনারেল হিগাকি সাহেবের কাছেই থাইকা যায়। মেহমান হিসেবে বানরটা ভালোই খাতির-যত্ন লাভ করে।
ব্যাঙ্গমি বলল, কিন্তু হিগাকি সাহেব জানেন না, তার বাড়ির ভিতরে একটা তেঁতুলগাছ আছিল, ভীষণ ঝাঁকড়া তেঁতুলগাছ, তার তলাটা আছিল ঘন অন্ধকার, সেই অন্ধকার গাছের নিচে আরও আরও গাছপালা, লতাগুল্মের মধ্যে দুই ঘণ্টা নিজেরে লুকায়া রাখছিলেন শেখ কামাল। নিজের বাড়িতে যাওনের পর যখন মিলিটারির গুলির মধ্যে পড়লেন, তিনি লাফায়া দোতলা থাইকা প্রথমে একতলার ছোট ছাদে নামেন। সেইখান থাইকা আরেক লাফ দিয়া নামেন গ্যারেজের ছাদে। তারপর আরেক লাফ দিয়া রান্নাঘরের চাল। সেইখান থাইকা আরেক লাফ দিয়া তিনি নামেন জাপানি কনসালের বাড়ির ভিতরে। সেইখানে তেঁতুলগাছের গায়ের সাথে গা লাগায়া তিনি বইসা থাকেন টানা দুই ঘণ্টা। তখন মাথার ওপর দিয়া শা শাঁ কইরা গুলি উইড়া যাইতাছে।
.
মমিনুল হক খোকা গাড়ি ঘোরালেন ধানমন্ডি ১৫ নম্বর সড়কের ক্যাপ্টেন বশীর রহমানের বাড়ির গেটের দিকে। গেটে দারোয়ান ছিল, উঁকি দিল, খোকা গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে দিলে দারোয়ান তাকে চিনতে পারল, লোহার গেট ঠেলে খুলে দিল। খোকা গাড়ি বাড়ির ভেতরে নিলেন।
