তুলসী ফ্লেভার ম্যাম। পরিচারক বললেন।
গুড। আমি তুলসী চা-ই পছন্দ করি। তুমি এখন এই ঘর থেকে যাও।
ইন্দিরা হেসে বললেন, সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। চীনা হস্তক্ষেপ হওয়ামাত্রই তারা সিয়াংকি এলাকায় ঢুকে পড়বে।
আরেক মন্ত্রী বললেন, সপ্তম নৌবহর আসছে। আমরা পিন্ডি থেকে ঢাকায় পাঠানো একটা বার্তা ইন্টারসেপ্ট করেছি। নিয়াজিকে বলা হয়েছে, উত্তর থেকে হলুদ আর দক্ষিণ থেকে সাদারা আসছে।
ইন্দিরা বললেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন সপ্তম নৌবহরের গতিবিধির ওপরে নজর রাখছে। তারা কসমস নামের নতুন উপগ্রহ থেকে এটাকে ফলো করছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে কথা হয়েছে। তারাও পারমাণবিক অস্ত্র সজ্জিত সাবমেরিন রেডি রেখেছে। সপ্তম নৌবহরের পথ আগলে দেবে।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, সোভিয়েত ইউনিয়নের ১০ নম্বর যুদ্ধ গ্রুপের কমান্ডার ভ্লাদিমির ক্রুগলিয়াকফকে নির্দেশ দেয় নৌযুদ্ধ ইউনিট নিয়ে কাজে নাইমা পড়তে। হুকুম আসে, আমেরিকান নৌবহর য্যান ভারতীয় সামরিক বাহিনীর আশপাশে আসতে না পারে। ক্রুগলিয়াকফ পরে কইবেন, আমগো ক্রুজার আর জাহাজবিধ্বংসী মিসাইলসজ্জিত আণবিক সাবমেরিন মার্কিন নৌবহরের পথে আটকায়া দাঁড়ায়। আমরা মার্কিনদের ঘিরা ফালাই এবং আমগো মিসাইল তাক করি। আমগো লক্ষ্য যেন মিস না হয়, সে জন্য যতটা পারা যায় আমরা তাগো রণতরিবহরের কাছাকাছি চইলা যাই।
ব্যাঙ্গমি বলে, তার মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকা পারমাণবিক অস্ত্র নিয়া মুখোমুখি হইয়া গেল।
.
ইন্দিরা গান্ধীকে এক মন্ত্রী বললেন, যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আসছে একটার পর একটা। সোভিয়েত ইউনিয়নও একই প্রস্তাব দিচ্ছে। আমাদের অবস্থান কী?
ইন্দিরা বললেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা নেবে। তারপর আমরা যুদ্ধবিরতিতে যাব।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন বললেন, কাশ্মীরের খানিকটা দখল নিলে কী হয়?
ইন্দিরা বললেন, না, আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নকে আশ্বস্ত করেছি, অন্য সব দেশকেও আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমরা আগ্রাসনবাদী নই। আমরা শুধু একটা জাতির ন্যায়সংগত সংগ্রামে তাদের পাশে আছি।
.
ভারতের মন্ত্রিপরিষদের এই বক্তব্য কিছুক্ষণের মধ্যেই সিআইএ পাঠিয়ে দিল আমেরিকায়। মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে উপস্থিত থাকেন, এমন ভারতীয়দের মধ্যেই সিআইএর লোক আছে।
৯৯
রিমি আর রিপির দুজন বন্ধু আছে। তাদের পাশের ফ্ল্যাটে থাকে। মিঠু আর সোমা।
তাদের বাবা প্রশান্তকুমার পাল। তিনি রিমি-রিপিদের সঙ্গে গল্প করেন। রিপি ছোটদের মহাভারত পড়ে শেষ করেছে। প্রশান্ত কাকু বলেন, বলো তো, ঘটোৎকচের মায়ের নাম কী?
রিমি বলে, হিড়িম্বা।
মিঠু আর সোমার মা রাধা পাল। তাদের বাড়ি বিক্রমপুর। তিনি বিক্রমপুরের ভাষাতেই কথা বলেন। শুনছ, যশোর তো মুক্ত অইয়া গেল, আমগো মিষ্টি খাওয়াইবা না?
এই ফ্ল্যাটে এসেছেন হাসান ভাই। যশোরে বাড়ি। রিমির আব্দুকে মামা ডাকেন। রিপিদের জন্মের আগে থেকে রিমির আব্দু-আম্মুর পরিচিত। আত্মার সম্পর্ক যে অন্য যেকোনো সম্পর্কের উর্ধ্বে তা রিমিরা তাঁর হাসান ভাইকে দিয়ে জেনেছে। তিনি বাংলাদেশ থেকে এনেছেন টাটকা খবর। মিলিটারির দোজখখানা থেকে মুক্তি পেয়েছেন আজিজ বাগমার চাচু, আর যারা যারা ধরে পড়েছিলেন ২৫ মার্চ রাতে, তাদের সবাই। তবে অত্যাচার নিপীড়নে সবারই মাংস থেঁতলে পচে গেছে। জানা গেল, মুজিব কাকুর বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল যে হাজি মোরশেদ চাচুকে, তাকেও মিলিটারিরা একই বন্দিশালায় রেখেছিল এবং তাকেও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ২৫ নভেম্বর। তিনি ছাড়া পেয়েছেন।
প্রশান্ত কাকু বললেন, যশোর মুক্ত হয়েছে, আমি যশোর যাব। হাসান আমাদের নিয়ে চলুন।
মিঠু সোমা বলল, আমরাও যশোর দেখতে যাব।
আম্মু আমিও যাব, রিপি বলল।
আম্মু আমিও যাব, রিমি বলল।
১১ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভোরবেলা। তখনো অন্ধকার।
আম্মু ডাকছেন, রিমি-রিপি ওঠো। যশোর যাবে না?
রিমি ঘুম থেকে একলাফে উঠে গেল। রিপি উঠতে পারল না।
অন্ধকার থাকতে থাকতেই প্রশান্ত কাকু গাড়ি স্টার্ট দিলেন। পাশে বসলেন হাসান ভাই। পেছনে মিঠু, সোমা, রিমি।
যশোর রোডে দ্রুত যাওয়া কঠিন। দুই ধারে শরণার্থীদের বস্তি। ছইয়ের নিচে, চালার নিচে, পলিথিনের নিচে মানুষ জড়াজড়ি, গাদাগাদি করে পোকামাকড়ের মতো বেঁচে আছে। বেঁচে আছে, কিংবা মারা যাচ্ছে। রিমি চোখ পিটপিট করে মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখছে।
তারা এগিয়ে গেল। একসময় ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়ি, পোড়া বাড়িঘর দেখে তারা বুঝতে পারল এ হলো যুদ্ধের ধ্বংসচিহ্ন।
কোথাও দেখা গেল পাকিস্তানিদের বাংকার। প্রশান্ত কাকু গাড়ি থামালেন। হাসান ভাই এগিয়ে গেলেন ব্যাপার কী দেখতে। এসে বললেন, তোমরা নেমো না। বাংকারের ভেতরে মানুষের লাশ।
একসময় তারা ঢুকে পড়ল যশোর শহরে। রাস্তায় মানুষ আর মানুষ। সবাই স্লোগান দিচ্ছে জয় বাংলা। দোকানে দোকানে উড়ছে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
হাসান ভাইয়ের বোনের বাড়িতে দুপুরে খেল তারা। তারপর আবার বেরিয়ে পড়ল।
হাসান ভাই বলল, রিমি দেখ দেখ মামা যাচ্ছেন।
রিমি দেখল, মানুষের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন আব্দু। পাশে নজরুল কাকু।
যশোর ক্যান্টনমেন্টের দিক থেকে ট্রাকে করে আত্মসমর্পণকারী পাকিস্তানি মিলিটারিদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এক মহিলা চিৎকার করে কাঁদছেন, আমার ছেলেকে ওরা মেরেছে। ওদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? আমাকে দাও। আমি শাস্তি দেব।
