নিক্সন বলে চললেন, যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন এগিয়ে আসে, আর আমরা চুপ করে থাকি। আমরা চিরদিনের জন্য শেষ হয়ে যাব। যদি তারা এগিয়ে আসে, তাহলে আমাদের অ্যাটম বোমা ব্যবহার করতে হবে। তা না হলে আমরা শেষ হয়ে যাব।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, পৃথিবী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি। চীন আক্রমণ করবে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করবে চীন, আর সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে আমেরিকা পারমাণবিক শক্তি ব্যবহার করবে। এই হইল কথা।
.
এর সমস্তটা কিছু ঘটেছে শুধু একটা কারণে। বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ তাদের পছন্দমতো দলকে ভোট দিয়েছিল, তাদের পছন্দমতো একজনকে নেতা নির্বাচিত করেছিল–শেখ মুজিবুর রহমান। শুধু তাঁর সঙ্গে ইয়াহিয়া খান কথা বলবেন না বলে আজ পৃথিবী তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মুখোমুখি।
১২ ডিসেম্বর আমেরিকার নৌবাহিনীর প্রধান পদ থেকে প্রমোশন পাওয়া জয়েন্ট চিফ অব স্টাফদের চেয়ারম্যান টমাস মুরার কিসিঞ্জারকে বললেন, প্রেসিডেন্ট তাকে আদেশ করেছেন আর সে অনুসারে রণতরি রওনা হয়ে গেছে। ভিয়েতনাম থেকে ৭ম নৌবহর মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার মধ্যবর্তী মালাক্কা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। তারা ১৬ ডিসেম্বর বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে পারবে। এরপর তারা ভারত সাগরে পড়বে। যেখানে যেতে বলেন সেখানেই যেতে পারবে। এটা হলো একটা ক্যারিয়ার। চারটা ডেস্ট্রয়ার আছে। একটা ওয়েলার। পানিতে চলার ফোর্স–তিনটা ডেস্ট্রয়ারসহ।
কিসিঞ্জার গেলেন ওভাল অফিসে। প্রেসিডেন্টকে জানালেন, সপ্তম নৌবহর রওনা হয়ে গেছে। আমরা চীনকে বলব এটা যাচ্ছে তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। সংবাদমাধ্যম আর আমেরিকার জনগণকে কী বলব?
আমরা বলব আমরা যাচ্ছি আমেরিকানদের উদ্ধার করে আনার জন্য।
তাহলে বিধ্বংসী অস্ত্রসমেত কেন? হেলিকপ্টারসমেত জাহাজ পাঠালেই হয়। লোকে কি বিশ্বাস করবে?
সেটা পরে দেখা যাবে–নিক্সন বললেন।
কিসিঞ্জার বললেন, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরেকটা ফর্মুলা বের করেছে। ইন্ডিয়া পশ্চিম পাকিস্তানে হামলা করবে না। যুদ্ধবিরতি হবে। বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেব।
না না। এটা হয় না। চীনকে আমরা তখন কী বলব? নিক্সন বললেন, আসলে বাংলাদেশ একটা বাস্তবতা। এটা ঠেকানোর কোনো উপায় আর আমাদের হাতে নেই। ভারতীয়রা পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকছে, পূর্ব পাকিস্তানের লোকেরা তাদের ভালোবাসা দেখাচ্ছে, ফুল দিয়ে বরণ করে নিচ্ছে। আমরা তাহলে কেন এত কষ্ট করছি?
কিসিঞ্জার বললেন, আমরা এত কষ্ট করছি, ১. পশ্চিম পাকিস্তান মিলিটারিকে একেবারে ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে। ২. আমাদের চীনা বন্ধুদের বন্ধু হিসেবে ধরে রাখতে। ৩. পৃথিবীর ভারসাম্য ভেঙে যাওয়াটাকে ঠেকাতে। সোভিয়েত ইউনিয়ন আর তার সাহায্যপ্রাপ্ত একটা দেশ আরেকটা দেশ ভেঙে ফেলবে, আর আমরা কিছুই করব না?
আমরা কী করব?
আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নকে বলব, যুদ্ধবিরতি করতে। কঠোরভাবে বলব।
৯৮
গভর্নর মালিকের হয়ে রাও ফরমান আলী ঢাকার জাতিসংঘের প্রতিনিধি পল মার্কের কাছে তারবার্তা পাঠালেন।
সেটা পল মার্ক পাঠিয়ে দেন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে। জাতিসংঘের মহাসচিব সেটা পাঠালেন নিরাপত্তা পরিষদের সব সদস্যের কাছে :
আমি গভর্নর মালিক বলছি। পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা রাজনৈতিক। এর সমাধানও হতে হবে রাজনৈতিক। আমি মালিক পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের অনুমোদন সাপেক্ষে অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ইচ্ছা অনুসারে সব ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করা হোক। জাতিসংঘকে অনুরোধ করছি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে সহায়তা করতে।
করণীয় :
১. অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি।
২. পাকিস্তানি সৈন্যদের সসম্মানে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরত।
৩. পশ্চিম পাকিস্তানে যেতে আগ্রহী কর্মচারীদের যাওয়ার ব্যবস্থা।
৪. ১৯৪৭ সালের পর পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসকারী সব নাগরিকের নিরাপত্তার ব্যবস্থা।
৫. পূর্ব পাকিস্তানে কারও বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার নিশ্চয়তা।
এই খবর পাকিস্তান মিশন জানতে পারে। ভুট্টো নিউইয়র্কে। তিনি এখন পাকিস্তানের সহকারী প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী পদে ইয়াহিয়া নিয়োগ দিয়েছেন নুরুল আমিনকে। ভুট্টো নিউইয়র্কে এসে হোটেলে ঘুমিয়ে নিলেন খানিকক্ষণ। চোখ মেলে যখন জানলেন, মালিক এই বার্তা পাঠিয়েছে জাতিসংঘের কাছে, তিনি চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু করলেন।
ভুট্টো যোগাযোগ করলেন ইয়াহিয়ার সঙ্গে। নতুন প্রস্তাব দাঁড় করালেন। অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি। পাকিস্তানি সৈন্যদের ফিরিয়ে আনা। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক সমঝোতা বা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথাটা এখানে রইল না।
.
ইন্দিরা গান্ধী মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থিত। তিনি বললেন, আমার কাছে খবর আছে, চীনা সেনাবাহিনী নড়াচড়া করতে শুরু করেছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী বললেন, তা হলে তো চিন্তারই কথা। আমাদের উত্তর সীমানায় দুই ডিভিশন সৈন্য বাড়াতে হবে।
ইন্দিরা গান্ধী হাসলেন। বললেন, জগ বাবু, বিস্কুটটা খেয়ে দেখুন। বেশ পনিরযুক্ত। আমি সব সময় এই ধরনের নোনা বিস্কুট পছন্দ করি। চা কোনটা দিয়েছ?
