.
১০ ডিসেম্বরে নিউইয়র্কের রাস্তায় ছিল তুষার। সকালে আলো ফুটেছে, রাস্তার দুধারে আর বাগানে মাঠে জমা তুষারের ওপরে আলো পড়ে চকচক করছে। চারপাশ।
বিকেলের দিকে রোদ মরে এসেছে।
ওয়াশিংটন ডিসি থেকে উড়ে এসে নিউইয়র্ক নামলেন কিসিঞ্জার। কেউ যেন জানতে না পারে, তিনি নিউইয়র্কে, এই রকম চুপি চুপি চোরের মতো তিনি এসেছেন। কালো কাঁচে ঢাকা গাড়িতে তিনি উঠেছেন কানঢাকা, মাথাটকা ওভারকোট পরে। রোদ মরে এলেও তার চোখে কালো চশমা। যাতে কিছুতেই কেউ জানতে না পারে কিসিঞ্জার এসেছেন নিউইয়র্কে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘে আছেন স্থায়ী প্রতিনিধি জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ। তাঁকে বলা হয়েছে, চুপি চুপি কাউকে না জানিয়ে চলে আসতে আপার ইস্ট সাইডে। এখানে একটা পুরোনো ঝরঝরে ভবনে সিআইএর একটা গোপন বাড়ি আছে। বুশ এসে পৌঁছালেন সবার আগে। তিনি একটা পুরোনো এলিভেটরে উঠলেন। তাঁর মনে হলো, এই এলিভেটরটা না আবার আটকে যায়।
এরপর এসে গাড়ি থেকে নামলেন কিসিঞ্জার, তাঁর দুই সহযোগী, হেইগ আর উনস্টন লর্ড। লর্ড চীন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। এরপর এলেন জাতিসংঘে চীনের প্রতিনিধি হুয়াং হুয়া। জাতিসংঘে ভারতের আগ্রাসন আর একে রাশিয়ার নগ্ন মদদদানের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিতে দিতে তাঁর চোয়ালে ব্যথা হয়ে গেছে।
কিসিঞ্জার ভবনের দেয়ালের দিকে তাকালেন। দেয়ালে চকচকে টাইলস, তাতে নিজেদের মুখ দেখা যাচ্ছে। ছবিগুলোও বেশ আজব। তবে ভবনের গেটে কোনো দারোয়ান নেই। বিল্ডিংয়ে লোকও থাকে কম। কেউ, তিনি আশা করেন, তাকে দেখে ফেলেনি এবং চিনে ফেলেনি। মাও স্যুট পরা একটা চীনা লোক আর কিসিঞ্জার এই বাড়িতে গোপন বৈঠক করছেন, নিউইয়র্কের মানুষেরা এটা জানলে সমূহ ক্ষতি। নিউইয়র্ক টাইমস-এ খবর প্রকাশিত হবে। ডেমোক্র্যাটরা জীবন খেয়ে ফেলবে।
কিসিঞ্জার হুয়াং হুয়াকে বললেন, আমরা পাকিস্তানের পক্ষে। কতটা পক্ষে জানতে চান?
হুয়াং হুয়া চুপ করে রইলেন। কিসিঞ্জার নিজেই বলুক।
কিসিঞ্জার বলে চললেন, আমরা পাকিস্তানে অস্ত্র দিতে পারি না। আইনে বাধা আছে। আমাদের অস্ত্র কোনো তৃতীয় দেশও পাকিস্তানে পাঠাতে পারে না। এটা একেবারেই আমাদের আইনে নিষিদ্ধ। তবু আমরা ইরান, জর্ডান, সৌদি আরবকে বলেছি পাকিস্তানকে অস্ত্র দিতে। জর্ডান থেকে বিমান উড়ে যাচ্ছে পাকিস্তানে।
বুশ প্রমাদ গুনলেন। কিসিঞ্জার সম্ভবত নিজের মনের চাপ নিজে সামলাতে পারছেন না। তা না হলে এসব গোপন কথা চীনকে বলার দরকার কী। এসব না বলেও তো তিনি কাজের কথা বলতে পারেন।
কিসিঞ্জার বললেন, আমরা আমাদের যুদ্ধজাহাজ ওই এলাকায় পাঠাচ্ছি। আমাদের নীতি আপনাদের নীতি এক। আমরা ভারতে সাহায্য পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছি। ভারতের উত্তরে আমাদের রাডার পাঠানোর কথা ছিল। চীনের সুবিধার জন্য আমরা তা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছি। আমরা ভারত সাগরে বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজের বহর পাঠাচ্ছি। কতগুলো বিধ্বংসী জাহাজ পাঠানোর অর্ডার হয়ে গেছে। সোভিয়েত জাহাজবহর আমাদের সঙ্গে একেবারেই তুলনীয় নয়। তারা কিছুই করতে পারবে না।
এইবার কিসিঞ্জার পাড়লেন আসল কথা। আমাদের প্রেসিডেন্ট চায়, চীন যদি মনে করে তাদের নিরাপত্তার জন্য বাইরে থেকে হুমকি আসছে, তাহলে তারা যে পদক্ষেপ নেবে, তার বিরুদ্ধে তৃতীয় কোনো দেশ কোনো রকমের অ্যাকশন নিলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাবে।
হুয়াং হুয়া বলে, আমাদের ওপরে আঘাত আসতে পারে উত্তর থেকে, দক্ষিণ থেকে, পশ্চিম থেকে। দরকার হলে আমরা আবার গেরিলাযুদ্ধে যাব…। তিনি গেরিলাযুদ্ধের উপকারিতা নিয়ে লেকচার দিতে শুরু করলে কিসিঞ্জার বলেন, আমরা চাই চীন ভারতের বিরুদ্ধে সামরিক অ্যাকশন নিক।
হুয়াং হুয়া বুশের উদ্দেশে বললেন, আপনি কি জাতিসংঘে বাংলাদেশের কারও সঙ্গে কথা বলেছেন? বাংলাদেশ শব্দটাকে অবশ্য আমি ভীষণ অপছন্দ করি।
বুশ হাত কচলালেন। হ্যাঁ। আবু সাঈদ চৌধুরী নামের একজন এসেছিলেন। আমি বুঝতে পারিনি। দেখা করার পর বুঝলাম যে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি। আমি আর বেশি কথা বলিনি।
হুয়াং হুয়া যেন সন্তুষ্ট হলেন, আমি বুঝতে পারছি। কিসিঞ্জার বললেন, আমরা বাংলাদেশের কারও সঙ্গে কথা বলি না। বলব। এই দেশকে আমরা স্বীকৃতি দিইনি। স্বীকৃতি দেবও না।
হুয়াং হুয়া বললেন, আমি আপনাদের বার্তা চৌ এন লাইয়ের কাছে এখনই পৌঁছে দিচ্ছি।
কিসিঞ্জার বললেন, বুঝতে পারছেন তো কী চাই (আমরা চাই, চীন ভারতকে আক্রমণ করুক)?
.
ওয়াশিংটন ডিসির ওভাল অফিস। ঝড়ের বেগে ঢুকলেন আলেক্সান্ডার হেইগ। তিনি বললেন, চীনারা খুব জরুরি ভিত্তিতে দেখা করতে চায়।
কিসিঞ্জার মাথার চুল টানতে লাগলেন। এটা তো হওয়ার কথা না। তাদের এখন ভারতকে আক্রমণ করার কথা।
প্রেসিডেন্ট নিক্সন এক গেলাস পানি খেয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে বললেন, হেনরি, চীনারা সত্যি সত্যি সৈন্য পাঠাচ্ছে তো?
এই নিয়ে কোনো প্রশ্নই থাকতে পারে না। তাদের সৈন্য পাঠাতেই
হবে।
নিক্সন হিসাব কষছেন। চীনারা ভারতে আক্রমণ করলে অবশ্যই সোভিয়েত ইউনিয়ন চীন আক্রমণ করবে। তিনি বললেন, চীনারা সৈন্য পাঠাচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যদি পাল্টা আক্রমণ করে, আমরা কী করব? তারপর নিজেই আবার বললেন, আমরা অ্যাটম বোমা প্রস্তুত রাখব, তাই তো তুমি বোঝাতে চাইছ?
