সাদা উর্দি পরা পরিচারক মাথায় সাদা টুপি ট্রে হাতে প্রবেশ করল। চা স্যান্ডউইচ দেওয়া হবে। সঙ্গে আঙুর, কাজুবাদাম।
মোজাফফর ধমকে উঠলেন। তুমি কেন এই সময় এসেছ? তোমার কাছে কেউ চা চেয়েছে?
বেয়ারা বাইরে গেল। তাকে গভর্নরের পিএস জিজ্ঞেস করলেন, ভেতরে কী হচ্ছে?
বেয়ারা বলল, সাহেবরা কান্নাকাটি করতাছে।
মালিক বললেন, জেনারেল সাব, প্রেসিডেন্টকে জানান, যুদ্ধবিরতির ব্যবস্থা করতে। আর দুদিন যুদ্ধ চললে আপনি-আমি কেউ বাঁচব না।
মোজাফফর বললেন, সবচেয়ে বড় কথা, ঢাকার বেসামরিক নারী-পুরুষ মারা পড়বে। পুরো ঢাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে।
নিয়াজি বললেন, স্যার। আপনি প্রেসিডেন্টকে টেলিগ্রাম করুন। যুদ্ধবিরতি আয়োজন করতে। আমি আপনার অর্ডার মেনে নেব।
মালিক বিস্মিত। টাইগার নিয়াজি তাকে স্যার বলে ডাকছেন।
চোখের পানি মুছে নিয়াজি বাইরে এলেন। বাইরে কর্মচারীরা উঁকিঝুঁকি দিয়ে ইস্টার্ন কমান্ডের সেনাপ্রধানের কান্নামোছা চোখ দেখার চেষ্টা করতে লাগল।
তিনি গাড়িতে উঠে সোজা চলে গেলেন ক্যান্টনমেন্টে। সেনা সদর দপ্তরে। দরজা বন্ধ করে দিলেন। যে নিয়াজি তার আদিরসাত্মক কৌতুক বলার জন্য বিখ্যাত, তিনি আর কোনো কথা বলেন না। চুপ করে থাকেন। একা একা চুল ঘেঁড়েন। কান্নাকাটি করেন।
একটু পরপর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে খবর আসে। সব খারাপ খবর। যশোর। হাতছাড়া। কুমিল্লা আর ফেনীর মধ্যখানের জায়গাটা যৌথ বাহিনীর দখলে। বিমানবাহিনী বলতে কিছু নেই। সব কটি বিমানবন্দর গর্তে গর্তে চাঁদের পিঠ হয়ে গেছে। নৌবাহিনী বলতে কিছু নেই। জাতিসংঘ বলছে বিদেশি নাগরিকদের সরিয়ে নেবে। ৮ ডিসেম্বর ইন্ডিয়া যেন বিমান আক্রমণ বন্ধ রাখে। সরিয়ে যে নেবে, এয়ারপোর্ট তো সারাতে হবে। অসম্ভব আবদার।
তিনি ঘুমান না। মদ ছাড়া আর কিছু খান না। একটু পরপর বাথরুমে যান। বাথরুমে গিয়ে বসে বসে কাঁদেন।
৯৬
ইয়াহিয়া খানের প্রেসিডেন্ট ভবনকে পুলিশের লোকেরা নাম দিয়েছিল কাঞ্জারখানা। এর মানে হলো পতিতালয়। সামরিক সদর দপ্তরকে তারা অভিধা দিয়েছিল দঙ্গরখানা–পশুর আখড়া। আর নিজেদের পুলিশ লাইনকে। তারা ডাকত লঙ্গরখানা বলে। যুদ্ধের পর ভুট্টো সরকার গঠিত হামুদুর রহমান তদন্ত কমিশনও ইয়াহিয়ার প্রেসিডেন্ট ভবনে যাতায়াতকারী নারীদের এক বড় তালিকার কথা রিপোর্টে লিখেছিল।
যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ইয়াহিয়া খানকে সন্ধ্যা ছয়টার পর পাওয়া যায় না। বেলা ১১টার আগে তিনি ঘুম থেকে ওঠেন না। সাধারণত তিনি তার রাত্রিপোশাক পরিহিত অবস্থায় নিজের শয়নকক্ষে থাকেন। মদ্যপান করেন। রাতের পর পার্টিতে থাকেন।
গভর্নর মালিক যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। জরুরি তারবার্তা এসেছে। কিন্তু এটা কে প্রেসিডেন্টের কাছে নিয়ে যাবে?
ইয়াহিয়া খান পার্টিতে। নর্তকীরা নাচছে। তাদের উদর ওঠানামা করছে। বেলি ডান্সে তারা রীতিমতো দক্ষ হয়ে উঠেছে। তারপরও একজন রানার তারবার্তার প্রিন্ট নিয়ে প্রেসিডেন্টের পার্টি হলরুমে যায়।
তিনি বার্তাবাহককে দেখেই ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।
কী হয়েছে?
ভীষণ জরুরি টেলিগ্রাম স্যার।
দুনিয়া কি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে? তুমি কেন আমার পার্টিটা মাটি করতে এসেছ?
স্যার আপনাকে ঢাকায় ফোন করার কথা বলে দিয়েছে…।
কে বলে দিয়েছে? আমি প্রেসিডেন্ট। আমাকে হুকুম করে কে?
পীরজাদা সাহেব।
পীরজাদা। কোথায় পীরজাদা। ইয়াহিয়া টলমল পায়ে এগোতে থাকেন। অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে তাঁর কণ্ঠ জড়িয়ে আসছে। তিনি রিভলবার বের করে পীরজাদাকে খুঁজতে থাকেন।
রানার ভয়ে পালিয়ে যায়। ভেতরে চলতে থাকে চূড়ান্ত অশ্লীলতা।
ইয়াহিয়া একজন জেনারেলের স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে বললেন, আমাকে বলছে পূর্ব পাকিস্তানকে ইন্ডিয়া দখল করে নিচ্ছে। এটা কী করে সম্ভব? ব্ল্যাক বিউটি ভবিষ্যৎ দেখতে জানে। সে আমাকে বলেছে, তিন বছর পর আমি সাফল্যের চূড়ায় উঠব। তার আরও দুই বছর বাকি। ১৯৭৩ সালে আমি থাকব পৃথিবীর সেরা শাসক…
জোরে জোরে বাদ্য বাজছে। আলো জ্বলছে আর নিভছে। নর্তকীরা পোশাক ছুঁড়ে ফেলছে। প্রেসিডেন্ট নাচতে নাচতে বমি করতে শুরু করে দিলেন।
করাচির হারবার তখন জ্বলছে দাউ দাউ করে। চাকলালা বিমানবন্দরে তিন দফা বিমান হামলা হয়।
প্রেসিডেন্ট বললেন, আমি ঠিক আছি। ঠিক আছি কি না?
তার পাশে দুই অফিসার বললেন, অবশ্যই ঠিক আছেন স্যার।
আমি পৃথিবীর সেরা যোদ্ধা।
অবশ্যই স্যার। আপনি স্পেন বিজয়ী তারেকের মতো। আপনি সারা পৃথিবীকে চাঁদতারা পতাকার নিচে আনবেন।
৯৭
জাতিসংঘের মাধ্যমে যুদ্ধবিরতি ঘটিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং ইয়াহিয়া খানের পরাজয় ঠেকাতে আমেরিকা পাগলের মতো চেষ্টা করতে থাকে। চীন। ছিল তাদের পাশে। নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকার প্রস্তাবে রাশিয়া ভেটো দেয়। রাশিয়ার প্রস্তাবে চীন ভেটো দেয়। নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে সমাধান করা যাবে না, কাজেই সাধারণ পরিষদে আলোচনা নিয়ে যাওয়া হয়। সাধারণ পরিষদ ভারত-পাকিস্তানকে অবিলম্বের যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানায়। সাধারণ পরিষদের প্রস্তাব মানতে কোনো দেশ বাধ্য নয়।
ইন্দিরা গান্ধী এসবকে পাত্তা না দেওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তিনি বরং চীনা হামলার বিপরীতে সোভিয়েত সামরিক সমর্থন পাওয়ার দিকে মনোযোগ দেন।
