গভর্নর মালিকের অফিসেই নিজের অফিস বানিয়ে নিয়েছেন জেনারেল রাও ফরমান আলী খান। তিনি গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে কী হবে না-হবে তিনিই ঠিক করেন। কাকে হত্যা করতে হবে আর কাকে মন্ত্রী বানাতে হবে, এসব কাজ তিনি করে যাচ্ছেন। দক্ষতার সঙ্গে। জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ এসব দলকে দিয়ে কীভাবে স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের ঘায়েল করা যায়, সেসব বুদ্ধি বের করা ও প্রয়োগ করাও তার কাজ। এখন তিনি ব্যস্ত ২০ ডিসেম্বরের জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে দালাল বাঙালি এমএনএদের পাঠানো নিয়ে। আওয়ামী লীগের ৭৯ জন এমএনএর সদস্যপদ বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন দলের লোকজনকে বসিয়ে এরই মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনেককে জিতিয়ে আনা হয়েছে। ইয়াহিয়া ভুট্টোর পিপিপিকে দিতে বলেছিলেন ২৪টি এমএনএ পদ। রাও ফরমান আলী ১২টি দেওয়ার জন্য দর-কষাকষি করেন। জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগের তিন অংশ, পিডিপি, নেজামী ইসলামী আওয়ামী লীগের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া আসন ভাগাভাগি করে নেবে। রাও ফরমান আলী বসে বসে ঠিক করছেন, কাকে কোন আসনে জেতানো হবে। ভুট্টো রেগে যান, ইয়াহিয়াকে ধমক দেন, তাঁকে ২৪টি আসনই দান করতে হবে, যাতে পাকিস্তানে তিনি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান। তিনি বলেন, তাঁকে মাত্র ১২টি আসন দান করা পাকিস্তানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। কাতর ইয়াহিয়া বলেন, আচ্ছা আমি বলছি রাওকে। রাও ফরমান আলী পাকিস্তানে গেলে প্রেসিডেন্ট তাঁকে ভুট্টোর দাবির কথা বলেন। রাও বলেন, কেবলটা ৭৯টি আসন। এর বাইরে আরও ৮৮টা আসন তো আছে। পরে দেওয়া যাবে।
না, ভুট্টো এখনই চায়।
কী মুশকিল। এই লোককে তাহলে আওয়ামী লীগে ১৬৭ আসনের সব দিয়ে দিলেই তো হয়।
নির্বাচন হবে ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর। রাও ফরমান আলী এসব নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ। রাও ফরমান আলী। বুঝতে পারছেন, যৌথ বাহিনী যে গতিতে এগোচ্ছে, কয়েক দিনের মধ্যেই তারা ঢাকা দখল করে ফেলবে। কী করা যায়, উপায় খুঁজছেন। তিনি ভাবছেন পাকিস্তান চলে যাবেন। কিন্তু তার আগে একটা কাজ তাঁকে করতে হবে। জামায়াতে ইসলামীর গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামীদের নিয়ে তিনি একটা পরিকল্পনা করছেন। সারা দেশের বুদ্ধিজীবী যারা ইন্ডিয়ার দালাল, কমিউনিস্ট, হিন্দু, তাঁদের একটা তালিকা করছেন। এই কাজটা শেষ না করে তিনি পালাতে পারেন না।
পিন্ডিতে বিচারপতি কর্নেলিয়াসের নেতৃত্বে সংবিধান কমিশন কাজ করছে। তারা একটা নতুন সংবিধান বানাচ্ছে। ২০ ডিসেম্বরে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে এটা পাস করানো হবে। রাও ফরমান আলী তাঁর টেবিলে বসে একটা আধুলি বের করেন। ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তান থাকবে। তো! হেড না টেল। হেড হলো পাকিস্তান। টেল হলো না-পাকিস্তান। টেল। উঠল। তিনি আবার টস করবেন। এটা মেনে নেওয়া যায় না।
গভর্নর ডেকে পাঠিয়েছেন।
গভর্নরের অফিস রুমে ঢুকলেন রাও। এর মধ্যে সেখানে এসে গেছেন জেনারেল নিয়াজি। চিফ সেক্রেটারি মোজাফফর হোসেন। ৯ ডিসেম্বর বিকেলটায় আবহাওয়া চমৎকার। বাইরে শীত পড়েছে। ঢাকার শীত এমন না যে ঠকঠক করে কাঁপতে হয়। গভর্নরের রুমে এসি চলছে। এসিতে একটা একটানা আওয়াজ হচ্ছে।
গভর্নর বললেন, রেডিওতে তো শুনছি আমাদের বাহিনী খুব ভালো করছে। তবে এই দেশের মানুষ তো আমাদের রেডিও বিশ্বাস করে না। তারা ইন্ডিয়ার কথা শোনে। বিবিসির কথা বিশ্বাস করে। আর মনে হয় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনে বেইমানি করার তেজ পায়। আমি গভর্নর। নিয়াজি সাহেব, আপনি বলেন আসলে পরিস্থিতি কী? আমরা কি কাশ্মীর পাঞ্জাব সব দখল করে ফেলছি!
জেনারেল নিয়াজিকে বলা হয় টাইগার নিয়াজি। তিনি বললেন, অবশ্যই। যুদ্ধের তো কেবল শুরু। আর কয়েক দিনের মধ্যে আমরা দেখিয়ে দেব কত গমে কত আটা।
তাহলে আমরাই যুদ্ধে জিততে যাচ্ছি? ফরমান সাহেব, তাহলে ইলেকশন হচ্ছে?
নিশ্চয়ই হচ্ছে। আজকেও আমি চিফ ইলেকশন কমিশনার বিচারপতি আবদুস সাত্তারের সঙ্গে কথা বলেছি। যদিও নির্বাচন কমিশন অফিসে বোমা মারা হয়েছে, তাতে ইলেকশন তো পণ্ড হবে না। কারণ, আমাদের তো ভোটার দরকার নেই। রেজাল্ট আমার হাতে।
তাহলে আর কোনো চিন্তা নেই? সেক্রেটারি সাহেব কী বলেন?
সেক্রেটারি মোজাফফরের চোখে বালু পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। তিনি চোখ রগড়াতে লাগলেন।
সবাই চুপ করে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। কেউ না।
মোজাফফর তাকালেন নিয়াজির দিকে।
নীরবতা পাথরের চেয়েও ভারী। নীরবতা দোজখের মতো তপ্ত। ডিসেম্বরের ৭ তারিখের বিকেলের শীতে এসি চালিয়েও সবাই ঘামতে লাগলেন।
মুখ খুললেন মালিক। বললেন, দেখুন জেনারেল সাহেব, মানুষের জীবনে উত্থান-পতন থাকবে। সৈনিক হিসেবে আপনি জানেন, কখনো যুদ্ধে জয়লাভ করবেন, কখনো হারবেন। আজকে আপনার সামনে গভীর সংকট। আজকে আপনাকে আত্মসমর্পণ করতে হতে পারে…কিন্তু ভেঙে পড়বেন না। আল্লাহ মহান।
জেনারেল নিয়াজি কাঁদতে শুরু করলেন। কান্নায় তাঁর মুখ বিকৃত হয়ে উঠল। তিনি কান্না থামানোর চেষ্টা করছেন। মুখ চেপে ধরছেন। কিন্তু রোদনের ধাক্কায় মুখ খুলে যাচ্ছে। বিলাপ গোঙানি হয়ে উঠছে। চোখের পানিতে তার ব্যাজ ভিজে জবজবে।
