এরপর আর কী খাওয়া যায়। সকালে গাছের পাতায় শিশির জমে আছে। বাঁধাকপির পাতায় পাতায়। ২৬ জন সৈন্য ফুলকপির বাগানে বসে পাতা থেকে তুলে তুলে পানি শুষে খেতে লাগলেন। ফুলকপিতেও তাদের খিদে মিটল ভালোই।
দুপুরের রোদে তাদের চলা অসহ্য হয়ে পড়ল। তাঁরা আর পারছেন না। একটা জঙ্গলের মধ্যে বসে পড়লেন।
পেটের খিদেয় ব্রিগেডিয়ার কাদিরের পেট জ্বলে যাচ্ছে।
এই সময় একজন অফিসার মাটি থেকে গোল গোল পাতার একধরনের ঘাস তুলে এনে বললেন, স্যার চিবুতে থাকেন।
এগুলো কী পাতা? বিষাক্ত নয়তো?
না স্যার। আমি খেয়েছি। পিপাসা চলে যায়।
ব্রিগেডিয়ার কাদির বললেন, আমি আর পারছি না। তুমি কয়েকজন সোলজার নিয়ে হাইওয়েতে ওঠো। দেখো আমাদের কাউকে পাও কি না। একটা গাড়ি পেলে আমরা হয়তো বেঁচে যাব।
অফিসার চলে গেলেন। গাছের নিচে রিক্ত নিঃস্ব ব্রিগেডিয়ার শুয়ে পড়লেন। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে নীল আকাশে ঝকঝকে রোদ দেখা যাচ্ছে। তার নিজের স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের কথা মনে পড়ল।
এই সময় পায়ের আওয়াজ এল। তার পাঠানো অফিসার ফেরত আসছে। তার পেছনে স্টেনগানধারী গোটা ত্রিশেক লুঙ্গি পরা লোক। মুক্তি।
তারা বলল, হ্যান্ডস আপ।
ব্রিগেডিয়ার হাত তুলবেন, সেই শক্তিও তার নেই।
.
তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো। রাখা হলো একটা ঘরে আটকে। এই সময় এলেন এক মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বললেন, স্যার, আমার নাম আবু ইউসুফ। মেজর তাহের আমার ছোট ভাই।
ব্রিগেডিয়ার আবু ইউসুফকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।
তারিখটা ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১।
৯৪
মেজর জেনারেল জ্যাকব ভারতের ইস্টার্ন আর্মির চিফ অব স্টাফ। তাঁর সঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রধান মানেকশর কয়েকটা বিষয়ে মতের মিল হচ্ছে না। জ্যাকব মনে করেন, বাংলাদেশ যুদ্ধে আসল হলো ঢাকা। বড় শহরগুলো দখলে নেওয়ার দরকার নেই। যেখানে শত্রুসৈন্যরা দুর্ভেদ্য ঘাঁটি গেড়ে বসে আছে, তাদের সেখানে থাকতে দাও। তাদেরকে পাশ কাটিয়ে ঢাকা চলে আসো। আর ঢাকার বাইরের শত্রুসৈন্যদের ঢাকা আসার পথ রুদ্ধ করে রাখো। ঢাকা দখল করলেই পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে।
মানেকশ মনে করেন, চট্টগ্রাম, খুলনার মতো বন্দরগুলো দখল করে বসে থাকলে ঢাকার পতন ঘটবে আপনা-আপনি।
জ্যাকব মনে করেন, জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব নেওয়ার আগে, চীন কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের আগেই দ্রুততম সময়ে ঢাকার পতন ঘটাতে হবে।
জ্যাকব একটা কাজ করলেন। তাঁর কলকাতার বাসভবনে দাওয়াত করলেন আমেরিকার কলকাতা কনসুলেট অফিসের নয়া পলিটিক্যাল অফিসার জর্জ গ্রিফিনকে। নিজের বেডরুমে তিনি একটা বড় বাংলাদেশের ম্যাপ ঝুলিয়ে রাখলেন। সেখানে দেখালেন ব্রহ্মপুত্রের পূর্বপারে ঢাকার ধারে ট্যাংকবাহিনী এসে গেছে। এগুলো সোভিয়েত ট্যাংক। পানিতে সাঁতার কাটতে পারে। আর ঢাকার চারপাশে ভারতীয় সৈন্যদের অবস্থান বেশি করে চিহ্নিত করে রাখলেন।
নৈশভোজ ভালো হলো। জ্যাকব বললেন, জর্জ, তুমি কি হাত ধোবে? ওয়াশরুমে যাবে? এই বেডরুমের ভেতর দিয়ে যাও।
গ্রিফিন উঠলেন। বেডরুমের দেয়ালে চোখ পড়ল তাঁর। ইস্ট পাকিস্তানের ম্যাপ। আজকের যুদ্ধচিত্র। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখলেন।
পলিটিক্যাল অফিসাররা সিআইএর ট্রেনিংপ্রাপ্ত হন। এই-জাতীয় গোপন তথ্য সংগ্রহ করাই তাদের কাজ।
গ্রিফিন তাড়াতাড়ি ফিরে গেলেন কনসুলেট অফিসে। ফিরেই বার্তা পাঠালেন তাঁর ওয়াশিংটন অফিসে। আমরা তো কিছুই জানি না। সর্বনাশ হয়ে গেছে। সোভিয়েত উভচর ট্যাংক ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে ঢাকার কাছাকাছি চলে গেছে। পুরো ঢাকা ঘেরাও হয়ে গেছে ভারতীয়দের দ্বারা। ঢাকার পতন এখন অনিবার্য।
এই খবর চলে গেল ফারল্যান্ডের কাছে। রাওয়ালপিন্ডিতে। ফারল্যান্ড সারাক্ষণ বসে থাকেন ইয়াহিয়ার সঙ্গে। ইয়াহিয়ার গ্লাসমেট তিনি।
তিনি ইয়াহিয়া খানকে জানিয়ে দিলেন ঢাকা এখন ভারতীয় ট্যাংকের নলের নিচে।
নিয়াজিও ঢাকার আমেরিকান কনসুলেট অফিসের মাধ্যমে সেই খবর জেনে গেলেন। আর কোনো আশা নেই। ঢাকা যৌথ বাহিনীর দ্বারা ঘেরাও হয়ে গেছে।
৯৫
ঢাকার গভর্নর হাউসটা সত্যিই সুন্দর। ব্রিটিশ আমলে খাজা আবদুল গণি দিলকুশা গার্ডেনে এই প্রাসাদোপম গম্বুজশোভিত প্রাসাদটা নির্মাণ করেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ হলে ঢাকা আসাম ও পূর্ব বাংলার রাজধানী হয়, তখন ব্রিটিশ সরকার এটা কিনে নেয় এবং ১৯১১ সাল পর্যন্ত এটা ছিল ব্রিটিশ ভাইসরয়ের সাময়িক বাসভবন। ১৯০৬ সালে স্যার জোসেফ বামফিল্ড ফুলার এই ভবনের দরবার হলে গভর্নরের কার্যালয়ের কাজ শুরু করেন। ১৯১১ সাল থেকে এটাকে গভর্নর হাউস হিসেবে ডাকা হচ্ছে। ব্রিটিশরা চলে গেছে। পাকিস্তানিরা এসেছে। এটা এখনো গভর্নর হাউস। চারদিকে সবুজ প্রান্তর। সেইখানে পুষ্পে-বৃক্ষে শোভিত একটা দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ।
এখন গভর্নর হলেন ডা. আবদুল মোত্তালিব মালিক। ৬৬ বছর বয়স। ১৯০৫ সালে জন্মেছিলেন চুয়াডাঙ্গায়, চোখের ডাক্তার ছিলেন, মুসলিম লীগ করতেন, ১৯৪৯ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত পাকিস্তানে লিয়াকত আলী খানের মন্ত্রী ছিলেন। ইয়াহিয়া খানের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছিলেন। জুলাই মাসে। ইয়াহিয়া তাঁকে স্বাধীনতাসংগ্রামে উত্তাল পূর্ব পাকিস্তানে প্রেসিডেন্টের বিশেষ সহকারী করে পাঠিয়েছিলেন। ৩১ আগস্ট তাঁকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ৩ সেপ্টেম্বর তিনি শপথ নেন। পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের ১০৪ দিন আগে গার্ডেন তথা গুলিস্তানের এই পাখিডাকা, ছায়াঢাকা জ্যোৎস্নাঘোয়া গভর্নর হাউসে তাঁর অভিষেকে পূর্ব পাকিস্তানের দালাল রাজাকাররা উপস্থিত থেকে নিজেকে ধন্য করেছিলেন–আবদুল মোনেম খান, সৈয়দ আজিজুল হক, ফজলুল কাদের চৌধুরী, গোলাম আজম, খান এ সবুর খান, ইউসুফ আলী চৌধুরী (মোহন মিয়া), আবদুল জব্বার খান, পীর মোহসিন উদ্দীন দুদু মিয়া।
