কামালপুরের যুদ্ধে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাদের খান ছিলেন। তিনি শুনলেন মেজর আবু তাহের পাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে এখানে যুদ্ধ করছে। তিনি বললেন, আমার ছাত্র সে। আমি তাকে ট্রেনিং দিয়েছি। আমার ছাত্র আজকে আমার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে!
তাহের যুদ্ধক্ষেত্রে আহত হলেন।
তার পিতামাতাকে রাজাকাররা ধরে আনল। তিনি যখন শুনলেন, এরা তাহেরের আব্বা, আম্মা, তিনি বললেন, এদের সসম্মানে বাড়িতে পাঠিয়ে দাও। তিনি তাহেরের আব্বা মহিউদ্দিন তালুকদারকে বললেন, আপনার ছেলেকে বলবেন, নিজেকে বাঁচিয়ে যুদ্ধ করতে। প্রাণ দিয়ে ফেললে দেশ দিয়ে সে কী করবে!
তাহেরের বড় ভাই আবু ইউসুফ ছিলেন পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে। পোস্টিং ছিল সৌদি আরবে। তিনি সৌদি আরব থেকে পালিয়ে ভারতে চলে আসেন। তাহেরের সঙ্গেই যুদ্ধ করেন। কামালপুর যুদ্ধে জামালপুর যুদ্ধে আবু ইউসুফ জান বাজি রেখে লড়াই করেন।
যৌথ বাহিনী চারদিক থেকে এগিয়ে আসছে। জামালপুর বেদখল। টাঙ্গাইলের অদূরে উড়োজাহাজ থেকে শত শত ছত্রীবাহিনী নামল। টাঙ্গাইল সার্কিট হাউসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখে কাদির খান হাতের মেশিনগান থেকে রাশি রাশি গুলি ঝরিয়ে ম্যাগাজিন খালি করে ফেললেন। তারপর তার মনে হলো, বড় ভুল করে ফেললাম। এই গুলি আট-দশ মাইল দূরের ছত্রীসেনাদের গায়ে কোনো দিনও লাগবে না। শুধু তার নিজের ম্যাগাজিন খালি হলো। এখন পাকিস্তানি সৈন্যদের বড় সমস্যা হলো গোলাগুলির অভাব।
তিনি তাঁর অধীন মেজর সারোয়ারকে হুকুম করলেন, যাও, এই ছত্রীসেনাদের নিউট্রালাইজ করো। সারোয়ার কয়েক ডজন সৈন্য নিয়ে চললেন ছত্রীসেনাদের অবস্থান লক্ষ্য করে। তারা কয়েক দিন ঘুমান না। ঠিকভাবে খান না। শরীর চলছে না।
পথে কয়েকজন রাজাকারের সঙ্গে দেখা হলো। তারা তাদের পা ঠুকে সালাম করল।
সারোয়ার বললেন, ছত্রীসেনা মারতে হবে। আমরা রাস্তা চিনি না। চলো আমাদের সঙ্গে। আগে আগে পথ দেখিয়ে নাও।
রাজাকাররা বলল, স্যার। ওরা তো স্যার চীনা সৈন্য।
সারোয়ার খুশি হলেন। তিনি তার দলবলসহ ফিরে এলেন।
কী হলো? চলে এলে কেন? বিরক্ত ব্রিগেডিয়ার বললেন।
মেজর সারোয়ার বললেন, ওরা তো স্যার আমাদের ফ্রেন্ডলি বাহিনী। চাইনিজ প্যারাট্রুপার।
ব্রিগেডিয়ার কাদির বললেন, তোমার মতো আহাম্মক আমি জীবনে দুইটা দেখিনি। চীনারা এখানে এসে নামবে, আর আমাদের কোনো খবর দেবে না। বলা নাই কওয়া নাই আকাশ থেকে চীনারা নামবে।
ইয়েস স্যার। কারণ তিব্বত সীমান্ত তুষারে ঢাকা। ৬ ফুট থেকে ১১ ফুট তুষার জমেছে স্যার। পায়ে হেঁটে ওদের পক্ষে আসা অসম্ভব। তাই তারা প্লেনে চড়ে এসেছে।
ব্রিগেডিয়ার কাদির বুঝতে পারলেন, তাদের সৈন্যদের সবার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। রাওয়ালপিন্ডি থেকে সারা বছর এবং গত এক মাস শুধু এই আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, ভারত অ্যাটাক করলে চীনও অ্যাটাক করবে। নো চিন্তা। ডু ফুর্তি। মদ খাও। আর বাঙালি মেয়েদের প্রেগন্যান্ট করো। ওদের রেস পাল্টে দিতে হবে।
ওয়্যারলেসে কথা হচ্ছে ঢাকার সঙ্গে। হেডকোয়ার্টারের নির্দেশ, টাঙ্গাইল ছেড়ে দাও। ঢাকা আসো। ঢাকা সুরক্ষিত রাখতে হবে। তা নাহলে যেকোনো সময় যৌথ বাহিনী ঢাকায় ঢুকে পড়বে।
কাদির খান টাঙ্গাইল ছাড়লেন। তখন বাজে পৌনে ছয়টা। সূর্য ডুবে গেছে। আকাশে সূর্যের আভা এখনো ছড়িয়ে আছে। পাকিস্তানের পতাকাটা এখনো উড়ছে সার্কিট হাউসের ফ্ল্যাগস্ট্যান্ডে। তাঁর সঙ্গে আছে এক কোম্পানি সৈন্য আর রেঞ্জার, ৬০০ জন ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্সের জওয়ান, পুলিশ, আর ছয়জন অফিসার।
এর আগে ঢাকার উদ্দেশে সুলতান আহমদ রওনা হয়েছেন। গাড়িতে যাচ্ছিলেন। কাঁদেরিয়া বাহিনীর পাতা মাইনে তাঁদের গাড়ি উড়ে গিয়ে একটা গাছের ওপরে লটকে আছে। ড্রাইভার রক্তাক্ত। সুলতান রাস্তার ধারে পড়ে আছেন।
তাঁর পাশ দিয়ে বালুচ সৈন্য যাচ্ছে। তাঁকে স্যালুট জানাল। সুলতান বললেন, আমার ব্যাটালিয়ন কোথায়?
আমার জানা নাই স্যার। বলে সে আরেকটা স্যালটু ঠুকে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করল।
কাদির খান গোলাগুলির আওয়াজ পাচ্ছেন। তিনি ঠিক করলেন বড় রাস্তা দিয়ে নয়, তিনি যাবেন মাঠের ভেতর দিয়ে। সৈন্যদের বললেন, তোমরা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হও। একেকজন একেকভাবে ঢাকার দিকে যাও। মনে রাখবা, তোমরা হলো আল্লাহর সৈনিক। একজন মুসলমান ১০ জন হিন্দুর সমান। যাও। ফেরেশতারা তোমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।
২৬ জনের দল নিয়ে কাদির হাঁটছেন। পথ ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে। রাস্তাঘাট তারা চেনেন না। পথের মধ্যে নালা পড়ছে। খাল পড়ছে। পানি দেখলে তাদের ভয় লাগে। শীতের রাত। আকাশে কৃষ্ণপক্ষের চাঁদ। রাতের বেলা হাঁটা সহজ। দিনে হাঁটা কঠিন। বাঙালিরা যদি দেখে পশ্চিমা সৈন্য যাচ্ছে, যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঘিরে ধরবে। পিটিয়ে মারবে, কুপিয়ে মারবে।
তাঁদের সঙ্গে খাবার নেই। তাঁদের সঙ্গে পানি নেই। তাদের সৈন্যদের পায়ে জুতা নেই। পোশাক ছিঁড়ে গেছে। তারা রাতের বেলা কৃষিজমিতে কৃষকদের ফসল চুরি করেন। একটা জমিতে অনেক শসা পেলেন মাচায়। ঝুলছে। শসা তাঁদের জীবন বাঁচাল। খাদ্য আর পানি দুটোর প্রয়োজন মিটল। তারা দুই রাত হাঁটলেন।
