তোমার একান্ত
লে. কর্নেল সুলতান আহমদ
জামালপুর ফোর্সেস
.
ব্যাঙ্গমা বলল, সুলতান আহমদের জবাবটা কিন্তু ভালোই হইছে। শুধু তা-ই না, মুন্সির হাতে একটা খামে ভইরা তিনি দিছিলেন একটা তাজা বুলেট।
ব্যাঙ্গমি বলল, কলমে জবাব যত সুন্দর দিছেন, অস্ত্রে জবাব তত ভালো তিনি দিতে পারেন নাই।
ব্যাঙ্গমি বলল, ১০ ডিসেম্বর রাতে মিত্রবাহিনী চারদিক থাইকা তাগো ঘিরা ধইরা চুপচাপ বইসা থাকে। বিকেল ৪টার দিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাইর হইয়া একনাগাড়ে গুলি চালাইলেও ভারতীয়রা চুপটি কইরা বইসা আছিল।
.
রাত ১০টায় পাকিস্তানিরা আবার গ্যারিসনের চারদিকে গুলি ছুঁড়তে থাকলেও মিত্রবাহিনী নীরব হয়ে থাকে।
ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার ধারণা করেন, এরা আসলে পালিয়ে যাবে ঢাকার দিকে। তাই বোঝার চেষ্টা করছে কোন পথ খোলা আছে। মিত্রবাহিনী তাদের পালানোর পথের দুধারে অ্যাম্বুশ পেতে বসে রইল। রাত ১টার দিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা পালানোর জন্য লাইন ধরে অগ্রসর হতে লাগল। পুরো বাহিনী বেরিয়ে পাতা ফাঁদের মধ্যখানে আসার পর ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার প্রথম এমএমজি গানার থেকে গুলি করতে শুরু করলেন। এবার একযোগে মিত্রবাহিনীর অস্ত্র গর্জে উঠল।
ভোর হলো। কুয়াশা কাটে না। ছয়টার দিকে একটু একটু করে চারপাশ পরিষ্কার হলো। ২০০ জন পাকিস্তানি মারা গেছে। সেকেন্ড ইন কমান্ড মেজর ফজলে আকবর রেডিওতে যোগাযোগ করে জানালেন, তাঁরা সারেন্ডার করবেন।
ক্লেয়ার ছুটে গেলেন। ৪০০ সৈন্য আত্মসমর্পণ করল। বিপুল অস্ত্র দখল করা গেল। কিন্তু সুলতান আহমদ দুই শ সৈন্য নিয়ে রাতের আঁধারে পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেন।
চারদিক থেকে বাঙালিরা জয় বাংলা স্লোগান দিতে দিতে জামালপুর শহর সয়লাব করে দিল।
ক্যাপ্টেন জয়নুল আবেদিন মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার। তিনি এই যোদ্ধাদের জন্য একটা গণসংবর্ধনার আয়োজন করলেন। তারা বাংলাদেশের পতাকা তুললেন। তাঁর সামনে গাইতে লাগল আমার সোনার বাংলা। গান গাইতে গাইতে তাঁরা কাঁদছেন।
আর সেই গান শুনে কাঁদছে ক্যাম্পের ভেতরে একটা বাড়িতে আটকে থাকা সালোয়ার-কামিজ পরা একদল নারী।
তাদের আটকে রেখেছিল পাকিস্তানি সৈন্যরা। মুক্তিযোদ্ধারা এগিয়ে গেল। তাদের বলা হলো, তোমরা মুক্ত। তোমরা চলে যাও।
শাড়ি এনে দেওয়া হলো তাদের। সালোয়ার-কামিজ ছেড়ে শাড়ি পরে মেয়েরা চলে গেল।
জেনারেল নাগরা সকাল ৭টায় হেলিকপ্টারে করে এসে নামলেন জামালপুরে।
৯২
আপা, আপা শোনো। রেডিওটা নিয়ে দৌড়ে হাসিনার কাছে গেলেন রেহানা। হাসিনা জয়কে কোলে নিয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করছিলেন।
হাসিনা বললেন, কী?
জেনারেল মানেকশ পাকিস্তানি মিলিটারিকে সারেন্ডার করতে বলছে।
হাসিনা কান পাততে পাততেই ঘোষণাটা শেষ হয়ে গেল আকাশবাণী কলকাতার।
রেহানা বললেন, একটু পর আবার হবে। এটা বাজতে থাকুক। দাঁড়াও। অল ইন্ডিয়া রেডিওর অন্য সেন্টার কী বলে শুনি।
রেহানা রেডিওর নব ঘোরাচ্ছেন। নানা ধরনের শব্দ হচ্ছে। গান, কথা। অর্থহীন টু টু। শেষে পাওয়া গেল সেই ইংরেজি বার্তাটা :
পাকিস্তানি বাহিনীর অফিসার ও সৈন্যদের বলছি, আমি জানি তোমরা খুলনা, চট্টগ্রাম দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছ। তোমরা পালাতে পারবে না। নৌবাহিনী সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। মিলিটারিদের জীবন। আমি রক্ষা করতে চাই। আমার কাছে সারেন্ডার করো। তোমাদের জীবন বাঁচবে। জেনেভা কনভেনশন অনুসারে তোমাদের মর্যাদা দেওয়া হবে।
হাসিনা বললেন, এ ছাড়া তো পাকিস্তানিদের আর কোনো উপায় নাই। এখন সারেন্ডার করতে হবে ওদের।
হঠাই আকাশে বিমানের শব্দ। আর সঙ্গে সঙ্গে এই বাড়ি থেকেই কান ফাটানো গুলির শব্দ।
সবাই মেঝেতে বসে পড়লেন। রেনু, হাসিনা, হাসিনার কোলে জয়, রেহানা, রাসেল–সবাই।
গৃহপরিচারক আবদুল একটু পরে দৌড়ে এল। কয়েকদিন নিজ বাড়িতে থাকার পর আবার সে এ বাড়িতে ফিরে এসেছে। আবদুল বলল, ইন্ডিয়ান প্লেন আইছে। আর মিলিটারিরা আমগো বাড়ির ছাদে উইঠা গুলি করতেছে। একটা গুলির গরম খোসা আমার গায়ে লাগছে। সে একটা গুলির খোসা হাতে নিয়ে দেখাল।
রেহানা বললেন, ইন্ডিয়ান প্লেন দেখলেই সব বাড়ির ছাদের লোকেরা হাততালি দিচ্ছে।
আবদুল বলল, পাকিস্তানি প্লেন তো আর নেই। সব ফেলায়া দিছে। নাইলে ডগফাইট দেখতে খুব মজা।
রাসেল বলল, জয়বাবু, ভয় পেয়েছ? গুলির শব্দে ভয় পেয়েছ? ভয় পেয়ে না। জয় জয় জয় হয় হয় হয়…
গোলাগুলির শব্দ থেমে গেছে। বিমানের শব্দও আর নেই।
হাসিনা বললেন, মা শুনেছ, নুরুল আমিনকে ইয়াহিয়া খান প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন। আর ভুট্টো সহকারী প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
রেনু বললেন, পাকিস্তানে কে প্রধানমন্ত্রী হলো, কে প্রেসিডেন্ট, আমার কিছু যায় আসে না। আমার চিন্তা বাংলাদেশ নিয়া। খালি তোর আব্বা য্যান ভালো থাকে, আল্লাহর কাছে দিনরাত এই দোয়া করি।
আবদুল জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল, এই বাড়ির পাহারাদার মিলিটারিরা গর্তের ভেতরে লুকিয়ে আছে।
সে হাসতে হাসতে বলল, প্লেন চল গিয়া। আপলোগ ডর মাত করো।
৯৩
ব্রিগেডিয়ার কাদের খান পাঠানমুলুক থেকে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছেন হিন্দু, কাফের, হিন্দুস্তানের দালালদের দমন করতে। আটটা মাস তাঁর কাজ ছিল বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করতে নির্দেশ দেওয়া। তিনি ছিলেন ইন্টার সার্ভিসেস স্ক্রিনিং কমিটির প্রেসিডেন্ট। তাঁর সামনে আওয়ামী লীগার, মুক্তিযোদ্ধা, কমিউনিস্ট, হিন্দু, ভারতের দালালদের আনা হতো। তিনি কোনো তদন্ত ছাড়া, কোনো কারণ ছাড়াই বলতেন, বাংলাদেশে পাঠিয়ে দাও। এর মানে হলো, একে হত্যা করো। সৈন্যরা সেই লোককে বা সেই লোকসকলকে গুলি করে হত্যা করত।
