সূর্য তখন দিগন্তে ডুবে যাবে বলে একটা ডিম পোচে ভাসা কুসুমের আকার নিয়েছে। অস্তগামী সূর্যের হলুদ আলোয় দেখা গেল ক্যাপ্টেন। আহসানের চোখের কোণে অশ্রুফোঁটা হলুদ হয়ে আছে।
পাকিস্তানিদের অনেক দিন ধরে তৈরি করা ডিফেন্স লাইন, শক্ত ডিফেন্স পোস্ট অধিকার করল মিত্রবাহিনী। পেল অনেক অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ।
ক্যাপ্টেন আহসান মালিক বললেন, আমাদের জওয়ানরা অনেক দিন। ভালো খাবার পায় না।
ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার অর্ডার করলেন, এদের প্রত্যেককে ভালো ডিনার বক্স দাও। মাত্র এক দিন আগে এসেছে ভারতীয় এই ব্রিগেড। তাদের রেডিমেড খাবার এখনো মুখে দেওয়া যায়।
.
ডিসেম্বরের ৮। ক্লেয়ারের নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী এগিয়ে চলেছে। তারা জামালপুরের দক্ষিণে পৌঁছে গেছে। ব্রহ্মপুত্র নদ পেরোতে হবে। নদে পানি নেই, কিন্তু পাহাড় থেকে আনা গরুগুলো পানি দেখেই ভয় পেয়ে গেল, গরুর গাড়িতে কামান, গোলাবারুদ রসদ পার করা যাবে না। নৌকায় সবাই নদী পার হলো। অনেক জিনিস পেছনে রাখা হলো শক্ত নিরাপত্তায়।
মোল্লাপাড়া গ্রামে ঘাঁটি গড়ল মিত্রবাহিনী।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার আরেকটা চিঠি লেখেন। তবে নিজে লেখেন নাই, কর্নেল ব্রারকে দিয়া লিখা নিয়া তিনি নিচে সাইন করেন। ৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে একটা ৪ পৃষ্ঠার বড় চিঠি লেখেন। চিঠিটা এবং এর উত্তর দুইটাই পরে সংগ্রহ করা হয়। কাজেই এইটা গল্প না, ইতিহাস। ইংরেজি চিঠির বাংলা করলে দাঁড়ায় :
বরাবর কমান্ডার,
জামালপুর গ্যারিসন,
আদিষ্ট হয়ে জানাচ্ছি যে তোমার গ্যারিসন চারদিক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। তুমি যে পালিয়ে যাবে সে রকম কোনো পথই আর নেই। পুরো গোলন্দাজ দলসহ একটা ব্যারিকেড এখানে তৈরি আছে। কাল সকাল সকাল আরেকটা ব্রিগেড এসে যাবে। তার ওপরে আমাদের বিমানবাহিনীর ক্ষমতার কিছু পরিচয় তোমরা পেয়েছ, আসলটা সামনে আসছে। তোমাদের দিক থেকে পরিস্থিতি একেবারে আশাবিহীন। তোমাদের বড় কমান্ডাররা এরই মধ্যে তোমাদের পরিত্যাগ করেছে।
একজন সৈনিক হিসেবে আরেকজন সৈনিককে বলছি, আমি তোমাদের নিরাপত্তা আর সম্মানের পুরো নিশ্চয়তা দিচ্ছি, তোমরা আত্মসমর্পন করো, কারণ এটাই একমাত্র পথ। আমি নিশ্চিত তুমি তোমার নিজের জেদের কারণে তোমার অধীন এতগুলো লোকের প্রাণহানির কারণ হয়ে উঠবে না। তুমি নিশ্চয়ই আমাদের সেনাবাহিনী প্রধানের আবেদন শুনেছ, তোমরা যদি তোমাদের পরিবারের সঙ্গে আবার মিলিত হতে চাও, তোমাদের একমাত্র কাজ হবে সারেন্ডার করা। তুমি রাজি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি কাগজপত্র তৈরি করে ফেলব।
এটা বোধ হয় বলে রাখা দরকার যে তোমরা যদি মুক্তিবাহিনী কিংবা তাদের সমর্থকদের হাতে পড়ো, তোমাদের জীবনের আর কোনো নিশ্চয়তা থাকবে না। তোমার সহযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আহসান। মালিক ৪ ডিসেম্বর কামালপুরে আমার কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। বুদ্ধিমানের মতো। তাদের জেনেভা কনভেনশন অনুসারে যত্নসহকারে রাখা হয়েছে।
আমি তোমার কাছে ৬.৩০ মিনিটের আগে উত্তর আশা করছি। অন্যথায় আমি বাধ্য হব তোমাদের জন্য বরাদ্দ ৪০ সোরটি এমআইজি নিয়ে চূড়ান্ত আঘাত করতে। আজকে সকালে যে যুদ্ধ হয়েছে তাতে তোমাদের যারা বন্দী হয়েছে, তারা আমাদের শক্তি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেয়েছে। তবে তাদেরও যত্নসহকারেই রাখা হয়েছে।
এই বেসামরিক বার্তাবাহকের সঙ্গে সভ্য আচরণ করা হবে, তার কোনো ক্ষতি করা হবে না বলে আমি আশা করি।
তাৎক্ষণিক উত্তর প্রত্যাশা করছি।
ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার
৯ ডিসেম্বর ১৯৭১।
এই বার্তা নিয়ে কে যাবে জামালপুর গ্যারিসনে? মুক্তিবাহিনীর গাইড জহিরুল হক মুন্সি এগিয়ে এলেন, আমি যাব।
সাইকেলে সাদা পতাকা উড়িয়ে জহিরুল হক মুন্সি চললেন। কিন্তু পাকিস্তানি মিলিটারি তাকে দেখামাত্র ধরে মারতে শুরু করে দিল। মারতে মারতে আধা মরা করে তার পকেট সার্চ করে তারা পেল চার পৃষ্ঠার চিঠি। সেটা নিয়ে তারা গেল গ্যারিসন কমান্ডার লে. কর্নেল সুলতান মাহমুদের কাছে।
সুলতান আহমদ চিঠি পড়ে খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। তাঁর কাছে যুদ্ধ করার মতো গোলাবারুদ নেই। ছেলেরা কয়েক দিন আধা বেলা আধপেটা খেয়ে আছে। যুদ্ধ করবে কী করে? কিন্তু বিনা যুদ্ধে তিনি আত্মসমর্পণ করবেন না।
তিনিও চিঠি খারাপ লেখেন না। ছাত্রজীবনে ইংরেজি ক্লাসে চিঠি লিখে তিনি শিক্ষকের কাছ থেকে এক্সিলেন্ট কমেন্ট পেয়েছিলেন।
তিনি লিখতে আরম্ভ করলেন :
জামালপুর
০৯ ১৭৩৫ ডিসেম্বর প্রিয় ব্রিগেডিয়ার,
আশা করি তোমার মনোবল এখনো অনেক উঁচু আছে। তোমার চিঠির জন্য ধন্যবাদ। আমরা এখানে জামালপুরে বসে আছি যুদ্ধ করব বলে। যুদ্ধ এখনো শুরু হয়নি। কাজেই কথা না বলে বরং এসো আমরা যুদ্ধ করি।
৪০ সোরটি! আমার মনে হয় এটা খুবই কম। দয়া করে তোমার সরকারকে বলো আরও অনেক পাঠাতে।
তোমার বার্তাবাহককে উপযুক্ত অভ্যর্থনা করার যে অনুরোধ তুমি করেছ, তার কোনো দরকার ছিল না। এর দ্বারা বোঝা যায় পাকিস্তানি সৈন্যদের সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কত খারাপ। আশা করি সে আমাদের এক কাপ চা পছন্দ করেছে। আশা করি, তোমার হাতে স্টেনগান দেখব। কলম দেখছি, যা ব্যবহারে তুমি তো একেবারে মাস্টার।
