ওকে, গো।
একটা সাইকেল জোগাড় করে একটা সাদা শার্টকে পতাকা বানিয়ে সাইকেলের সামনে ঝুলিয়ে বশির চলে গেল পাকিস্তানি ক্যাম্পের উদ্দেশে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হচ্ছে। বশির ফেরে না। ক্লেয়ারের চোখেমুখে উদ্বেগ। একটা নাবালককে তিনি পাঠিয়েছেন।
সে আসছে না। এ তো বড় দুশ্চিন্তার কথা। পাকিস্তানি মিলিটারি কি যুদ্ধের নিয়মকানুন জানে না? মিলিটারি ভব্যতা জানে না? আত্মসমর্পণের আহ্বানসংবলিত চিঠি নিয়ে সাদা পতাকা উড়িয়ে যাওয়া বালককে কি আটকে ফেলল তারা? মিত্রবাহিনীর সবাই উদ্বিগ্ন।
.
বশির পৌঁছাল পাকিস্তানি অবস্থানে। কংক্রিটের বাংকারের আড়ালে সব পজিশন নিয়ে বসে আছে। সামনে সেন্ট্রি আছে। তাকে দেখেই তারা চিৎকার করে উঠল : হল্ট।
বশির সাদা শার্ট নাড়তে নাড়তে চিৎকার করে বলল, লেটার। লেটার। পত্র হ্যায়। পত্র হ্যায়। চিঠি হ্যায়।
সেন্ট্রিরা দৌড়ে এল। হ্যান্ডস আপ। বশির তাঁর হাত মাথার ওপরে তুলল। প্রহরীরা এসে তার কোমর, প্যান্ট সব তল্লাশি করল। বশির বলল, লেটার হ্যায়।
সাইকেলটা একটা গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে রাখল বশির। দুপুরের রোদে গাছের পাতা, কাণ্ডের ছায়ার পাশে সাইকেলের ছায়াও পড়ল। সাইকেলের বেলে রোদ পড়ে ঠিকরে উঠছে।
তারা তাকে নিয়ে গেল ক্যাপ্টেন আহসান মালিকের কাছে।
স্যার, এ বাচ্চালোগ লেটার এনেছে।
লেটার? কার লেটার। কংক্রিটের একটা দেয়ালে ভর দিয়ে ঘাসে বসে। থাকা ক্যাপ্টেন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইলেন বশিরের দিকে।
ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার সাবের চিঠি।
আহসান পড়লেন। বললেন, তুমি একটা বাচ্চা। না জানি কোন মায়ের কোল খালি করে যুদ্ধের ময়দানে এসে পড়েছ। এখন লাঞ্চের সময়। আমরা খাব। তুমিও খাও। আমি ভেবে দেখি কী করব।
বশিরের জন্য টিনের থালায় রুটি আর ডাল এল। বশির ঘাসে বসে রুটি ডাল দিয়ে চিবাতে লাগল।
ক্যাপ্টেন আহসানও রুটি চিবুচ্ছেন আর ভাবছেন, আত্মসমর্পণ করা ঠিক হবে কি না।
এই সময় আকাশে দেখা গেল ভারতীয় বিমান। ভীষণ শব্দ করে এসে তারা আকাশ থেকে বোমা ফেলতে লাগল। ভীষণ শব্দ, ধোয়া আর আগুন। একঝটকায় বশিরকে নিয়ে আহসান বাংকারের ভেতরে ট্রেঞ্চের মধ্যে ঢুকে পড়লেন।
যুদ্ধবিমান ব্যাপক ক্ষতি করেছে। অনেকে হতাহত হয়েছে।
আহসান সেসব সামলাচ্ছেন। নির্দেশ দিচ্ছেন। তারপর নিজে একটা চিঠি লিখলেন।
আমরা আত্মসমর্পণ করব কি না, এটা ভারতীয় অফিসারের সঙ্গে আলাপ করে ঠিক করতে চাই। একজন অফিসারকে পাঠান।
বাঙালি একটা বাচ্চা ছেলের আনা চিঠিকে অবিশ্বাস করছেন না তিনি, কিন্তু তারও তো মান-অপমান বোধ আছে। পাঞ্জাবি তিনি। আরেকজন পাঞ্জাবির কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারেন।
সেই চিঠি নিয়ে বশির উঠল সাইকেলে। সাদা শার্ট উড়িয়ে বাতাসের বিরুদ্ধে উত্তরের দিকে ছুটছে তার সাইকেল।
.
বশির না আসায় ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার অস্থির হয়ে উঠলেন। চিঠি লেখা তাঁর প্রিয় হবি। তিনি আরেকটা চিঠি লিখলেন। তারপর হাঁক ছাড়লেন, আরেকটা চিঠি লিখেছি। কে যাবে?
এবার এগিয়ে এল আরেক কিশোর। হুবহু বশিরের মতোই যেন দেখতে। যেন যমজ ভাই।
আমি যাব স্যার।
তোমার নাম কী?
আনিসুর রহমান স্যার।
তুমি কোন ক্লাসে পড়ো।
আমি টেনে পড়ি স্যার।
কোন স্কুলে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া স্যার। ক্লেয়ার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন। সেখানে ছিলেন যুদ্ধ-সাংবাদিক হারুন হাবিব। তিনি বললেন, এটা স্যার ত্রিপুরার কাছে। আগরতলা বর্ডারে।
ক্লেয়ারের বিস্মিত হওয়ার পালা। কত দূর থেকে কোনখানে যুদ্ধ করতে এসেছে আরেকটা বালক।
আনিসুর রহমান আরেকটা সাইকেল জোগাড় করে একটা সাদা কাপড়কে পতাকা বানিয়ে লাঠির ডগায় ভালোভাবে বেঁধে নিয়ে ছুটল পাকিস্তানি পজিশনের দিকে।
বশির ফিরছে। আনিস যাচ্ছে। কিন্তু দুজন দুই পথে যাওয়া আসা করায় কারও সঙ্গে কারও দেখা হলো না।
বশির ফিরে এল।
তাকে দেখে অধীর ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ারের মুখে হাসি ফুটে উঠল। ঘর্মাক্ত বশির সাইকেল থেকে নামতেই ক্লেয়ার তাকে জড়িয়ে ধরলেন।
বশির চিঠি দিল। ব্রিগেডিয়ার চিঠি পড়লেন। পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণে রাজি হয়েছে। তবে আলাপ-আলোচনা করতে হবে।
ততক্ষণে আনিসুর রহমান পৌঁছে গেছে পাকিস্তানের ক্যাম্পে। তাকে বলা হলো, তুমিও বসো। খাওয়াদাওয়া করো। খাবারের অবস্থা খুব খারাপ। যে রুটি তোমাকে দেওয়া হবে, সেটা যদি তুমি দাঁত না লাগিয়ে ছিঁড়তে পারো তোমার জন্য আছে পুরস্কার।
আনিসুর রহমান সত্যি সত্যি সেই রুটি ছিঁড়তে পারছে না। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! এই রুটি কি সাইকেলের টায়ার দিয়ে তৈরি।
আহসান মালিক দ্বিতীয় চিঠিটাও পড়লেন।
ওয়্যারলেসে খবর আসছে। স্যার, দুরে দুজনকে দেখা যাচ্ছে স্যার। সাইকেলে আসছে। একজন ইন্ডিয়ান আর্মির ইউনিফর্ম পরা স্যার। ওভার।
ওকে আসতে দাও। ওভার।
ততক্ষণে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পোশাক পরা একজন আর একজন বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধা দুইটা সাইকেল চালিয়ে এসে হাজির হলেন। আলাপ-আলোচনা শুরু হলো।
শেষে সন্ধ্যার আগে আগে ১৫০ জন পাকিস্তানি সৈন্য, ৩০ জন রেঞ্জার আর ২৫ জন রাজাকার আত্মসমর্পণ করল।
তাদেরকে অস্ত্র হাতে ঘিরে রইল লুঙ্গি পরা, গেঞ্জি পরা, শার্ট পরা কয়েক শ মুক্তিবাহিনীর ছেলে। আর সঙ্গে রইল ৯৫ মাউন্টেন ব্রিগেডের ভারতীয় সৈনিকেরা। পাকিস্তানি সৈন্যরা অস্ত্র মাটিতে রাখল। বাংলাদেশের ছেলেরা চিৎকার করে উঠল : জয় বাংলা।
