.
আইএনএস বীরাক্রান্ত জাহাজ থেকে যুদ্ধবিমান উড়ে গিয়ে বোমা ফেলে কক্সবাজারের বিমানবন্দর অচল করে দেয়।
ভারতের বিমানবাহিনী পূর্ব ফ্রন্টে পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর কার্যক্ষমতা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খতম করে ফেলে। মূলত তারা বিমানঘাঁটির রানওয়েগুলোতে বোমা ফেলে যুদ্ধবিমানের ওড়ার ক্ষমতা নষ্ট করতে সক্ষম হয়। এরপর মুক্ত আকাশ পেয়ে বিমানবাহিনী শত্রুর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে বোমা ফেলতে থাকে নির্বিঘ্নে। এমনকি তারা হেলিকপ্টার দিয়ে মেঘনা নদী পার করে দেয় সৈন্যদের। ছত্রীসেনা নামিয়ে টাঙ্গাইল অঞ্চলে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ করে। দুই জায়গাতেই তাদের সহায়তা করে বাঙালিরা। টাঙ্গাইলে যেমন জনতা তাদের পাহারা দিয়ে রাখে, তেমনি কাঁদেরিয়া বাহিনীর হাজার হাজার সদস্যও ছত্রীসেনাদের নিরাপদ অবতরণ নিশ্চিত করতে পালন করে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা। মেঘনা নদীতে মাঝিরা শত শত নৌকা এনে সৈন্যদের রসদপত্র পারাপার করে দেয়। যেমন কামালপুর যুদ্ধে তিনজন। কিশোর তিনবার তিনটি চিঠি নিয়ে যায় ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ারের কাছ থেকে, একবার পাকিস্তানি ক্যাপ্টেন আহসান মালিকের কাছে, আরেকবার পাকিস্তানি লে. কর্নেল সুলতান আহমদের কাছে।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, কামালপুরের চিঠি নিয়া যাওনের ঘটনাটা কও না গো শুনি!
ব্যাঙ্গমি বলল, শুনবা? আচ্ছা কই!
.
কামালপুর বাংলাদেশ যুদ্ধের একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এটাকে বলা হয় ঢাকার প্রবেশদ্বার। জায়গাটা জামালপুরের বকশীগঞ্জ থানার সীমান্তঘেঁষা এলাকা। এই জায়গাটা পার হলে ঢাকার দিকে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর জন্য ঢাকার দিকে আসা সহজ হয়ে যাবে। পাকিস্তানিরা জানে জায়গাটার গুরুত্ব। তাই তারা একেবারে কঠিন নিচ্ছিদ্র প্রতিরোধ ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল কামালপুরে। কংক্রিটের বাংকার। প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র আর গোলাবারুদ। এপ্রিল থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বারবার এটাতে হামলা করেছে, উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু পাকিস্তানিরা ঘাটি ছাড়েনি।
১১ নম্বর সেক্টরের এই এলাকায় নিজের গ্রামের বাড়ির কাছে যুদ্ধ পরিচালনা করতে আসেন সেক্টর কমান্ডার আবু তাহের। আবু তাহের ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে, সেখান থেকে পালিয়ে কাশ্মীরের ভেতর দিয়ে বহু কষ্টে তিনি, মেজর মঞ্জুর প্রমুখ চলে আসেন কলকাতায়, থিয়েটার রোডের বাড়ির আঙিনায় তাঁবু গেড়ে পড়ে থাকেন, যাতে তাদের যুদ্ধে পাঠানো হয়, তখন মেজর তাহেরকে দেওয়া হয় ১১ নম্বর সেক্টরের দায়িত্ব, আর মেজর মঞ্জুরকে দেওয়া হয় ৮ নম্বর সেক্টরের কমান্ডারের দায়িত্ব। ১৪ নভেম্বর আবার আক্রমণ করল মুক্তিবাহিনী, তাহের নিজে উপস্থিত, যুদ্ধ চলছে, মুহূর্মুহূ বিস্ফোরণ, শত শত রাউন্ড গুলি মাথার ওপর দিয়ে বাতাসে শাঁই শাঁই শব্দ করে ছুটে যাচ্ছে, গোলা এসে পড়ছে পাশে, ফুটছে, ফাটছে। শব্দে মনে হচ্ছে যেন আতশবাজি হচ্ছে এই এলাকাজুড়ে। হঠাৎ একটা বিস্ফোরণ, আর মেজর তাহের দেখতে পেলেন তার একটা পা ক্ষতবিক্ষত, রক্তে ভেসে যাচ্ছে প্যান্ট, ভেসে যাচ্ছে ঘাস-মাটি। সেই যুদ্ধে ক্ষতি স্বীকার করতে বাধ্য হলো পাকিস্তানি মিলিটারি, কিন্তু তারা পোস্ট ছাড়ল না।
মেজর তাহের হাসপাতালে, তার পা কেটে ফেলতে হবে। ২৪ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি পোস্টটাকে ঘিরে রাখল। পাকিস্তানি মিলিটারি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, কোনো অস্ত্র, গোলাবারুদ এমনকি খাদ্য-পানীয় আসার কোনো রাস্তা তাদের খোলা নেই।
৩ ডিসেম্বর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ ঘোষিত হলে গড়ে উঠল ভারত বাংলাদেশ যৌথ কমান্ড। ৯৫ মাউন্ট ব্রিগেডের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হরদেব সিং ক্লেয়ার নিজে উপস্থিত হলেন কামালপুরে।
এবার ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনী একযোগে হামলা করবে কামালপুর পাকিস্তানি মিলিটারিদের অবস্থানের ওপর। ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার ছিলেন সজ্জন। তিনি দেখলেন, এই যুদ্ধে পাকিস্তানিদের জেতার কোনোই কারণ নেই। এমনিতেই ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনী সংখ্যায় শক্তিতে বেশি, তার ওপর মুক্তিযোদ্ধারা দীর্ঘদিন তাদের অবরুদ্ধ ও বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে বলে তাদের অস্ত্রশস্ত্র, খাওয়ার পানির সংকটে আধমরা হয়ে থাকার কথা। তিনি চিঠি লিখলেন ক্যাপ্টেন আহসান মালিকের কাছে : অকারণ রক্তক্ষয় আমার পছন্দ নয়। আত্মসমর্পণ করো। জেনেভা কনভেনশন অনুসারে তোমাদের নিরাপত্তা ও সম্মান দেওয়া হবে।
কিন্তু চিঠি নিয়ে যাবে কে?
আমি। আমি যাব।
অগ্রহায়ণের সেই সকালে কেবল কুয়াশা কাটতে শুরু করেছে। সূর্য উঠে গাছের পাতায় ঘাসের ডগায় শিশিরবিন্দুগুলোকে রোদে শুষে নিতে শুরু করেছে পরম আদরে। মাসের পর মাস গোলাগুলির শব্দে এলাকায় কোনো পাখি নেই, তবে গরু-ছাগল যেসব আছে, সেগুলো যুদ্ধের দামামা শুনতে অভ্যস্ত।
তুমি কে? জিজ্ঞেস করলেন ব্রিগেডিয়ার ক্লেয়ার।
আমি বশির আহমেদ।
তুমি ইংরেজি জানো?
ইয়েস স্যার।
কোন ক্লাসে পড়ো।
আই রিড ইন ক্লাস টেন স্যার।
হোয়াটস দ্য নেইম অব ইয়োর স্কুল।
কামালপুর কো-অপারেটিভ স্কুল স্যার।
ক্লেয়ার তাকালেন ছেলেটির মুখের দিকে। গোলাকার মুখ। বড় বড় ভাসা ভাসা চোখ। চোখের বড় বড় পাতা এক অপরূপ মায়া সৃষ্টি করেছে। অবয়বজুড়ে। কাঁধে একটা লাইট মেশিনগান। এই ছেলে যুদ্ধে এসেছে কেন?
