হেলিকপ্টার বাতাসে ভাসতে ভাসতে নামল আরও একটা দেয়ালঘেরা উঠানে। স্টার্ট বন্ধ হওয়ার পর হেলিকপ্টারের দরজা খুলে দেওয়া হলো। মুজিব নামলেন।
দেখতে পেলেন, তাঁর সামনে হাবিব আলী, মিয়ানওয়ালি জেলের গভর্নর। ছোটখাটো চেহারার মানুষটি যখন তার সামনে দাঁড়ান, তখন মনে হয়, তিনিই অপরাধী। হাবিব আলী তাঁকে নিয়ে এগিয়ে যেতে থাকলেন।
মুজিবকে রাখা হলো ১০ নম্বর ব্যারাকের পেছনে জেনানা ফাটকে। নারী বন্দিদের তাড়াহুড়া করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ১০ নম্বর ব্যারাকে ছিল ভারতীয় বন্দীরা। তার পেছনে নারী বন্দিদের একটা অংশে রাখা হয়। বাঙালি বন্দীরা ছিল আরেক অংশে।
হাবিব আলী খানকে দেখে মুজিব বুঝলেন তিনি মিয়ানওয়ালি কারাগারে আবারও এসেছেন।
তখন অনেক রাত। ৭৩ নম্বর সেলে আটকানো হলো তাকে। মুজিব ঘুমানোর চেষ্টা করলেন।
পরদিন বিকেলবেলা সেলের দরজা খুলে অপরিসর প্রাঙ্গণে তাঁকে হাঁটার। সুযোগ দেওয়া হলো। তিনি দেখলেন যে সেখানে একটা বড় গর্ত করা হয়েছে। তিনি প্রহরীকে জিজ্ঞেস করলেন, এই গর্ত কেন?
প্রহরী বলল, এই গর্ত কেন সে জানে না।
এই গর্ত কেন, তা জানত ভারতীয় বন্দীরা। তাদের দিয়ে সারা দিন ধরে এই গর্ত খোঁড়া হয়েছিল। মুজিবকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে এখানে কবর দেওয়া হবে। এই হলো ইয়াহিয়া খানের নির্দেশ।
হাবিব আলী খান তার সঙ্গে দেখা করতে এলেন।
মুজিব বললেন, আমাকে ফাঁসি দেবে তাতে তো কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু আমার কবর এই দেশের মাটিতে হতেই পারে না। আমার কবর হবে বাংলাদেশের মাটিতে।
হাবিব আলী হাত কচলাতে লাগলেন। তিনি বললেন, ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের যুদ্ধ বেধে গেছে। এই জন্য এটা হলো ট্রেঞ্চ। যদি বিমান আক্রমণ হয়, তাহলে এখানে আশ্রয় নিতে হবে।
মুজিব বললেন, বিমান আক্রমণের ভয়ে তোমরা গর্তে লুকাতে পারো, আমি লুকাব না।
.
মিয়ানওয়ালি জেলে বন্দীরা জেনে গেলেন শেখ মুজিব আছেন এখানে। ভারতীয়রা উচ্ছ্বসিত। কী করে একনজর শেখ মুজিবকে দেখা যায়। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অনেক সৈনিক এই জেলে ছিলেন। তাঁরা গোপনে তাদের ফটক থেকে সলিটারি সেলের মধ্যে সুড়ঙ্গ খুঁড়তে আরম্ভ করলেন। মুজিবকে বের করে নিয়ে তাঁরা পালাবেন। কিছুদিনের মধ্যেই জেলের কর্মীদের কাছ থেকে তারা জানলেন যে মুজিব ফাঁসির জন্য বরাদ্দ নিঃসঙ্গ সেলে নেই। তাঁকে জেনানা ফাটকে রাখা হয়েছে। তারা খুবই হতোদ্যম হয়ে পড়লেন।
প্রায়ই সাইরেন বাজতে লাগল। বাতি সব নিভিয়ে দেওয়া শুরু হলো। আকাশে বিমানের ওড়াউড়ি শুরু হলো। ভারতীয় বন্দীরা হাততালি দিত। বাঙালি বন্দীরা কল্পনা করত যে তাদের জেলখানার দেয়াল বোমায় উড়ে যাবে আর তারা তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা বঙ্গবন্ধু মুজিবকে নিয়ে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই হচ্ছিল না।
শুধু শেখ মুজিবের জন্য বরাদ্দ খাওয়াদাওয়ার পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া হলো।
সামরিক কর্তৃপক্ষ জেল কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছে, শেখ মুজিবের মৃত্যুদণ্ডাদেশে ইয়াহিয়া খান সাইন করে রেখেছেন। শুধু তারিখটা বসিয়ে নিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করাটা বাকি। তা করা হতে পারে যেকোনো সময়। ফাঁসির মঞ্চ যেন প্রস্তুত করে রাখা হয়।
.
মুজিব দেখলেন, কবর খোঁড়া হচ্ছে। পরের দিন দেখলেন, আবার ভরে ফেলা হলো খোঁড়া গর্ত। পরে আবার খোঁড়া হচ্ছে।
মুজিব আবার বিড়বিড় করলেন, কাওয়ার্ডস ডাই মেনি টাইমস বিফোর দেয়ার ডেথস, দ্য ভ্যালিয়েন্ট নেভার টেস্টস ডেথ বাট ওয়ান্স।
৯১
ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি বসে যুদ্ধ পরিস্থিতি আলোচনা করছে :
ভারতীয় বাহিনী এবং মুক্তিবাহিনীর একযোগে আক্রমণ–ভারতের যুদ্ধ ঘোষণার পরপরই বাংলাদেশে মিত্রবাহিনী জলে-স্থলে-অন্তরিক্ষে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করতে লাগল। পশ্চিম সীমান্তে লড়াই হতে লাগল ভয়াবহ, প্রাণঘাতী, কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান।
৪ ডিসেম্বরের আগেই পাকিস্তানি সৈন্যরা যশোর ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এটা ঘটেছে ২ ডিসেম্বরেই। অর্ধেক সরে গেছে কুষ্টিয়ার দিকে, অর্ধেক গেছে খুলনার দিকে।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, খুলনার দিকে যাওয়ার কারণ নাকি আছিল যদি আমেরিকা সপ্তম নৌবহর পাঠায়, তাইলে জাহাজে কইরা হেরা পালায়া যাইব।
ব্যাঙ্গমি বলল, ৩ ডিসেম্বরের আগেই যশোরে পাকিস্তানি বিমান বিধ্বস্ত হয়, আর পাইলট প্যারাস্যুটে নাইমা ইন্ডিয়ান গো যুদ্ধবন্দী হয়।
ব্যাঙ্গমা বলল, ৪ ডিসেম্বরের আগেই পাকিস্তানের গর্ব নৌবাহিনীর সাবমেরিন গাজি বিশাখাপত্তম সমুদ্রবন্দরের কাছে বিধ্বস্ত হয়। সেখানকার জাইলা আর মাঝিরা দেখতে পায় কতগুলা লাইফবোট ভাইসা উঠতাছে।
ব্যাঙ্গমি বলল, ভারতে এইটা নিয়া দুই মত আছে। জেনারেল জ্যাকব বলেন, গাজি নিজেরা মাইন পাততে গিয়া সেই মাইনের বিস্ফোরণে ধ্বংস। হইছে। আইএনএস রাজপুতের ডেপথ চার্জে গাজি ধ্বংস হইছে, এই দাবিও ভারতীয় নৌবাহিনী কইরা থাকে। তবে ঠিক কোন গভীর বাণে কীভাবে গাজি বিধ্বস্ত হইছে, আইএনএস রাজপুত সেটা টের পায় নাই। মাঝিরাই ধ্বংসাবশেষ ভাইসা উঠতে দেইখা খবর দিছে। পরে ইন্ডিয়ান নেভি ভালো কইরা খোঁজ নিয়া তো অবাক, ঘটনা সত্য, গাজিরে খোদা তুইলা নিছে। যে দুইজন মাঝি গাজির দুইটা লাইফ ভেলা উদ্ধার কইরা আইনা জমা দিছিল, তাগো ৫০০ রুপি কইরা ১০০০ রুপি পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম পালার্মেন্টে ঘোষণা দেন, গাজিরে ধ্বংস কইরা দেওয়া হইছে। টেবিল চাপড়ানোর শব্দে গাজির বাকি ধ্বংসাবশেষও ধ্বংস হইয়া যায়।
