পাকিস্তান ব্যাপারটাই একটা আগাগোড়া ভুল। শেখ মুজিব ভাবতে থাকেন।
এটা একটা মিলিটারিতন্ত্র। এর আসল প্রতীক হলো, বুট, হেলমেট, বন্দুক, বেয়নেট।
গণতন্ত্র জিনিসটা এর মধ্যে নেই। পুরোটাই একটা সামন্ততান্ত্রিক সমাজ। যেখানে আছে কয়েকজন সামন্ত মহাপ্রভু, এখন যারা হয়েছে মার্শাল লর্ড। আর তারা পাহারা দিচ্ছে কতগুলো পুঁজিপতিকে, যাদের আছে সামন্ত উত্তরাধিকার। মদ, নারী, শিকার, প্রমোদ যাদের জীবনাচারের নিত্য উপাদান। সামন্ততন্ত্রের আরেক উপাদান, ধর্মের অপব্যবহার, নিজেদের শোষণ, দুঃশাসন, অনাচারের বর্ম হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করা–সেটাও আছে পুরোপুরিই। ভয়াবহ ব্যাপার হলো, তারা আবার পাহারা দিচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থকে। সবটা মিলেমিশে পাকিস্তান একটা কিম্ভুতকিমাকার দানবে পরিণত হয়েছে, যেখানে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতার বিচার করে অবৈধভাবে বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখলকারীরা। সেই পাকিস্তান ভেঙে বাঙালিরা বেরিয়ে আসবে, একটা সুন্দর সমাজ তারা গড়ে তুলবে তাদের নদীবোয়া সবুজ সুন্দর পলিমাটির দেশটাতে, যেখানে মানুষের ঘুম ভাঙবে বন্দুকের গুলিতে নয়, পাখির ডাকে, যেখানে নদীতে সামরিক যুদ্ধযান নয়, শোনা যাবে ভাটিয়ালি গান আর জলের কল্লোল, যেখানে রেডিওতে আধা উর্দু আধা ইংরেজিতে সামরিক ফরমান নয়, শোনা যাবে লালন, নজরুল, রবীন্দ্রসংগীত। যেখানে শিশুরা স্বপ্ন দেখবে বড় হয়ে একজন হাবিলদার হওয়ার নয়, একজন শিক্ষক হওয়ার।
আমাকে মেরে ফেলবে, তাতে কিছুই যায় আসে না, শুধু আমার এই আত্মদান যেন বাংলার মানুষকে শান্তি দেয়, সুখ দেয়, সমৃদ্ধি দেয়।
এইভাবে ভাবা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। একজন ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত আসামি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষার দিনগুলোকে সবচেয়ে সুন্দর, সবচেয়ে সুখের করতে পারে শুধু এই ভাবনাই যে সবাইকে একদিন মরতেই হয়, কিন্তু আমি মারা যাচ্ছি বৃহত্তর স্বার্থে, আমাদের সন্তানদের, আমাদের শিশুদের একটা স্বাধীন দেশ দিয়ে যাব বলে। আহ! মৃত্যুও কত না সুন্দর হতে পারে!
হঠাই বাইরে হেলিকপ্টার নামার শব্দ পাওয়া গেল। তাঁর মনে হলো, লায়ালপুর জেলে তাঁকে আনা হয়েছিল একটা হেলিকপ্টারে। আবার কি তাঁকে লায়ালপুর থেকে অন্য জেলে নেওয়া হবে? এরই মধ্যে তিনটা জেল দেখে ফেলেছেন। তাকে এক জেলে তারা রাখতে চায় না। তিনি একজন চিকিৎসকের কাছে শুনেছেন, তাকে কোথায় রাখা হয়েছে, এটা বাইরের কেউ জানে না, তারপরও ভয় আছে যে বাঙালি বন্দীরা জেল ভেঙে তাঁকে নিয়ে যেতে পারে, কিংবা ভারতীয়রা কমান্ডো বাহিনী পাঠিয়ে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যেতে পারে।
একটু পরে সেলের দরজা খুলে গেল। জেলার নিজে এসেছেন। সঙ্গে দুজন সান্ত্রি।
জেলার বললেন, আপনাকে এক্ষুনি বেরোতে হবে।
তার চোখ পিটপিট করে একবার খুলছে, একবার বন্ধ হচ্ছে।
শেখ মুজিব বললেন, ঘটনা কি আজকে রাতেই ঘটতে যাচ্ছে? আমি তাহলে একটুখানি কোরআন শরিফ থেকে পাঠ করে নেব। আর দুই রাকাত নামাজ আদায় করে নেব। সে জন্য আমি সময় চাইব যে আমাকে শাওয়ার নিতে দেওয়া হোক।
জেলার বললেন, আপনাকে আরেকটা কারাগারে নেওয়া হচ্ছে। লায়ালপুরে আপনার পাট চুকল। আপনার জন্য বাঙালি বাবুর্চিকেও আমরা ওই জেলে পাঠিয়ে দেব।
শেখ মুজিব বললেন, আমাকে কোন জেলে নেওয়া হচ্ছে?
আমি সেটা জানি না। আপনার জন্য বাইরে হেলিকপ্টার অপেক্ষা করছে।
এই রাতের অন্ধকারে হেলিকপ্টার যেতে পারবে?
হ্যাঁ। এগুলো সামরিক হেলিকপ্টার। রাতেও উড়তে পারে।
শেখ মুজিবের রেডি হতে পাঁচ মিনিটের বেশি লাগল না। নিজের জিনিস বলতে তাঁর কাছে কিছু নেই। লুঙ্গি, গেঞ্জি, পায়জামা যা ছিল, জেলখানার কর্মীরাই তা গুছিয়ে ব্যাগে ভরল।
শেখ মুজিব সেলের বাইরে এলেন। বারান্দা দিয়ে অনেকটা হেঁটে তিনি এলেন মিয়ানওয়ালি জেলের উঠানে। একটা হেলিকপ্টার সেখানে অপেক্ষা করছে।
তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। আকাশ পরিষ্কার আর আকাশে জ্বলজ্বল করছে একটা চাঁদ। চাঁদের আলো দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন। পাতলা মশারির মতো কুয়াশা ঝুলছে। তার গায়ে চাঁদের আলো সোনার রেণুর মতো ভাসছে। ঠিক একই চাঁদ উঠেছে বাংলাদেশের আকাশে। বাংলাদেশে এখন অগ্রহায়ণ মাস। সামনে পৌষ মাস আসছে। কৃষকেরা কি ধান কাটা শুরু করে দিয়েছে? কিষানিরা কি সারা রাত কেঁকিতে ধান ভানছে আর গীত গাইছে? শেখ মুজিব তার বক্তৃতায় একটা কবিতা বলতেন : বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এবার আসিলে তব বধিব পরান। বাংলাদেশের মানুষ কি প্রাণ দিয়ে ধান রক্ষা করছে? রক্তবোনা ধান? শাবাশ বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলেপুড়ে মরে ছারখার তবুও মাথা নোয়াবার নয়!
তিনি হেলিকপ্টারে উঠে বসলেন। একটা সিটবেল্ট বেঁধে নিতে হলো। তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসের ব্যাগটা রাখা হলো তাদের সিটের পেছনে। একজন পাইলট, তার পাশে একজন কো-পাইলট। তার দুই পাশে দুই জন সশস্ত্র সৈনিক। তিনি দেখলেন হেলিকপ্টারে আরও কজন উর্দি পরা সশস্ত্র সৈনিক বসা। স্টার্ট নিল হেলিকপ্টার। পাখা ঘুরছে। বিকট শব্দ হচ্ছে। বাতাসে চারপাশে ঝড়ের মতো সৃষ্টি হয়েছে। হেলিকপ্টার আকাশে উড়তে লাগল। তিনি হেলিকপ্টারের জানালা দিয়ে বাইরের আকাশ দেখতে লাগলেন। নিচে শহরে আলো কমই।
