সংবাদকর্মীরা এলেন। তাজউদ্দীন আহমদকে জিজ্ঞেস করলেন, আজ আপনার মনের অবস্থা কী?
তাজউদ্দীন বললেন, আমার আবার প্রতিক্রিয়া কী? একটা নতুন শিশুর জন্ম হলো। অথচ শিশুটির জনক শত্রুদের কারাগারে বন্দী। আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতির কথা বারবার স্মরণ করছি। নবজাতকের কান্না শুনে তার পিতা যেমন খুশি হন, বঙ্গবন্ধু উপস্থিত থাকলে তো তিনি তেমনি খুশি হতে পারতেন।
তাজউদ্দীন কেঁদে ফেললেন।
.
রাতের বেলা ধানমন্ডির ২৮ নম্বর রোডের বাড়িতে সবাই রেডিও শুনছেন। রেনু মাথার চুল আঁচড়াচ্ছেন। হাসিনার চুল বেঁধে দিলেন রেহানা। রাতের খাওয়া হয়ে গেছে। বাসনকোসন ধুয়ে সবাই এখন রেডিও শোনার জন্যই তৈরি। প্রথমে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র। তারপর বিবিসি। তারপর আকাশবাণী।
আকাশবাণী কলকাতা। খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়।
খবরের শেষে সংবাদ পরিক্রমা। লিখেছেন প্রণবেশ সেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ স্বাধীন বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বললেন, বঙ্গবন্ধু আজ এই শুভক্ষণে আমাদের মাঝে নেই, এই বেদনা কোথায় রাখি! বলে তিনি কাঁদতে লাগলেন!
তার এই কান্না সঞ্চারিত হলো ১৮ নম্বরের বাড়িতে। কাঁদতে লাগলেন হাসিনা, কাঁদতে লাগলেন রেহানা। রাসেল চোখের পানি ফেলে গোপনে। রেনু শক্ত হয়ে রইলেন।
খোকা বললেন, চল হাসিনা। আমাদের এই বাড়ির মিলিটারিগুলোকে বের করে দিই। আমাদের দেশ স্বাধীন দেশ। ওরা দখলদার। ভারত এই দেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সারা বিশ্ব দেবে। চল।
রেনু বললেন, স্বামী গেছে। দুই ছেলে গেছে যুদ্ধে। ভাগনে-ভাতিজারা গেছে। খোকা তুই আর পাগলামো করিস না। শান্ত হয়ে থাক। আর কটা দিন দেখ। আর দশ দিনের মধ্যেই দেখিস এরা ভেগে যাবে।
ব্যাঙ্গমা বলে, বেগম মুজিবের কথা ঠিক হইছিল। দশ দিন পর ১৬ ডিসেম্বরে পাকিস্তানি মিলিটারি আত্মসমর্পণ করছিল।
ব্যাঙ্গমি মাথা নাড়ে।
.
৭ ডিসেম্বর ভারতীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তা পি এন ব্যানার্জি এসেছেন মুজিবনগরে। তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা করে চলে যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রীর সচিব ফারুক বসে ছিলেন সিঁড়িতে। সেখান থেকে আকাশ দেখা যায়। আকাশ ঝকঝক করছে। অসম্ভব নীল আর রোদ ঝলমল আজকের আকাশটা। ব্যানার্জি চলে যাওয়ার পর তাজউদ্দীন বেরিয়ে এলেন কক্ষ থেকে। ফারুককে বললেন, এই চিঠিটা পড়েন। সুন্দর চিঠি।
ফারুকের সঙ্গে রিডিং গ্লাস নেই। তাজউদ্দীন তাঁর নিজের চশমাটা দিয়ে বললেন, এটা লাগিয়ে পড়ুন।
ইন্দিরা গান্ধী তাজউদ্দীনের উদ্দেশে ইংরেজিতে লিখেছেন :
৪ ডিসেম্বরে মাননীয় ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আপনি যে বার্তা আমার কাছে পাঠিয়েছেন, তাতে আমার সহকর্মীবৃন্দ ও আমি খুবই অভিভূত হয়েছি। চিঠি পাওয়ার পর আপনাদের সাফল্যজনক নেতৃত্বে পরিচালিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতিদানসংক্রান্ত আপনাদের অনুরোধ ভারত সরকার পুনর্বিবেচনা করেছে। আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বর্তমানে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তার প্রেক্ষাপটে ভারত সরকার আপনাদের। স্বীকৃতি দেবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আজ সকালে আমি পার্লামেন্টে এ ব্যাপারে একটা বিবৃতি দিয়েছি। তার অনুলিপি এর সঙ্গে পাঠালাম।
বাংলাদেশের জনসাধারণ দুঃখ-কষ্টের মধ্যে কালযাপন করেছে। স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য আপনাদের যুবসমাজ নিঃস্বার্থভাবে আত্মাহুতির মাধ্যমে এক মরণপণ সংগ্রামে লিপ্ত। ভারতের জনসাধারণও একই মূল্যবোধকে রক্ষার উদ্দেশ্যে যুদ্ধে অবতীর্ণ। আমাদের মহান উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে এই অধ্যবসায় ও আত্মদান আমাদের দুই দেশের জনসাধারণের মধ্যে বন্ধুত্বকে আরও সুদৃঢ় করবে। পথ যতই দীর্ঘ হোক না কেন এবং ভবিষ্যতে আমাদের জনসাধারণের যত ত্যাগ করতে হোক না কেন, বিজয়ের মালা আমরা বরণ করবই। এ উপলক্ষে আমি আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে এবং আপনার সহকর্মী ও বাংলাদেশের বীর জনতাকে আমার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি।
আমি আপনার মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামকে আমাদের পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস প্রদান করছি।
ইন্দিরা গান্ধী।
ফারুক বললেন, সত্যিই খুব সুন্দর চিঠি।
চ্যাটার্জিবাবু সিল আর প্যাড ফেরত দিয়ে গেছেন। সেটা নিয়ে ফারুক গেলেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে। বললেন, এটা একটা ঐতিহাসিক জিনিস। আপনি এই সিল আর প্যাড রেখে দিন। স্মারক হিসেবে এটা আপনার সংগ্রহেই থাকা উচিত। অফিসের কাজ সারিয়ে নেওয়ার জন্য আমি নতুন সিল-প্যাড বানিয়ে নিয়েছি।
