সোভিয়েত ইউনিয়নের স্থায়ী প্রতিনিধি ইয়াকফ মালিক। তিনি হাতে তুললেন বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর একটা নথি, যেটা আলোচনার শুরুতেই সবার হাতে হাতে দেওয়া হয়েছে। তিনি বললেন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ যা নিয়ে, সেই বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের কথা তো আমাদের শুনতে হবে। তিনি জাতিসংঘের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করছেন। আমরা ডাকলেই তিনি আসতে পারেন।
পাকিস্তান তীব্র বিরোধিতা করল। চীন বলল, এটা অন্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা হবে, কাজেই জাতিসংঘের নীতিবিরোধী।
ইয়াকফ মালিক আইন দেখালেন, নিরাপত্তা পরিষদ মনে করলে তৃতীয় কাউকে ডেকে তার কথা শুনতে পারে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তর্কবিতর্ক চলতে লাগল।
সোভিয়েত ইউনিয়ন বলল, আমাদের প্রস্তাব হলো, পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক ফয়সালা দরকার।
চীন নতুন এসেছে নিরাপত্তা পরিষদে। তারা বলল, ভারতের এই নগ্ন আগ্রাসনের প্রতিবাদে…
আমেরিকার প্রস্তাব সমর্থন করল ১১ সদস্য। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দিয়ে দিল। রাশিয়ার প্রস্তাব সমর্থন করল শুধু পোল্যান্ড। চীনেরটা কেউই করল না…
ব্রিটেন আর ফ্রান্স ভোটদানে বিরত রইল।
এই সব বিতর্ক চলতে থাকুক। ইন্দিরা গান্ধী তাঁর পথে চলছেন। তিনি চাচ্ছেন জাতিসংঘ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাস করার আগেই ঢাকার পতন ঘটাতে।
৮৯
৪ ডিসেম্বরে সৈয়দ নজরুল ও তাজউদ্দীন আহমদ চলে গিয়েছিলেন দিল্লি। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন একটা চিঠি দিয়ে এসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর হাতে। তাতে তারা বলেছিলেন :
ম্যাডাম প্রধানমন্ত্রী, সম্মানের সঙ্গে জানাচ্ছি যে ৩ ডিসেম্বর আপনার দেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সরাসরি আগ্রাসনের প্রেক্ষাপটে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশের যেকোনো সেক্টরে অথবা ফ্রন্টে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অব্যাহত লড়াই জোরদার করতে প্রস্তুত রয়েছে। আমরা যদি আনুষ্ঠানিকভাবে পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করতে পারি তাহলে পাকিস্তানের সামরিক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আমাদের সম্মিলিত প্রতিরোধ ব্যাপ্তি লাভ করবে। এই প্রেক্ষাপটে আমরা আপনার কাছে পুনরায় অনুরোধ করছি, ভারত সরকার অবিলম্বে আমাদের দেশ ও সরকারকে স্বীকৃতি দান করুন। আমাদের আন্তরিক আশা যে আমাদের যৌথ প্রতিরোধের ফলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের হীন পরিকল্পনা ও জঘন্য ইচ্ছা ব্যর্থ হতে বাধ্য হবে এবং আমরা সফল হব।
আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আপনাদের ন্যায়নিষ্ঠ সংগ্রামের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন জানাচ্ছি।
৫ ডিসেম্বর সৈয়দ নজরুল ও তাজউদ্দীন দিল্লি থেকে ফিরে এলেন কলকাতায়।
৬ ডিসেম্বর সোমবার সকালবেলা।
ইন্দিরা গান্ধী ভাষণ দিচ্ছেন পার্লামেন্টে। তিনি বললেন, আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এবং বাংলাদেশ সরকারের বারবার অনুরোধে যথেষ্ট বিবেচনার পর ভারত সরকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
মাননীয় সদস্যরা জেনে সুখী হবেন যে বাংলাদেশ সরকার তাদের রাষ্ট্রীয় নীতির মৌলিক আদর্শ ঘোষণা করেছে। আর সেসব হচ্ছে, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা…তাদের ঘোষিত আদর্শের সঙ্গে ভারতের আদর্শের মিল রয়েছে। একসঙ্গে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে আমরা সৎ প্রতিবেশী হয়ে বাস করার এমন এক দৃষ্টান্ত তুলে ধরব যাতে এ অঞ্চলে শান্তি, শৃঙ্খলা ও প্রগতি দীর্ঘস্থায়ী হয়।
সরকারি দল, বিরোধী দল সবাই একযোগে টেবিল চাপড়াতে লাগল। হর্ষধ্বনি উঠল পার্লামেন্টে। এই রকম ঐকমত্য ভারতের পার্লামেন্টে নজিরবিহীন।
পার্লামেন্টে উপস্থিত ছিলেন দিল্লিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। সেপ্টেম্বর মাসে তিনি পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ করে বাংলাদেশ পক্ষে যোগ দিয়ে রাষ্ট্রদূতের কাজ করে যাচ্ছিলেন। পার্লামেন্টে লোকজন তাকে বিপুলভাবে ফুলের মালা দিতে লাগল। তিনি বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, আপনি শুধু ভারতের নেত্রী নন, আপনি বিশ্বেরও একজন নেত্রী। তার বক্তৃতা ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হলো।
খবর ছড়িয়ে পড়ল বিদ্যুৎবেগে। কলকাতা থিয়েটার রোডের কর্মীরা হর্ষধ্বনি দিয়ে আঙিনায় বেরিয়ে এলেন। জনসংযোগ বিভাগের কর্মী আলী তারেক বাংলাদেশ সরকারের অফিস ভবনের সামনে লাল-সবুজ-হলুদ পতাকা। উড়িয়ে দিলেন। ডিসেম্বরের উত্তুরে হাওয়ায় সেই পতাকা উড়তে লাগল গর্বভরে।
অফিসে ছিলেন মুক্তিবাহিনী প্রধান ওসমানী। আর ছিলেন তাঁর এডিসি শেখ কামাল। ফারুক আজিজ খান তাদের দুজনকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন। জানালেন। অফিসের ফটোগ্রাফার সেই ফুল দেবার ছবিও তুলে ফেললেন। চটপট। শেখ কামালও ওসমানীর হাতে ফুল তুলে দিলেন। মিষ্টি বিতরণ চলল অফিসে।
.
তাজউদ্দীন অফিসে এলেন বিকেলে। কালো রঙের অ্যাম্বাসেডর গাড়ি তাঁকে নিয়ে এসে অফিসের আঙিনায় থামল। পেছনে আরেকটা গাড়িতে নিরাপত্তাকর্মীরা। তাজউদ্দীন গাড়ি থেকে নামলেন। সবুজ রঙের সাফারি পরনে তার। তাঁর পাশে উৎফুল্ল সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সবাই দৌড়ে গেল তাঁদের কাছে। তাঁদের বিপুলভাবে মাল্যভূষিত করা হলো। স্লোগান উঠল : জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু। জয় ইন্দিরা গান্ধী।
