ব্যাঙ্গমি বলল, নিক্সন আর কিসিঞ্জার। .
ব্যাঙ্গমা বলল, আরও নির্দিষ্ট কইরা ভাবলে মাত্র একজন মানুষ। নিক্সন।
ব্যাঙ্গমি বলল, দ্যাশে দ্যাশে যুদ্ধ লাগে। সমাজে-রাষ্ট্রে কত বিপ্লব হয়। এই সবের অর্থনৈতিক কারণ, সাংস্কৃতিক কারণ, ঐতিহাসিক কারণ–পুঁজি, রাষ্ট্রের লাভ, ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ–কত কিছু দিয়াই তো জ্ঞানী মানুষেরা ব্যাখ্যা করে। কিন্তু এর বাইরে যে একটা কারণ থাকতে পারে, যার নাম ব্যক্তিমানুষের মন–এটার কথা কেউ সাধারণত কয় না।
ব্যাঙ্গমা বলল, ঠিক কইছ। প্রেসিডেন্ট নিক্সন ইয়াহিয়া খানের লগে এক ব্যাখ্যার অতীত প্রেমের বন্ধনে জড়ায়া আছিলেন। আর ইন্দিরা গান্ধীকে তিনি দুই চোখে দেখতে পারেন না। এইটা যে কত বড় ফ্যাক্টর হইয়া দাঁড়াইছিল!
ব্যাঙ্গমি বলল, আর পাকিস্তানের জন্মের লগে লগে তার উপরে একটা জন্ম-অভিশাপ ভর করছিল। আমেরিকা কইছিল, এই নয়া রাষ্ট্র পাকিস্তানের লগে আমাদের দোস্তি করতে হইব। রণকৌশলগতভাবে জায়গাটা ভীষণ ইম্পরট্যান্ট। সেই যে আমেরিকার প্রেমের আসর পড়ল পাকিস্তানের উপরে, ২৪ বছরে সংবিধান দিতে পারল না, একটা ইলেকশন হইল, তার ফল মিলিটারি ভুট্টো পশ্চিমারা মাইনা নিতে পারল না। খালি ১৯৭১-এ নয়, এর পরেও কোনো দিনও পাকিস্তান মিলিটারি, জঙ্গি, মৌলবাদের হাত থাইকা বাইরাইতে পারব না।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, আসো আমরা নিক্সন আর কিসিঞ্জারের কর্মকাণ্ড ফলো করতে থাকি।
নিক্সন গেছেন ফ্লোরিডা। বেড়াইতে। মিয়ামি সৈকতে খালি গা হইয়া রোদ পোহাইবেন, চামড়ার রং বাদামি করবেন, এই হলো উদ্দেশ্য। সেইখানে, সমুদ্রের দিকে মুখ কইরা বইসা, বিয়ারের ক্যান সামনে রাইখা, উড়ন্ত গাঙচিলের পাখায় রোদের ঝলক দেখতে দেখতে নিক্সন খেইপা উঠেন।
আমার কিছু ভালো লাগে না। আমার কিছু ভালো লাগে না। আমার বাথরুম পাচ্ছে। আমার মনের ওপরে অসহ্য চাপ। নিক্সন বিড়বিড় করেন। তারপর তিনি বলেন, ওই মিয়া ফোন লাগাও।
কোথায় ফোন লাগাব স্যার।
কিসিঞ্জাররে ধরায়া দেও।
হ্যালো।
হেনরি, আমি তো অসুস্থ হয়ে পড়ছি। একেবারে অসুস্থ।
কেন? শরীরটা খারাপ?
মন খারাপ। মেজাজ খারাপ। আমি অসুস্থ। যখনই আমি আমার পেয়ারের পাকিস্তানের কথা ভাবি, হেনরি, আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। ইন্ডিয়া কী দশা করে ফেলল পাকিস্তানের। আমরা কি ওই কুকুরিকে সাবধান করে দিইনি? দিয়েছি। তারপরও তার এত বড় সাহস! হেনরি তুমি একটা কিছু করো।
আচ্ছা আমি দেখছি। আমি ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের মিটিং ডাকছি। আমরা অবশ্যই একটা কিছু করব।
কিসিঞ্জার কী কী করা যায়, ভাবছেন। কাগজপত্র তৈরি করছেন। একটু পরে আবার ফোন।
হেনরি?
ইয়েস প্রেসিডেন্ট।
তুমি কী করছ? পাকিস্তানের ব্যাপারে তুমি কী করছ? তুমি তো জানো আমরা পাকিস্তানের পক্ষে। তুমি একটা কিছু করো। শক্ত কিছু করো।
অবশ্যই।
কিসিঞ্জার খেতে বসেছেন। দুপুরের লাঞ্চে তিনি আজ খাবেন একটা স্যান্ডউইচ, সঙ্গে একটুখানি ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। আর কালো কফি।
আবারও ফোন।
হ্যালো হেনরি।
ইয়েস, প্রেসিডেন্ট।
তুমি কি বুঝছ আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। তুমি এই বাস্টার্ড ইন্ডিয়ানদের বিরুদ্ধে কী করছ আমাকে জানাও।
বিকেলে ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের মিটিং বসল। কিসিঞ্জার বললেন, প্রেসিডেন্ট অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তাঁর হুকুম আমরা যেন পাকিস্তানের পক্ষে থাকি। কী করা উচিত বলুন।
সবাই মাথা চুলকাতে লাগল। কী করা উচিত? আমরা জাতিসংঘে যেতে পারি।
রাইট।
আমরা বলতে পারি, ইন্ডিয়া নগ্ন আগ্রাসন চালাচ্ছে। এটা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। ইন্ডিয়া আর পাকিস্তান তাদের সৈন্য নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে আনবে।
গ্রেট আইডিয়া। পাকিস্তান ইন্ডিয়ার ভেতরে ঢুকতে পারে নাই। কাজেই এ কথা বলার অর্থই হলো আমরা পাকিস্তানের পক্ষে।
কিসিঞ্জার ফোন করলেন প্রেসিডেন্টকে। ৪ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর শীতকাতর দিবসে।
হ্যালো, ইয়াহিয়া খান ফোন করেছিলেন। তিনি বলছেন আমরা তাকে ইরানের মাধ্যমে অস্ত্র সরবরাহ করতে পারি কি না।
নিক্সন বললেন, আমার বন্ধু ইয়াহিয়া আমাকে দুদিন আগে কল করেছিল। বলেছে, আমি যেন ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় বিবৃতি দিই। আর মনে। করিয়ে দিয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সেন্টো চুক্তি আছে। যার মাধ্যমে আমরা তাদের অস্ত্র দিতে বাধ্য।
কিসিঞ্জার বললেন, না। তাদের সঙ্গে আমাদের এই চুক্তি নেই। এটা বরং ভারতের সঙ্গে আমাদের হয়েছিল চীন যুদ্ধের সময়। তো ইরানের মাধ্যমে অস্ত্র দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে কী করা যায়?
নিক্সন তখন একটা পেনসিল তুলে নিয়ে পিঠের বেকায়দা জায়গায় চুলকাতে চুলকাতে বললেন, রোদ আমার সহ্য হয় না হেনরি। স্কিনে অ্যালার্জি হয়। আচ্ছা ইরান, দেখো না কী করতে পারো।
আমার মনে হয় আমরা ইরানকে বলতে পারি অস্ত্র দাও। তবে ইরান বলে যে সেই অস্ত্র আমাদের পূরণ করে দিতে হবে।
তা দেব।
জর্ডানও জানতে চায় ইয়াহিয়াকে তারা আমাদের প্লেন দেবে কি না।
দিতে বলো। তবে যদি এই খবর ফাঁস হয়, আমরা জাস্ট অস্বীকার করব।
জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ জাতিসংঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি। তিনি জাতিসংঘে প্রস্তাব আনলেন। এখনই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। যার যার সৈন্য নিজ দেশে ফেরত আনতে হবে।
