স্যার। আমি রকেট চার্জ করছি স্যার।
ওকে। আমি সোজা এই স্পিডেই যাব। ইউ ডু ইয়োর জব।
রকেট ছোঁড়ায় পেশাদারি দক্ষতা আছে বদরুলের। দুটো রকেট ছুড়লেন। তেলের পাম্প দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল।
বদরুল, শাবাশ। কিন্তু আগুন তো দাউদাউ করে হেলিকপ্টার পর্যন্ত উঠছে। আপনি বামে টার্ন করতে থাকুন স্যার।
ঘুরে আবার এলেন তারা লক্ষ্যের কাছে। বদরুল এবার ছয় জোড়া রকেট একবারে চার্জ করলেন।
আগুনের শিখা আকাশ পর্যন্ত উড়ে যাচ্ছে। তারা আবারও গতিমুখ বদলালেন। তারপর ফিরতে লাগলেন তেলিয়াপাড়ার মুখে। এবার আর কোনো চিন্তা নেই। রকেট নেমে গেছে। তেল অনেক কমে গেছে। হেলিকপ্টার এখন হালকা। কাজেই হেলিকপ্টার উড়তে আর কোনো সমস্যা হবে না।
তারা তেলিয়াপাড়ার কাছে এসেছেন।
সুলতান মাহমুদ বললেন, লিফলেটগুলো ছুঁড়েছ?
গানার বলল, ভুইলা গেছিলাম স্যার।
চলো আবার লিফলেট ছুঁড়তে যাই।
গানার বলল, তেল শেষ হয়ে গেছে স্যার।
সুলতান হাসলেন। বললেন, আমরা এখন তেলিয়াপাড়ায় ল্যান্ড করছি।
ভোর হচ্ছে। এখন আমাদের আর ল্যান্ড করতে কোনো অসুবিধা হবে না।
তারা পাহাড়ের ওপরে নেমে গেলেন।
হেলিকপ্টারের স্টার্ট বন্ধ করা হলো।
পাখির ডাক শোনা যেতে লাগল পাহাড়ি গাছগুলো থেকে। ভোরের সূর্য তখন কুয়াশা ভেদ করে উঁকি দিচ্ছে।
অটার বিমান নিয়ে কমলপুর থেকে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট শামসুল আলম এবং ক্যাপ্টেন আকরাম চলেছেন চট্টগ্রাম অভিমুখে। তাঁদের সঙ্গেও একজন গানার। রাত ১১টা ৪০-এ উড়তে শুরু করে মাটি থেকে মাত্র ১০০ ফুট ওপর দিয়ে তাঁরা চলতে শুরু করেন, যাতে শত্রুবাহিনী রাডারে ধরা না পড়েন। বিদ্যুতের তার, টাওয়ার, ময়নামতি পাহাড়ের বিপদ এড়িয়ে ঘন কুয়াশা পাড়ি দিয়ে তারা দুই ঘণ্টায় চট্টগ্রামের লক্ষ্যবস্তুর কাছে যান। বিমানের তেলের ডিপোতে ১৪টি রকেট নিক্ষেপ করলেন। তখন বাজে ১টা ১০ মিনিট। তেলের ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ আর আগুন দেখে পাকিস্তানি বাহিনী বুঝতে পারল যে এটা তাদের নিজেদের প্লেন নয়, শত্রুবিমান, তখন তারা একযোগে কামান দাগা শুরু করল। দুই বৈমানিক দেখতে পেলেন পেছনে আগুনের বাণ উড়ছে। দুই ঘণ্টার ফ্লাইট শেষে ৩টা ১০-এ তাঁরা শিলচরের কাছে কুম্ভীপুরে নিরাপদে ফিরে এলেন। দেখতে পেলেন, এই ডিসেম্বরের শীতে আকাশের নিচু তাপমাত্রায় থাকা সত্ত্বেও তারা ঘেমেনেয়ে একাকার হয়ে গেছেন।
৮৭
৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। লায়ালপুর জেলের ভেতরের আদালতকক্ষ। শেখ মুজিবকে হাজির করা হয়েছে। তিনি শুধু একবার বললেন, কোথায় নিয়ে যাচ্ছ? আদালতে?
জি হুজুর। পেয়াদারা বলল।
শেখ মুজিব হাসলেন।
হাসছেন কেন স্যার?
এই আদালতে নেবার মানে কী? বিচারকেরা আগে থেকেই জানে, তারা কী রায় দেবে। এটা ইয়াহিয়া খান আগে থেকেই ঠিক করে তারপর এই আদালত বসিয়েছে। গতকাল তারা তাড়াহুড়া করে বলেছে, উভয় পক্ষের আমেন্ট শেষ করুন। আমাদের হাতে সময় নাই। হাতে সময় না থাকলে বিচার করার দরকার পড়ে না। আমার যদি জেল হতো, তাহলে তো তাড়াহুড়া করতে হতো না। এর একটাই মানে তারা আমাকে খুন করতে চায়। খুন করার জন্য আমাকে আদালতে নেবার দরকার কী?
মুজিবকে কাঠগড়ায় তোলা হলো। বিচারকেরা এসে বসলেন। পাঁচজন বসার কথা। একজন আসেননি। যিনি আসেননি, তিনিই ছিলেন এই ট্রাইব্যুনালের একমাত্র বেসামরিক বিচারক।
প্রধান বিচারক বললেন, আমাদের একজন মাননীয় বিচারক আসতে পারেননি। তাঁর পিতার মৃত্যু হয়েছে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
প্রধান বিচারক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বললেন, আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক গৃহীত সাক্ষ্য উপস্থাপিত হয়েছে। সাক্ষীদের হাজির করা হয়েছে এবং উভয় পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীরা তাঁদের জেরা করেছেন। সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার-বিশ্লেষণ করে এই আদালত এই রায় সর্বসম্মতিক্রমে দিচ্ছেন যে আসামির বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সামরিক আইনের বিধি বলে আসামি শেখ লুৎফর রহমানের পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানকে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হলো। আরও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে সামরিক আইনের বিধি বলে এই রায়ের বিশ্লেষণ কিংবা সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যার কোনো প্রয়োজন নেই, সুযোগও নেই। এই রায় প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের অনুমোদনসাপেক্ষ। আদালত সমাপ্ত হলো।
শেখ মুজিব পরে জানতে পারবেন যে ৩ ডিসেম্বরে ইয়াহিয়া খান বিচারকদের ডেকে রাওয়ালপিন্ডি নিয়ে গিয়েছিলেন। আর ৪ ডিসেম্বরেই রায় ঘোষণা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। রায় কী হবে, তা-ও তিনি জানিয়ে দিয়েছিলেন।
ব্রোহি মাথা নিচু করে চলে গেলেন।
শেখ মুজিবকে আবারও নির্জন সেলে এনে রাখা হলো।
শেখ মুজিব ফিরে এসে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। বিকেলে তার হাঁটার সময় তিনি যথারীতি হাঁটলেন।
তারপর অজু করে তিনি মাগরিবের নামাজ পড়লেন। শীতকালটা গরমকালের চেয়ে বেশ সহনীয়। তিনি কোরআন শরিফ থেকে খানিকক্ষণ পাঠ করলেন। তারপর তিনি আপনমনে বলতে লাগলেন, আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান, আমি একবার মরি, দুইবার মরি না। যদি আমাকে মারতে হয় মারো। শুধু আমার একটা অনুরোধ আছে, আমার লাশটা বাংলার মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ো।
৮৮
ব্যাঙ্গমা বলল, বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু, কোটি মানুষের শরণার্থী হওয়া, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ লাইগা যাওয়া, চীন রাশিয়ার এর সাথে যুক্ত হওয়া–এই সবকিছুর পিছনে আছিল মাত্র দুইটা মানুষ।
