বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর বিমানবাহিনী লাগবে, সে জন্য বিমান দরকার, এই চাওয়াটায় ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী তেমন গুরুত্ব দিতে চাননি। পাকিস্তানের সুসজ্জিত বিমানবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়ার জন্য তিন গুণ বেশি শক্তিশালী ভারতীয় বিমানবাহিনী তো আছেই। মুক্তিবাহিনী বিমান দিয়ে কী করবে?
কিন্তু পাকিস্তান থেকে বিমানবাহিনীর অনেক অফিসার এসেছেন, বৈমানিক ও বিমানসেনা এসেছে, তারা বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে স্থল যুদ্ধ করছেন, কিন্তু কয়েকটা বিমান পেলেই তো তারা আকাশপথে যুদ্ধ করতে পারবেন। জরুরি রসদ, সরঞ্জাম, সেনানায়কদের দ্রুত জায়গামতো পৌঁছে দিতে পারবেন।
কলকাতায় শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এসেছেন ভারতের বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল প্রতাপচন্দ্র লাল। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর উপপ্রধান এ কে খন্দকার।
খন্দকারের সামনে চা নিয়ে এলেন লীলা লাল। কলকাতার মহিলা। সদালাপী বন্ধুবৎসল।
লীলা বললেন, আপনি বিমানবাহিনীর কর্তা। আপনাদের শুনলাম অনেক বৈমানিক পাইলট বিমানসেনা আছে। আপনারা করছেনটা কী?
এ কে খন্দকার বিষণ্ণ হাসি দিয়ে বললেন, আমি তো সদর দপ্তরে কাজ করছি। আর বৈমানিকেরা হয় বসে আছে, নয়তো ল্যান্ডে যুদ্ধ করছে। আমরা ভারতের কাছ থেকে কয়েকটা বিমান আর হেলিকপ্টার চেয়েছিলাম। ভারতের মন্ত্রী-সচিবেরা এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেন না। তাই মন খারাপ।
লীলা বললেন, শোনেন। আমার বাড়ি কুমিল্লা। আমার নাড়ি পোঁতা আছে আমাদের বাড়ির পেছনে বাঁশবাগানে। প্রতাপ, তুমি অবশ্যই কয়েকটা বিমান দেবে। বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর বিমান আছে, সেটা যেমন সমস্ত মুক্তিযোদ্ধাকে সাহস দেবে, আর ওদের নিজেদের ছোটখাটো প্রয়োজনে তোমাদের ওপরে নির্ভর করে বসে থাকতে হবে না।
লীলা তার স্বামীর সঙ্গে লেগে রইলেন।
দুটো ফিক্সড উইং এয়ারক্রাফট আর একটা রটারি উইং হেলিকপ্টার পেল মুক্তিবাহিনী। গঠন করা হলো বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। যোধপুরের মহারাজা দান করলেন একটা ডাকোটা বিমান।
সুলতান মাহমুদ ছিলেন করাচির মাসরুর, মৌরিপুরের বিমানঘাঁটিতে কর্মরত। পালিয়ে কলম্বো হয়ে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে ঢোকেন। তারপর অক্টোবরে তিনি আগরতলায় এসে পৌঁছান। এসেই যুদ্ধে যোগ দেন। চট্টগ্রামে যুদ্ধ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। চিকিৎসা শেষ করে এবার তিনি যোগ দিয়েছেন বিমানবাহিনীতে। ফ্লাইং অফিসার বদরুল আলমের বয়স ২৪। ১৯৬৮ সালে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যোগ দিয়ে আকাশ থেকে ভূমিতে রকেট নিক্ষেপের কাজে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। পাকিস্তানের সাবগোদায় তাঁর বিমানঘাঁটি থেকে তাঁকে সত্তরের জলোচ্ছ্বাসের পর কাজ করতে ঢাকা পাঠানো হয়। তাঁকে সাবগোদায় মার্চে বদলি করে দেওয়া হলে তিনি আর পাকিস্তান যাননি। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি আগরতলায় যান।
৩ ডিসেম্বর রাত। আকাশে জোছনা দুধের নহরের মতো বয়ে যাচ্ছে। আবার কুয়াশাও আছে। তেলিয়াপাড়া পাহাড়ের ওপরে হেলিকপ্টার এলুয়েট ৩ কে আগের রাতেই এনে রাখা হয়েছে। সুলতান আর বদরুল হেলিকপ্টারে ওঠার আগে সবকিছু চেক করে নিলেন। হেলিকপ্টারের পেছনে নেওয়া হচ্ছে ১৪টি রকেট, এক বস্তা লিফলেট, মেশিনগান, মেশিনগানের গুলি। মেশিনগান চালানোর জন্য একজন গানার।
রাত ১১টা ৪৫। হেলিকপ্টারের বসলেন দুই পাইলট। কিন্তু হেলিকপ্টার আকাশে উঠছে না। এমনিতেই এই হেলিকপ্টারটা যুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য জিঞ্জিরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যাপক সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে। রকেট ছোঁড়ার জন্য পড। শত্রুর গুলি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এক ইঞ্চি পুরু স্টিলের প্লেট বসানো হয়েছে হেলিকপ্টারের তিন পায়ের মধ্যখানে। ওজন বেশি হয়ে গেছে। যদি একটুখানি সমতল জায়গা পাওয়া যেত, তাহলে খানিকটা দৌড়ে এটা টেকঅফ করতে পারত।
কিন্তু অর্ডার এসেছে নারায়ণগঞ্জে হামলা করতে হবে। আমাদের পারতেই হবে। আচ্ছা লিফলেটের বস্তা হালকা করো। সুলতান মাহমুদ বললেন। তা-ই করা হলো। বস্তার বদলে অল্প কটা লিফলেট নেওয়া হলো। ভরকেন্দ্র বদলে গেছে। সামনে হালকা। কিছু জিনিস আমাদের পেছনে রাখো। গুড। এবার চেষ্টা করি। আল্লাহ ভরসা।
হেলিকপ্টার উড়ল আকাশে। কম্পাস অনুসারে তারা যাত্রা করতে পারেন। কিন্তু কুয়াশায় কিছু দেখা যাচ্ছে না। নিচের ল্যান্ডমার্ক দেখা না গেলে হেলিকপ্টার চালানো যায় না। ভরসা হলো ফকফকা জোছনা। তারা ঢাকা যাওয়ার পাকা রাস্তার ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার চালাতে লাগলেন। ওই তো এলিয়টগঞ্জ ব্রিজ। ক্যাপ্টেন হায়দার তার যোদ্ধাদের নিয়ে এটা ভেঙে দিয়েছিলেন। সেটা দেখা যাচ্ছে। দাউদকান্দি। সাবধান বদরুল। এখানে কিন্তু রেডিও টাওয়ার আছে। অল্পের জন্য টাওয়ার এড়াতে পারলেন তারা। সামনে আসল বিপদ। শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর দিয়ে তাদের পথে পড়ছে ৩৩০০০ কেভিএ বৈদ্যুতিক তার। তারা কি এটার নিচ দিয়ে যাবেন, নাকি ওপর দিয়ে। বদরুল, বলো কী করব। ওপর দিয়ে না নিচ দিয়ে।
নিচ দিয়ে স্যার।
ইয়েস নিচ দিয়ে। শীতলক্ষ্যার পানিতে চাঁদের প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছ?
ইয়েস স্যার।
কুয়াশা নাই, এইটা ভালো।
ইয়েস স্যার।
ওই দেখো আমাদের টার্গেট। গোদনাইল তেলের ডিপো।
