রেহানা বললেন, বেশি রাত করবে না। সবাই যদি না-ই শুনতে পাবেন, ভাষণ দিয়ে লাভ কী!
রাতে ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ শুনলেন সবাই। খোকা বললেন, ইন্দিরাজি খুবই ইন্টেলিজেন্ট। বললেন না যে আমরা যুদ্ধ ঘোষণা করছি। বললেন, বাংলাদেশের যুদ্ধ আমাদের যুদ্ধ হয়ে গেছে।
হাসিনা বললেন, আরেকটা পয়েন্ট খুবই সূক্ষ্ম। কিন্তু এইটা খেয়াল করার মতো। শুধু ধর্ম বা ভাষার ভিত্তিতে মানুষের ঐক্য হয় না, মানুষের ঐক্য হয় একটা উচ্চ আদর্শবোধ থেকে।
রেহানা বললেন, আপা, জিনিসটা কী বুঝি নাই।
হাসিনা বললেন, ধর্মের ভিত্তিতে যদি এক দেশ হতো, তাহলে তো সব আরব দেশ এক দেশ হতো। আবার ভাষার ভিত্তিতে যদি এক দেশ হতো, তাহলে তো আমেরিকা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এক দেশ হতো। তা
তো হয় না। দেশ হয় যখন দেশের সব মানুষ মনে করে তারা একটা দেশ হতে চায়।
খোকা বললেন, হ্যাঁ। আর ইন্ডিয়ানদের মনে একটা টেনশন কাজ করে, এক ভাষার সবাই এক দেশ হলে পশ্চিমবঙ্গ না আবার আলাদা হতে চায়। এটা যে না, সেটা ইন্দিরা গান্ধীজি সবাইকে জানিয়ে দিলেন।
হাসিনা বললেন, আমাদের জাতীয় পতাকার মাঝখানে তো বাংলাদেশের ম্যাপ সে জন্য দিয়ে দেওয়াই হয়েছে। এই বাংলা হলো পূর্ব বাংলা।
হঠাৎ রাসেল জয়ের পাশ থেকে মাথা তুলে বলল, এই তোমরা ঘুমাও না কেন?
রেহানা বললেন, তুমি ঘুমাও নাই। চুপ করে শুয়ে আছ?
রাসেল বলল, আমি ইন্দিরা গান্ধীর বক্তৃতা শুনলাম।
রেহানা বললেন, তুমি ইংরাজি বোঝে।
রাসেল বলল, আমার কাছে আসো। কানে কানে বলব।
রেহানা রাসেলের পাশে গিয়ে শুয়ে কান পাতলেন। রাসেল বলল, যদি। হঠাৎ করে আব্বা ভাষণ দেন, তাই জেগে আছি।
৮৫
৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা। কলকাতার রাস্তাঘাটে অস্বস্তিকর তাড়াহুড়া। শনিবার, লোকজন কাজে যায়নি, সব ফাঁকা ছিল, তবু লোকজন কিছু শেষ মুহূর্তের জরুরি কেনাকাটা সেরে দ্রুত যার যার বাড়ি ফিরছে। এই জরুরি জিনিসের তালিকায় আছে মোমবাতি আর কেরোসিন। বিমান হামলা হতে পারে, তাই রাতে হবে নিষ্প্রদীপ মহড়া।
তাজউদ্দীন আহমদের একান্ত সচিব ফারুক আজিজ খান তার ভাড়া করা বাসায়। লোয়ার সার্কুলার রোডে এই বাড়িটি চুন-সুরকির। মোটা মোটা কলাম, খিলান, কড়িবর্গার। চিলেকোঠার ঘরে বন্ধুদের সঙ্গে যুদ্ধের ব্যাপারেই গল্প করছিলেন। যুদ্ধ যে বেধে গেল, চীন কি বসে থাকবে? সোভিয়েত-ভারত চুক্তি কি ফল দেবে? আমেরিকা কি কলকাঠি নাড়ছে?
এই সময় ডাক এল। ফারুক সাহেব, ফারুক সাহেব। আছেন নাকি? ফারুক আজিজ দরজা পেরিয়ে সিঁড়িতে দাঁড়ালেন। একটা ছোট্ট বাল্ব আলো দিচ্ছে, আকাশ থেকে আসা অস্তরাগও খানিকটা তার মুখে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছেন মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করা শরদিন্দু চট্টোপাধ্যায় ওরফে এস চ্যাটার্জি। তাঁর পাঞ্জাবির বুকপকেটের ফাউন্টেন পেন লিক করেছে, পকেটের কোনায় কালি দেখা যাচ্ছে।
আপনি কোথায় ছিলেন?
কেন? এখানেই?
প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ আপনাকে খুঁজছিলেন। তিনি চলে গেছেন। কালকের আগে আর ফিরবেন না। আমার এখন একটা সিলমোহর দরকার। বাংলাদেশ সরকারের সিলমোহর।
সিলমোহর দিয়ে কী করবেন?
একটা চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। আজ রাতেই সেটা সাইন হবে। সেই জন্য আপনাদের স্ট্যাম্প দরকার।
চিলেকোঠা থেকে দ্রুত নামলেন ফারুক। জুতা পরা হয়নি। পায়ে চপ্পল। সেটা ছ্যারাৎ ছ্যারাৎ শব্দ করছে। গাড়ি প্রস্তুত ছিল। তারা উঠলেন। থিয়েটার রোডের অফিসের দোতলায় নিজের ঘর খুলে সিল নিলেন। প্যাড নিলেন।
এস চ্যাটার্জি বললেন, সময় নাই। দৌড়াতে হচ্ছে। আজ রাতেই যৌথ কমান্ড গঠনের চুক্তিতে সই করতে হবে।
ফারুক বললেন, যৌথ কমান্ডের চুক্তি হচ্ছে কার সঙ্গে? ভারত কি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিচ্ছে?
একটা হলে আরেকটা অটোমেটিক হয়ে যায় নাকি?
.
পরের দিন ফিরে এলেন তাজউদ্দীন।
তাঁর কাছে গিয়ে টেবিলের সামনে দাঁড়ালেন ফারুক। তাজউদ্দীন বললেন, যৌথ কমান্ড চুক্তি স্বাক্ষর করে এলাম। এই যুদ্ধ এখন ভারত-বাংলাদেশ যৌথ যুদ্ধ। ব্যাপারটা এখন অনেক বেশি সম্মানের হলো।
তাঁরা রেডিও শুনতে লাগলেন।
লাহোরে ভারতীয় বিমানবাহিনীর হামলা। সীমান্তে বিভিন্ন স্থানে স্থলপথে যুদ্ধ শুরু। মুজিবনগর অফিসে খবর আসতে লাগল, মুক্তিবাহিনী এবং ভারতীয় বাহিনী সিলেট, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, যশোর, দিনাজপুর সীমান্ত পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। ভারতীয় বিমানবাহিনী ঢাকা, যশোর বিমানবাহিনীর শক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট করে ফেলেছে। ভারতীয় নৌবাহিনীও আক্রমণ করেছ, তারা কক্সবাজার বিমানবন্দর অকেজো করে দিয়েছে। আর আক্রমণ করেছে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী। ৩ ডিসেম্বর রাতে, ৪ ডিসেম্বর ভোরে।
৮৬
৩১ বছর বয়স্ক স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ উত্তেজনায় কাঁপছেন। পাকিস্তান বিমান আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে, ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বোমা ফেলেছে। আজ রাতে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর পক্ষ থেকে প্রথম বিমান হামলা করা হবে। সুলতান যাবেন নারায়ণগঞ্জের দিকে। তেলের ডিপোর ওপর বোমা ফেলতে। তারা যাবেন এলুয়েট ৩ হেলিকপ্টার নিয়ে। এই হেলিকপ্টারটা ভারতের বিমানবাহিনীর কাছ থেকে উপহার পাওয়া।
