পাকিস্তান এয়ার অ্যাটাক করেছে।
প্রধানমন্ত্রী জানেন, এটাই হওয়ার কথা। প্রধানমন্ত্রী চাইছিলেন পাকিস্তান এমনভাবে ভারতকে আক্রমণ করুক, যাতে দুনিয়াকে দেখানো যায় যে আমরা আক্রমণ করিনি। আমরা নিজেদের আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিমাত্র। মুখে যেন হাসি ফুটে না ওঠে। তাকে চিন্তিত দেখাল।
তিনি দ্রুতই ভাষণ শেষ করে গাড়িতে উঠে পড়লেন।
আজ শুক্রবার। তিনি কলকাতা। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাটনা। সেখান থেকে তিনি যাবেন বেঙ্গালুরুতে। অর্থমন্ত্রী বোম্বে, সেখান থেকে যাবেন পুনে। মানেকশ যে কোথায়, তিনি জানেনও না।
তিনি রাজভবনে গেলেন। রাজভবনে শিল্পী-সাহিত্যিক-সুধীজন সমবেত হয়েছেন। এই বিদগ্ধসভা বাদ দিয়ে তিনি হঠাৎ করে চলে যেতে পারেন না। এঁরা মনঃকষ্ট পাবেন।
শিল্পীরা একই রঙের শাড়ি, একই রঙের পাঞ্জাবি পরে রবীন্দ্রসংগীত গাইতে লাগল : যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো। গানটার একটা হিন্দি অনুবাদও ধরল তারা। ইন্দিরা এই গান আগে থেকেই জানেন : ইফ নোবডি রেসপন্ডস টু ইয়োর কল দেন গো ইন ইয়োর ওয়ে অ্যালোন।
তিনি উত্তম কুমারের সঙ্গে হেসে কথা বললেন, সুচিত্রা মিত্রকে বললেন, নমস্কার। তারপর সবাইকে বললেন, আজকে আমার একটু তাড়া আছে। আমি দিল্লি চললাম।
দ্রুত তিনি উঠলেন গাড়িতে। গাড়ি সোজা ছুটল দমদমে। তাঁর জন্য বিমান তৈরি হয়েই ছিল। ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমান। তার পাশে এসে বসলেন ডি পি ধর। তিনি বললেন, পাঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তর প্রদেশে বিমান হামলা হয়েছে। অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্রীনগর, আম্বালা, আগ্রা, যোধপুর বিমানঘাঁটিতে পাকিস্তানিরা হামলা করেছে। অমৃতসর, পাঠানকোটে স্থলপথেও আক্রমণ করা হয়েছে।
থ্যাংক গড, দে হ্যাভ অ্যাটাকড আস-ইন্দিরা বললেন।
ডি পি ধর মাথা নেড়ে বললেন, পি এন ধর আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন নেপোলিয়নের একটা কথা। নেভার ইন্টারাপ্ট অ্যান এনিমি হোয়েন হি ইজ মেকিং আ মিসটেক। তোমার শত্রু যখন ভুল করছে, তখন তাকে বাধা দিয়ো না। ভুল করতে দাও।
তারা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছেন ৪ ডিসেম্বর তারা আক্রমণে যাবেন, আকাশে পূর্ণিমা থাকবে। রাতের আঁধার জ্যোৎস্নার সঙ্গে মিতালি করবে, উড়বে তখন ভারতের বিমানগুলো।
এখন পাকিস্তানিরা আমাদের এই প্লেনে হামলা করবে না তো? ইন্দিরার চোখেমুখে জিজ্ঞাসার চিহ্ন।
আমাদের বিমানবাহিনী জানে যে এই বিমান দিল্লি যাচ্ছে। এসকর্ট করা আছে। চারটা প্লেন আপনার বিমানের চারপাশে পাহারা দিয়ে রেখেছে। আমাদের সবগুলো যুদ্ধবিমান, বিমানবিধ্বংসী কামান, রাডার অ্যালার্ট আছে। ডি পি ধর আশ্বস্ত করলেন ইন্দিরাকে।
বিমান দিল্লিতে নামল নিরাপদেই। তখন রাত ১১টা বাজবে বাজবে করছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাঁকে বরণ করে নেওয়ার জন্য বিমানে উপস্থিত। তাঁরা সোজা চলে গেলে সেনা সদর দপ্তরে।
স্যাম মানেকশ আছেন। নৌবাহিনীর প্রধান আছেন। বিমানবাহিনীর প্রধান আছেন।
মানেকশ পরিস্থিতি ব্রিফ করলেন। পশ্চিমে আমরা শক্ত ঘাঁটি তৈরি করেছি। পুবে আমরা একযোগে ঢুকে পড়তে চাই। আপনি অর্ডার দিন।
ইন্দিরা বললেন, অর্ডার দেওয়া হলো।
তিনি বিমানবাহিনীর প্রধানকে বললেন, পাল্টা হামলা করুন। দিস ইজ অ্যান অফিশিয়াল অর্ডার।
ভারতের প্রেসিডেন্ট রাতের বেলাতেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করলেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা বক্তৃতা লিখছেন। ইন্দিরা রেডিওতে ভাষণ দিলেন মধ্যরাতে–আজ বাংলাদেশের যুদ্ধ এসে পড়েছে ভারতের ওপর। এটা এখন। ভারতেরও যুদ্ধ। দীর্ঘকাল কৃচ্ছ্ব পালনের জন্য আপনাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।
পরের দিন পার্লামেন্ট বসল। ইন্দিরা বললেন, আমরা শান্তি চেয়েছি। আমরা সব সময় যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে চেয়েছি। আমাদের ওপরে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা এখন যুদ্ধের মধ্যে।
ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করলেন, আমরা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছি।
.
মেজর জেনারেল জ্যাকব নয়াদিল্লিতে সেনাসদরেই ছিলেন। তাঁর কাছে ফোন এসেছিল, ফোন করেছিলেন নিউইয়র্ক টাইমস-এর সাংবাদিক সিডনি শনবার্গ, পাকিস্তান তোমাদের ওপরে বিমান হামলা করছে, তোমাদের প্রতিক্রিয়া কী? জ্যাকব তাঁর মেস থেকে এক বোতল পানীয় আনিয়ে নিয়েছিলেন, সেটা থেকে এক ঢোঁক খেয়ে নিয়ে তিনি বললেন, আমরা এখন পানাহারে ব্যস্ত।
তোমার প্রতিক্রিয়া বলো।
এইবার আমরা দেখিয়ে দেব আর্মি কাকে বলে।
শোনো। তোমরা যখন ঢাকা যাবে, আমাকে তোমাদের সঙ্গে নেবে, কথা দাও!
৮৪
ধানমন্ডির ১৮ নম্বর রোডের একতলা বাড়ির ছাদে মিলিটারিরা বাংকার বানিয়ে পজিশন নিয়ে আছে। বাড়ির সামনে বালুর বস্তা। তারা রাতের বেলা ট্রেঞ্চ খুঁড়তে আরম্ভ করে দিয়েছে।
মমিনুল খোকা এখন এই বাসাতেই থাকেন। স্ত্রী-কন্যাদের রেখে এসেছেন শ্বশুরবাড়িতে। ওয়াজেদ মিয়া হাসপাতালে। বাড়ি পুরুষশূন্য। এটা হতে দেওয়া উচিত নয়।
খোকা বিছানায় বসে রেডিও ঘোরাচ্ছেন। তিনি বললেন, আকাশবাণী বলল, পাকিস্তান বিমান হামলা করেছে ইন্ডিয়ার অনেক জায়গায়। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন রাষ্ট্রপতি। বলছে, যেকোনো সময় ইন্দিরা গান্ধী ভাষণ দেবেন।
রেনু বললেন, ইন্দিরাজির ভাষণ শুনে ঘুমাতে যাব।
হাসিনা বললেন, হ্যাঁ। কত রাতে ভাষণ দেবেন!
