২৮ নভেম্বর ভারতীয় সেক্টর কমান্ডার রাজসিং বাংলাদেশ বাহিনীর কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট এস আই এম নূরুন্নবী খানকে আদেশ করলেন, ছোটখেল আক্রমণ করে পাকিস্তানিদের হটিয়ে দাও।
নূরুন্নবী জানালেন তার ব্যাটালিয়ন কমান্ডার শাফায়াত জামিলকে। স্যার, আমাদের যৌথ কমান্ডের সেক্টর কমান্ডার অর্ডার করেছেন ছোটখেল অ্যাটাক করতে। কী করব?
এটা একেবারে আত্মহত্যা! স্রেফ আত্মহত্যা। জানি না কেন ইন্ডিয়ান কর্নেল এটা আমাদের ওপরে চাপিয়ে দিচ্ছে। তাতে কী লাভ? আমরা এক সপ্তাহ এটার দখল ধরে রাখলাম। পরের সপ্তাহেই তো এটা হারাতে হবে।
.
ব্যাঙ্গমা বলল, আসলে পাকিস্তানিদের সীমান্তের দিকে টাইনা আনা, আর ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করার রণকৌশলটা হয়তো মাঠপর্যায়ের সবাই জানতেন না। বস্তুত এইটা কেবল ভারতীয় ঊর্ধ্বতন সমরবিদেরাই জানতেন।
ব্যাঙ্গমি বলল, যা-ই হোক, আমরা শাফায়াত জামিলের কাছে ফিরা যাই।
.
নূরুন্নবী বললেন, তাহলে আমরা কী করব?
শাফায়াত জামিল বললেন, আমরা অবশ্যই অর্ডার ক্যারি করব। তবে এই ভারতীয়দের আমরা দেখিয়ে দিতে চাই, ওরা যা পারেনি, আমরা তা করে ছাড়ব। চলো। আমিও তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যাব।
নূরুন্নবী বললেন, ব্যাটালিয়ন কমান্ডার হিসেবে আপনার তো যাওয়ার কথা না।
শাফায়াত বললেন, তোমাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে আমি নিরাপদ দূরত্বে বসে কমান্ড করে যাব, হবে না। গুর্খারা পরশু ১৭ জন মরেছে, ৪০ জন আহত। আমাদের দেশের মুক্তির জন্য আমাদের তো মরতে হলে মরতে পারতে হবে। লেটস গো অ্যান্ড ফাইট।
সৈন্যদের উদ্দেশে বললেন, আমাদের দুই প্লাটুন যাচ্ছে লড়াইয়ে। দুই প্লাটুন কমান্ডার নূরুন্নবী আর আলী নেওয়াজ থাকবে সামনে। কিন্তু আরও একজন থাকবে। সে হলো আমি। আমি নিজে যাব লড়তে। চলো, গুর্খারা যা পারেনি, তা করে আমরা দেখিয়ে দিই, বাঙালি বীরের জাতি।
তখনো আঁধার কাটেনি। ভোরের কুয়াশা এসে ঢেকে রেখেছে অঘ্রানের পাকা ধানখেত।
অগ্রহায়ণ বাংলাদেশের এক বিশেষ ঋতু। ধান কাটা হয়ে যায়, এলোমেলো খড়, কাটা ধানের গোড়ালি পড়ে থাকে খেতে। শিশির জমে দূর্বাঘাসে। সকালের রোদ পড়লে মনে হয় সারা মাঠে মুক্তাদানা ছড়িয়ে আছে। একটু একটু শীত পড়ে। খয়েরি শালিক হলুদ ঠ্যাংয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে খেতের পোকা ঠুকরে খায়।
শাফায়াত জামিলের সঙ্গে এক শ সৈন্য। তারা মাথা নিচু করে ধানখেতের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। ধানের পাতা লেগে তাদের হাতের কবজি কেটে যাচ্ছে। কিন্তু আজ তো মরণপণ যুদ্ধ। তারা শত্রুর ৩০০ গজ দূরে মাত্র। কুয়াশা ভেদ করে দুরবিনে দেখা যাচ্ছে তাদের অবস্থান।
শাফায়াত জামিল বললেন, জয় বাংলা। তাঁদের ১০০টা এসএলআর গর্জে উঠল। তারা দৌড়ে সামনের দিকে এগোতে লাগলেন। জয় বাংলা, আল্লাহু আকবর।
জয় বাংলা বাহিনীকে সাপোর্ট দিচ্ছে গোরা গ্রামে পোস্ট করা দুটো মেশিনগান, একটা রিকোয়েললেস রাইফেল। দ্রুত সামনে এগিয়ে তারা শত্রুর সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ে নেমে পড়লেন।
পাকিস্তানিরা এই প্রভাতে এই আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না। সামনে থেকে গুলি আসছে, পাশের খড়ের গাদা, ধানখেতে গ্রামবাসী আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। সেই আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে জ্বলতে এগিয়ে আসছে তাদের বাংকারের দিকে। বাঁচার জন্য পিছু হটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।
তারা প্রথমে কিছুক্ষণ চেষ্টা করল পাল্টা গুলি চালাতে। তারপর এত কাছে জয় বাংলা ধ্বনি শুনে আর গুলির প্রচণ্ডতায় উঠে পালাতে লাগল। পড়ে পড়ে মরল। আহত হলো।
তাদের ছোঁড়া একটা গুলি এসে বিদ্ধ হলো শাফায়াত জামিলের কোমরে।
শাফায়াত জামিল উষ্ণ তরলের স্পর্শ অনুভব করতে পারলেন। দুজন সৈন্য তাকে কোলে করে নিয়ে গেল পেছনে। চিকিৎসার জন্য।
বাঙালি সৈন্যরা পুরো গ্রামটা দখল করে নিয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। পাকিস্তানি সৈন্যদের লাশ। দেখা গেল, তাদের বাংকার মাটির নিচে তিনতলা। সেখানে পাওয়া গেল ৭ জন নারীর সদ্যমৃত দেহ। তারা ফেলে রেখে গেছে শত শত বাক্স গুলি, তিন শ বেডিং, দুটো টেলিফোন সেট, ৪৫টা চামড়া ছাড়ানো মুরগি, বাইনোকুলার, কম্পাস, মানচিত্র। আশু কাজে লাগল সদ্য ভাজা গরম পরোটা, সবজি আর চা। বাঙালি সৈন্যরা ওদের বাংকার দখল করে পজিশন নিয়ে নাশতা সেরে নিচ্ছে, এই সময় ওয়্যারলেসে কর্নেল রাজসিং বললেন, কংগ্রাচুলেশনস, টাইগার্স। তোমরা প্রমাণ করেছ তোমরা বীর।
শাফায়াত জামিলকে মুক্ত এলাকায় জিপে তুলে গাড়ি ছুটতে লাগল শিলংয়ের দিকে। শিলং মিলিটারি হাসপাতালে নেওয়ামাত্র তাঁকে ঢোকানো হলো অপারেশন থিয়েটারে। অপারেশন করে ডাক্তাররা বুলেট বের করলেন। ১৩ ডিসেম্বরে তার ক্ষত পুরোপুরি শুকোয়নি। তিনি আবারও চলে এলেন। যুদ্ধক্ষেত্রে। ১৫ ডিসেম্বর সিলেটের লাকামজি ফেরিঘাটে এসে দেখা গেল, তাঁর ব্যাটালিয়ন ফেরির জন্য অপেক্ষা করছে। তিনি ৩য় ইস্ট বেঙ্গলের কমান্ড নিয়ে নিলেন। তারপর এল ১৬ ডিসেম্বর।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, কিন্তু ১৬ ডিসেম্বর আসতে আমগো অহনো কয়েক দিন বাকি আছে। আমরা দিন শুরু করছি ২৮ নভেম্বরে।
ব্যাঙ্গমি বলবে, চলো সেইখান থাইকা আবারও স্মরণ করতে থাকি।
৮৩
কলকাতা শহর, শহরতলির সব মানুষ হাজির হয়েছে ময়দানে। ইন্দিরা গান্ধীর জনসভা। হেমন্তের বিকেলে ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মুছে চিলেরা ভিড় করেছে ব্রিগেড ময়দানের বিস্তারিত আকাশে। সব পাখি ঘরে ফেরার বদলে ময়দানের দুপাশের ভবনে আর শিরীষ, দেবদারু, পামগাছের আশ্রয়গুলোতে ক্লান্ত পাখা গুটিয়ে দুপায়ে ভর দিয়ে বসে গ্রীবা বাড়িয়ে নিচে চেয়ে দেখছে মানুষ আর মানুষ। এত মানুষ তো কলকাতায় বাস করে না। কোত্থেকে এল মানুষ? শহরতলি থেকে? বর্ধমান, বাঁকুড়া, নদীয়া, রাঢ়, কোচবিহার থেকে? নাকি শত শত আশ্রয়শিবিরে গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি করে আছেন পূর্ব বাংলার যে শরণার্থীরা, তারা এসেছে? ইন্দিরা গান্ধীর জনসভায় এত মানুষ, এত মানুষ, এ যে মানুষবালুকণায় ভরা এক আদিগন্ত মরুভূমি। হ্যাঁ, এটাকে জনসমুদ্র বলা যাবে না, কারণ মানুষ শান্ত। আজ ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ নেই, কালো পতাকা নেই, চারু মজুমদার পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, নকশালিরাও আজ চুপচাপ করে কান পেতে শুনতে চাইছে ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণ। ইন্দিরা মঞ্চে উঠলেন, শান্ত-সমাহিত কিন্তু দৃঢ়কণ্ঠে বললেন, ভারত শান্তির পক্ষে, তবে কেউ যদি আমাদের ওপরে জোর করে যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে চায়, ভারত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। তার গায়ে একটা গেরুয়া চাদর, তিনি একবার চাদরটা ঠিক করে নিলেন। এই সময় মঞ্চে একটা চিরকুট নিয়ে ভাষণদানরত প্রধানমন্ত্রীর ডায়াসে রেখে। এলেন জি সি দত্ত, প্রধানমন্ত্রীর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার। প্রধানমন্ত্রী চিরকুটটা দেখলেন।
