তার মেডেলগুলো এসির বাতাসে উড়ছিল আর টুংটাং শব্দ করছিল।
তার এক পাশে জেনারেল গুল হাসান। আরেক পাশে পীরজাদা।
প্রেসিডেন্ট বললেন, আমি ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে যাচ্ছি। আর কত উসকানির মুখে আমরা নীরব থাকতে পারি? আপনাদের সঙ্গে আর আমাদের দেখা হবে না। ১০ দিনের মধ্যেই আপনারা আমাকে দেখবেন আমি। ফ্রন্টে। শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করছি। আমরা তো জিহাদ করি। আমাদের জয় তাই অবশ্যম্ভাবী।
.
লাহোরের পত্রিকা মাশরিক-এ ছাপা হলো ব্যানার শিরোনাম :
ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য। ঘোষণা দিলেন প্রেসিডেন্ট : আমি ১০ দিনের মধ্যেই ফ্রন্টে যাব।
ফ্রন্টে গেলে তিনি খারাপ করতেন না। মকবুলপুর ফ্রন্টে বাংকারে বাংকারে ছিল নারী। আকাশ থেকে ঝরছিল ভারতীয় গোলা। আর ভেতরে নারীদের সঙ্গ উপভোগ করছিলেন ব্রিগেডিয়ার হেদায়াতুল্লাহ। প্রেসিডেন্ট সেখানে গেলে তাঁর প্রতিদিনের অভ্যস্ত জীবনের বাইরের কোনো জীবন পেতেন না। বরং যুদ্ধক্ষেত্রে গোলাগুলির নিচে নারীদের সঙ্গে মিলিত হতে তাঁর ভালোই লাগত।
.
লাহোরে একটা হোটেলে আয়োজিত এক পার্টিতে যোগ দিলেন ইয়াহিয়া। সেখানে গান হচ্ছে, নাচ হচ্ছে, আলো জ্বলছে-নিভছে। একটার পর একটা গেলাস হাতে নিচ্ছেন ইয়াহিয়া। একেকজন নারীর কোমর ধরে দুলছেন।
তারপর হঠাৎ ইয়াহিয়া খেপে গেলেন। হাতের জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগলেন ফোলানো সব রঙিন বেলুনের দিকে।
তিনি একটা বেলুনের গায়ে জ্বলন্ত সিগারেট চেপে ধরতেই সেটা ফটাস করে গেল ফুটে। তিনি হো হো করে হাসতে হাসতে বললেন, এইমাত্র ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রামকে শেষ করলাম। এবার মানেকশকে খতম করব। তিনি আরেকটা বেলুন ফাটালেন, এইবার শেষ করলাম ইন্দিরাকে। সবশেষ ফাটাব মুজিবকে। একটা বেলুনের দিকে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে এগিয়ে গেলেন। চিৎকার করে উঠলেন, মুজিব শেষ। মুজিব শেষ।
তিনি তার হাতের সিগারেটটায় শেষ টান দেওয়ার জন্য ঠোঁটে চাপতেই চিৎকার করে উঠলেন। মাতাল হাতে তিনি সিগারেটের জ্বলন্ত অংশ ধরেছেন। ঠোঁটে। তার ঠোঁট পুড়ে যাচ্ছে। শেখ মুজিবকে মারতে গিয়ে তিনি নিজেই পুড়িয়ে ফেললেন তার মুখ।
সব শত্রুকেই তিনি ঘায়েল করেছেন। বীর জেনারেল। এখন তিনি রণক্লান্ত। এবার শান্ত হবেন। এবার তার দরকার বিনোদন। তিনি নুরজাহানকে নিয়ে একটা কক্ষে ঢুকে পড়লেন।
৮১
তাজউদ্দীন বললেন, ওসমানী সাহেব, আমাদের একটা চুক্তি করতে হবে। বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী আর ভারতের সেনাবাহিনী মিলে হবে মিত্রবাহিনী। আমাদের একটা যৌথ কমান্ড লাগবে।
ওসমানী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তাঁর সামনে বসা। তিনি বললেন, না না, তা কেন হবে। ভারতীয় বাহিনী তাদের মতো যুদ্ধ করবে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, গণবাহিনী আমার কমান্ডে যুদ্ধ করবে।
যুদ্ধ তো একটাই। শত্রুও একটাই। দুইটা বাহিনীর মধ্যে সমন্বয় লাগবে না? একটা গাড়িতে দুইটা স্টিয়ারিং থাকতে পারে না। একটা নৌকায় দুইটা হাল থাকতে পারে না। হাল যে-ই ধরুক, স্টিয়ারিং যে-ই ধরুক, হাল থাকবে একটা। স্টিয়ারিং থাকবে একটা।
তাহলে ভারতের বাহিনী আমার কমান্ডে যুদ্ধ করবে? চোখমুখ শক্ত করে বললেন ওসমানী।
তাজউদ্দীন বললেন, আমাদের ট্যাংক নাই, আমাদের সাবমেরিন নাই, আমাদের যুদ্ধজাহাজ নাই, আমাদের যুদ্ধবিমান নাই, এমনকি আমাদের নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদও নাই, আপনি কী করে কমান্ড দেবেন?
আচ্ছা আমরা এ কে খন্দকার সাহেবের পরামর্শ নিই।
তাঁকে ডাকা হলো। তিনি এলেন। তাঁকে ব্যাপারটা খুলে বললেন। প্রধানমন্ত্রী।
এ কে খন্দকার বললেন, যৌথ কমান্ড পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানপক্ষও যৌথ কমান্ড করেছিল, মিত্রবাহিনী তো যৌথ কমান্ডই। তা না হলে আমাদের বাহিনী নিয়ে আমরা কয়েকটা সেক্টরে যখন যুদ্ধ করতে থাকব, তখন ভারতীয় বাহিনী ঢাকা ঢুকে যখন সারেন্ডার করাবে পাকিস্তানি বাহিনীকে, তখন তারা বলবে, এটা হলো পাক-ভারত লড়াই। আর যদি যৌথ কমান্ড থাকে, তখন বলতে হবে যে পাকিস্তানিরা সারেন্ডার করেছে যৌথ বাহিনীর কাছে।
ওসমানী বললেন, না, হবে না। আমি ভারতীয় কমান্ডের অধীনে যুদ্ধ করতে পারব না। আমি পদত্যাগ করব।
তাজউদ্দীন বললেন, আমি প্রধানমন্ত্রী, আমি প্রতিরক্ষামন্ত্রী। এটা আমার আদেশ। আপনাকে শুনতে হবে। শুনতে না চাইলে আপনি পদত্যাগপত্র লিখে জমা দিন।
পরের দিন মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকা হলো। সেনাপতি সেখানে উপস্থিত। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত হলো যে যৌথ কমান্ড গঠন করা হবে।
ওসমানী মেনে নিলেন।
৮২
৩১ বছর বয়স্ক মেজর শাফায়াত জামিল ১৯৭১ সালের নভেম্বরের শেষে যুদ্ধ করছেন সিলেটের সীমান্ত অঞ্চলে। ২৬ নভেম্বর ভারতের দুর্ধর্ষ গুর্খা রেজিমেন্ট রাধানগর ও ছোটখেলে প্রচণ্ড হামলা চালায় পাকিস্তানি ডিফেন্স ক্যাম্পের ওপরে। এসব জায়গায় পাকিস্তানি সৈন্যরা কংক্রিটের বাংকার বানিয়ে রেখেছিল। তাদের প্রতিরোধদুর্গ ছিল দুর্দমনীয়। গুর্খারা রাধানগরে প্রাণপণ আক্রমণ করেও শত্রুদের সরাতে পারেনি। বরং নিজেদের কোম্পানির কমান্ডার মেজর এস পি সিংসহ প্রায় সব সৈন্যকে হারিয়ে ফেলে। ছোটখেল ৬ ঘণ্টার জন্য তারা দখল প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল, পাকিস্তানিরা শক্তি বৃদ্ধি করে আবার আক্রমণ চালিয়ে তাদের হটিয়ে দেয়।
