দাদা কী চিন্তা করছেন, ক্যাপ্টেন মতিন বললেন।
সুবোধ চোখ মুছলেন। কান্না থামালেন। তারপর বললেন, আমি চিন্তা করছি ভগবান কেন আমাকে মাত্র একটা ছেলে দিল। আরেকটা ছেলে থাকলে তো আমি তাকে আজকে আপনাদের হাতে তুলে দিতে পারতাম। সে যুদ্ধে যাইতে পারত। দ্যাশটা স্বাধীন করতে যুদ্ধ করত।
.
এই রকম বাবারা আছেন। এই রকম সেনাকর্তারা আছেন। ১১টা সেক্টর। নৌসেনারা যুদ্ধ করে পানিতে পাকিস্তানিদের চলাচল কঠিন করে তুলেছে। বন্দরগুলো অকেজো। বিমানবাহিনী গড়ে উঠেছে। প্রায় এক লাখ মুক্তিযোদ্ধা গেরিলা ট্রেনিং নিয়েছে। এর মধ্যে বিশ হাজার নিয়মিত সৈন্য। মুজিববাহিনী আট-দশ হাজার। কিন্তু আরও এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে। টাঙ্গাইল এলাকায় গড়ে উঠেছে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে কাঁদেরিয়া বাহিনী, তার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বাড়তে বাড়তে আঠারো হাজারে উন্নীত হয়, আর তার সঙ্গে যুক্ত থাকে ৫০ হাজার সক্রিয় কর্মী মানুষ, গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার ইপিআরের হাবিলদার হেমায়েত তার এলাকায় ৮০০ জনের এক দুর্ধর্ষ বাহিনী গড়েন, যাঁরা আবার ৫ হাজার জনকে প্রশিক্ষিত করে তোলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক সৈনিক আফসার উদ্দীন তার এলাকা ময়মনসিংহের ভালুকায় গড়ে তোলেন ৮০০ জনের আফসার বাহিনী, আত্রাই এলাকায় ছিল ওহিদুর বাহিনী, শ্রীপুরে আকবর বাহিনী, রৌমারী রাজীবপুরের আফতাব বাহিনী, শরণখোলা এলাকায় জিয়া বাহিনী–এ রকম আরও আরও বাহিনী গড়ে উঠেছিল, যারা মার্চে দুইটা-তিনটা রাইফেল বন্দুক নিয়ে শুরু করে থানা আক্রমণ করে আরও অস্ত্র দখল করে, তারপর মিলিটারিদের ওপরে অ্যামবুশ করে তাদের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে অস্ত্রভান্ডার বাড়িয়েছে, আর বাড়িয়ে গেছে। গেরিলার সংখ্যা, আক্রমণের পর আক্রমণ করে একেকটা এলাকাকে পাকিস্তানিদের দখলমুক্ত করে রাখতে সমর্থ হয়েছে। পাকিস্তানি সৈন্যদের সারা সীমান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সীমান্ত শহরগুলোতে পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের প্রতিরোধ ঘটি শক্তিশালী করেছে, সিমেন্ট দিয়ে বাংকার বানিয়েছে। তারা জেনেছে যে ভারতীয়দের উদ্দেশ্য হলো পূর্ব পাকিস্তানের একটা অংশ দখল করে সেখানে শরণার্থীদের পাঠিয়ে দেওয়া আর সেখানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের কার্যালয় স্থাপন।
.
ব্যাঙ্গমা বলে, এ ধরনের পরিকল্পনা যে ভারতীয় সেনাধ্যক্ষদের আছিল না, তা কওয়া যাইব না।
ব্যাঙ্গমি বলে, আপাতত তাদের পরিকল্পনা হইল, মুক্তিবাহিনীকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ১০ মাইল পর্যন্ত সাপোর্ট দিয়ে যাওয়া, যাতে পাকিস্তানি মিলিটারি ঢাকা থেকে সইরা আসে আর তাদের রক্তক্ষরণ হইতেই থাকে। হইতেই থাকে।
ব্যাঙ্গমা বলে, ডিসেম্বর থাইকা তাগো পরিকল্পনা দ্রুত বদলায়া যায়। ইস্টার্ন আর্মির চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব দাবি করেন যে তিনি এই পরিকল্পনা পাল্টে ফেইলা শহরগুলো দখল করার মরিয়া চেষ্টা ত্যাগ করেন। আর যত দ্রুত সম্ভব ঢাকার দিকে যাওয়ার জন্য তার বাহিনীকে পরিচালিত করেন। যা সুফল আইনা দেয়।
সেই কাহিনি শুনব আমরা যথাসময়ে, যথাস্থানে।
.
মধ্য নভেম্বরে ইন্দিরা গান্ধী ইউরোপ, আমেরিকা থেকে ফিরে আসেন আহত সিংহের ক্ষোভ বুকে নিয়ে। যখন ওয়াশিংটনে তিনি নিক্সনের পাশে হেঁটে হেঁটে অভিবাদন গ্রহণ করছিলেন, নিক্সনকে তাঁর পাশে দেখাচ্ছিল ইঁদুরের মতো, কিন্তু নিক্সন তো ইন্ডিয়ানদের বাস্টার্ড আর ইন্দিরা গান্ধীকে দ্যাট ওল্ড বিচ ছাড়া আর কিছুই মনে করতেন না। ইন্দিরা দিল্লিতে ফিরেই মানেকশকে ডাকলেন, বিমানবাহিনী-নৌবাহিনীর প্রধানকে ডাকলেন, বললেন, তোমরা কি প্রস্তুত?
ইয়েস ম্যাম।
আমরা একটা ন্যায়সংগত যুদ্ধ করছি। আমরা নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি। আমরা মানুষের মৃত্যু রোধ করতে চাইছি। আমরা রক্তপাত বন্ধ করতে চাচ্ছি। আমাদের যুদ্ধ ন্যায়যুদ্ধ। আমরা কোনো দেশ দখল করব না। আমরা শুধু আমাদের প্রতিবেশী দেশটাকে অত্যাচারী অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে মুক্ত করব। ইয়াহিয়া খানের বক্তৃতা, সাক্ষাৎকার শুনেছ। সে নাকি আমাকে বলবে, শাটআপ উম্যান, লিভ মি অ্যালোন অ্যান্ড লেট মাই রিফিউজিস ব্যাক। আমাকে সে বলেছে, আমি মেয়েমানুষও নই, লিডারও নই, কিন্তু দুটোই হতে চাই।
সে শুধু আমাকে অপমান করেনি, সে সারা পৃথিবীর সব নারীকে অপমান করেছে। সে আমাদের মাকে অপমান করেছে। যাও। লড়ো। তবে একটা কথা। পৃথিবী যেন দেখে, বলে যে পাকিস্তান আগে আক্রমণ করেছে। মুক্তিবাহিনীকে বলো, পূর্ব বাংলার সীমান্ত অতিক্রম করে ঢুকে যেতে। তাদের পাশাপাশি তোমরাও এগিয়ে যাও। তোমরা তাদের সাপোর্ট দাও। অল আউট সাপোর্ট।
তার মানে তো যুদ্ধ!
হ্যাঁ। তার মানে যদি যুদ্ধ হয়, তবে যুদ্ধ। যাও।
