.
সেসব কিছু হওয়ার আগেই শুরু হয়ে গেল ঘোরতর যুদ্ধ।
৭৯
যুদ্ধ তো চলছিল সেই ২৫ মার্চ রাত থেকেই। ঢাকায় ইপিআর যুদ্ধ করেছে, পুলিশ যুদ্ধ করেছে, ছাত্রজনতা ব্যারিকেডে গুলি খেয়ে মরার আগে হাতে যা ছিল তা ছুঁড়ে মেরেছে পাকিস্তানি মিলিটারির দিকে, কিন্তু রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়া, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বরিশাল, ফরিদপুর–সর্বত্র, সবখানে সংগ্রাম কমিটি, পুলিশ, ইপিআর, আনসার, মুজাহিদ, বাঙালি সৈন্য, বাঙালি নৌসেনা, বাঙালি বিমানসেনা একযোগে বিদ্রোহ করেছে, সমবেত হয়েছে, দলে দলে, তারা ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করেছে, কোথাও গুলি খেয়ে মরেছে, কোথাও হাজার হাজার মানুষ গিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারিদের পরাজিত করে আত্মসমর্পণে বাধ্য করেছে, চট্টগ্রামে বা কুমিল্লায় বা রংপুরে মিলিটারিরা বাঙালি সৈনিকদের ঘুমন্ত অবস্থায় পুরো পরিবারসহ গুলি করে মেরেছে, বেশির ভাগ জায়গায় মার্চ, এপ্রিলে বাঙালিরাই শহর, নগর, বন্দর, গঞ্জ দখল করে উড়িয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল সবুজ-হলুদ পতাকা, মানুষ গোলার সামনে গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছে, মরেছে, কিন্তু মাটি কামড়ে পড়ে থেকেছে এবং দখল ধরে রেখেছে, গড়ে উঠেছে মুক্তিবাহিনী। পাবনায় যেমন বাংলাদেশ সরকারের সিলমোহর বানিয়ে নুরুল কাদের খান সরকারি প্রশাসনের কাজ শুরুও করে দিয়েছিলেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা বাঙালি অফিসারদের নেতৃত্বে লড়াই করেছে, প্রতিরোধ গড়েছে। কুষ্টিয়ায় ইপিআর, পুলিশ, বাঙালি সৈন্যদের সমবায়ে গঠিত মুক্তিযোদ্ধারা যখন পাকিস্তানি ক্যাম্প সার্কিট হাউসে হামলা করতে গেছে, হাজার হাজার মানুষ তখন মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যার যা কিছু তাই নিয়ে যোগ দিয়েছে এবং কুষ্টিয়া মুক্ত করে ফেলেছে।
তারপর স্বাধীনতার ঘোষণা, সরকার গঠন, সেনাপতি নিয়োগের পর আস্তে আস্তে একটা সমন্বয় গড়ে উঠেছে। বেশির ভাগ জায়গা পাকিস্তানি মিলিটারিরা ট্যাংক, কামান বিমানযোগে আক্রমণ করে দখল করে নিয়েছে। কিন্তু দিন ছিল ওদের, রাত ছিল গেরিলাদের। প্রশাসন ছিল ওদের, মানুষ ছিল জয় বাংলার। বাঁচার জন্য হয়তো পাকিস্তানি পতাকা বাইরে তোলা ছিল, ভেতরে ছিল মুক্তিপাগল গেরিলাহৃদয়। সাধারণ মানুষ, সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে হয়তো ৫ লাখ পাকিস্তানপসন্দ, বাকি ৭ কোটি ৪৫ লাখ মানুষই হয়ে উঠেছিল গেরিলা। মুক্তি। সাধারণ মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়েছে, খাদ্য দিয়েছে, তাদের অস্ত্রশস্ত্র রসদ বহন করে দিয়েছে, তাদের খবরাখবর এনে দিয়েছে এবং তার প্রতিক্রিয়ায় মারা গেছে হাজারে হাজারে, তাদের ঘরবাড়ি পাকিস্তানিদের আগুন জ্বালানোর অস্ত্রে জ্বলেপুড়ে ছাই হয়ে গেছে, তাদের নারীরা ধর্ষিতা হয়েছে। কিন্তু মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে থেকে হয়ে। উঠেছে নিজেরাই মুক্তিযোদ্ধা।
ক্যাপ্টেন এম এ মতিন, যিনি ২ নম্বর সেক্টরে মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেছেন, তিনি বলবেন, জুলাই মাসে খালেদ মোশাররফ একদল গেরিলাকে পাঠালেন নারায়ণগঞ্জের টানবাজারে। তাদের মধ্যে একজন ছিল স্বপন সাহা, নারায়ণগঞ্জে তার বাবার ছিল ছোটখাটো ব্যবসা। ছেলেটার বাবা আগরতলায় মেলাঘর মুক্তিযোদ্ধা শিবিরের পাশে শরণার্থীশিবিরে থাকতেন। মেজর খালেদ বললেন, মতিন!
স্যার।
তুমি কি শুনেছ, স্বপন সাহা মারা গেছে।
স্যার।
টানবাজার অপারেশনটা ভালোভাবেই হয়েছিল। তবে ফেরার পথে এক রাজাকারের গুলিতে ছেলেটা মারা যায়।
সিঅ্যান্ডবি ব্রিজ পার হওয়ার সময়!
সম্ভবত। ছেলেরা ফিরে এসেছে। তুমি ডিটেইল জেনে নাও। ভালো ছিল ছেলেটা।
জি স্যার। চোখ দুটো সব সময় হাসত। আর দাঁত দুটো বেরিয়ে থাকত বলে মনে হতো সব সময়ই হাসছে।
ওর ব্যবহৃত কিছু জিনিসপত্র আছে। আর কিছু টাকা নাও। ওর বাবাকে ডাকো। তার হাতে জিনিসগুলো তুলে দাও। টাকা দাও। আর সান্ত্বনা দাও।
ইয়েস স্যার।
ক্যাপ্টেন মতিন লোক পাঠালেন। শ্রাবণের বৃষ্টিদিনে থিকথিকে কাদায় দুর্গন্ধময় শরণার্থীশিবির থেকে স্বপন সাহার বাবা সুবোধ সাহাকে ডেকে আনা হলো। বয়স ৪৫ কি ৪৮, ধবধবে ফরসা, মাথায় চুল নেই বলে মাথা চকচক করছে, বৃষ্টিজলে আর ঘামে মাথায় বিন্দু বিন্দু ঘাম, কপালে একটা লাল জরুল, সুবোধ সাহা এলেন।
স্যার, আমাক ডাকছেন?
জি। স্বপন সাহা তো আপনার ছেলে!
আজ্ঞে।
ও তো আমাদের মুক্তিবাহিনীতে ছিল।
আজ্ঞে।
নারায়ণগঞ্জে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। ফেরার পথে মারা গেছে।
সুবোধ সাহা স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
দেশের জন্য মারা গেছে। এর চেয়ে বড় দান তো আর কিছু হতে পারে। আপনার ছেলের কাপড়চোপড় আছে এই ব্যাগে। আর আমাদের মেজর আপনার জন্য দুই হাজার টাকা দিয়েছেন। এগুলো রাখেন।
কাপড়চোপড়গুলো দ্যান। স্মৃতি থাকুক। টাকা লাগব না।
না, রাখেন।
সুবোধ সাহার চোখ ভিজে গেল। একটু পরে তিনি ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বলতে লাগলেন, আমার একটামাত্র ছেলে। আমার একটামাত্র ছেলে।
মতিন বললেন, একটামাত্র ছেলে হারানোর শোক কী আমি বুঝি সুবোধবাবু।
চুপ করে চেয়ে রইলেন তিনি।
