সাইফুল অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন শাড়ি পরিহিত ইন্দিরা গান্ধীর দিকে। এই ভদ্রমহিলা মাত্র আমেরিকা, ইউরোপ ভ্রমণ করে এসেছেন। আসার পরেই বলে দিয়েছেন, আমরা যুদ্ধ চাই না, তবে যুদ্ধ বেধে গেলে কী করতে হবে আমরা জানি। আমরা প্রস্তুত। আর তিনি এখন এই নব্বই বছরের আগুনখেকো মওলানার লেকচার মন দিয়ে শুনছেন! এত সময় কোথায় তার!
.
ব্যাঙ্গমা আর ব্যাঙ্গমি বিশ্লেষণ করবে :
ইন্দিরা গান্ধীর হিসাব পাকা। রোজ এক কোটি শরণার্থীকে খাওয়ানো আর যুদ্ধে পাকিস্তানের কাছে হেরে যাওয়ার তুলনায় মওলানা ভাসানীকে তার যা ইচ্ছা তা-ই খাওয়ানো এবং যেখানে ইচ্ছা সেখানে নিয়ে যাওয়া অনেক সহজ। মওলানা ভাসানীর একটা প্রতীকী মূল্য আছে। যার বিনিময়ে চীনাপন্থীদের সামলে রাখা যাবে। এমনকি হয়তো তাঁর কারণেও চীনারা ভারতের দিকে তাক করা বন্দুকের নল নামিয়ে নিতে পারে। কাজেই ইন্দিরা গান্ধী বুঝেশুনেই মওলানা ভাসানীর কথা হেসে হেসে শুনছেন আর তার সব সাধ-আহ্লাদ পূরণ করে চলেছেন।
৭৮
এবিএম মূসা লম্বা, তামাটে বর্ণ, চোখ দুটো উজ্জ্বল, গোলাকার নাকের একজন হাসিখুশি মানুষ। ১৯৭১-এ বয়স ৪০। মে মাসে এশিয়ান নিউজ-এর হয়ে কাজ করবেন বলে হংকংয়ের উদ্দেশে রওনা দেন। তারপর সেখান থেকে সোজা কলকাতা। মুজিবনগর সরকারের নিকটবর্তী হলেন এশিয়ান নিউজ এর প্রতিনিধি হিসেবেই। উঠলেন ভাড়া বাসায়, সল্ট লেকে। ছোট্ট দুই রুমের বাসায় নিজ পরিবার ছাড়াও সাংবাদিক ফয়েজ আহমদ ও অন্য বন্ধু সাংবাদিকেরা গাদাগাদি, ঠাসাঠাসি করে ঘুমোন। তিনি খবর পাঠান বিবিসি ও লন্ডনের সানডে টাইমস-এ। তার পরিচয় তিনি বিদেশি সাংবাদিক। প্রায়ই তিনি যান মুক্তাঞ্চলে। খবর আর ছবি পাঠান তার প্রতিষ্ঠানগুলোয়। মুজিববাহিনীর তোফায়েল আহমেদ, শেখ মণি আর শেখ শহীদুল ইসলাম। তাঁকে মুক্তাঞ্চলে যেতে সাহায্য করেন।
বিকেলবেলা বিদেশি সাংবাদিকেরা রোজ সমবেত হন কলকাতার গ্র্যান্ড হোটেলে। সবাই মিলে খবর লেখেন। ফোর্ট উইলিয়ামে প্রতিদিন ইস্টার্ন কমান্ডের মেজর জেনারেল জ্যাকব ব্রিফ করেন। মুজিবনগরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিডিয়া কক্ষে থাকেন আমিনুল হক বাদশা।
নভেম্বরের শেষ পক্ষে একদিন এবিএম মূসা যাচ্ছেন রণাঙ্গনে। কলকাতা থেকে বেশি দূরে নয়। যশোর মুক্ত হচ্ছে। যশোরের একটা মুক্তাঞ্চলে চলেছেন তাঁরা। বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে পড়েছেন, তার সঙ্গে গাইড হিসেবে আছে মুক্তিবাহিনীর প্রতিনিধি।
হঠাৎই তিনি দেখতে পেলেন একটা ট্রেঞ্চে একটা বালক মুক্তিযোদ্ধা। সে একটা মেশিনগান হাতে পজিশন নিয়ে আছে। এবিএম মূসা ছবিটা তুলে ফেললেন। ছবি তুলে একটু কথা বললেন জামালের সঙ্গে। কিশোর জামাল আগাগোড়াই চুপচাপ, এবিএম মূসা পরে তার স্মৃতিকথায় লিখেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর এই ছেলেটা অমিশুক, লাজুক। তবে মূসা জানেন, জেনারেল এস এস উবানের বড় প্রিয় এই কিশোর। দেরাদুনে ট্রেনিংয়ের সময় জেনারেল উবান তাঁকে ডাকেন কাব টাইগার। বাচ্চা বাঘ। উবান জামালের ব্যাপারে মুগ্ধ, তাকে নিজের ছেলের মতো যত্ন করেন, ভালোবাসেন, তাকে কাছছাড়া করতে চান না। আর জামাল বঙ্গবন্ধুর ছেলে হিসেবে বাড়তি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা তো করেনই না, তা পেলে সযত্নে এড়িয়ে যান। তিনি উবানকে বলেছেন যে তিনি শেখ মুজিবের ছেলে, কাজেই তাকে এমন কাজ করতে হবে, যাতে বাবার মান বজায় থাকে, এমন কাজ তিনি করতে পারবেন না যাতে বাবার বদনাম হয়। ফলে তিনি নিজে নিজে কঠিন সব কাজ বাছাই করতেন। প্রশিক্ষণের সময়টাতে দেরাদুনের ঠান্ডার মধ্যে জামাল দিনরাত খাটতেন, কঠোর পরিশ্রম করতেন। অস্ত্রচালনায় দ্রুতই দক্ষ হয়ে ওঠেন। তবে তিনি যখন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনতেন, আর তাতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বাজানো হতো, তখন তার চোখ দিয়ে পানি গড়াত। তিনি তাঁর মায়ের জন্য কাঁদেন, রাসেলের জন্য কাঁদেন, হাসু আপা আর সদ্যোজাত ভাগনে জয়ের জন্য কাঁদেন, রেহানার জন্য কাঁদেন। কিন্তু সেই অঞ কাউকে দেখাতে চাইতেন না। উবান তাকে তার বাগানবাড়িতে ডেকে নিতেন, গল্প করতেন। উবানের মনে হলো, এই ছেলে বড় হয়ে বাবার নাম রাখবে।
.
এবিএম মূসা ছবি আর খবর পাঠিয়ে দিলেন সানডে টাইমস, লন্ডনে। খবর আর ছবি ছাপা হলো ২ ডিসেম্বর। খবরের শিরোনাম বয়েজ অব টুয়েলভ ফাইট দ্য ওয়ার। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় বেরোল ইন্ডিয়ান টাইম ফ্রন্টিয়ার টাউন স্টিল আন্ডার ফায়ার। তার সঙ্গে ছবিতে দেখা যাচ্ছে শেখ জামাল, হাতে হেভি মেশিনগান।
ছবি ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মুজিবনগরে হইচই পড়ে গেল। ডাকা হলো
এবিএম মূসাকে। করেছেন কী!
কেন, কী করেছি?
আপনার খবর তো ভালো। মিসেস ইন্দিরা গান্ধীও তাঁর ভাষণে এই খবরের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু ছবিটা যে শেখ জামালের। বঙ্গবন্ধুর মেজ ছেলের।
সেই জন্যেই তো স্কুপ করেছি। আমি তো পরিচয় দিইনি যে এটা শেখ জামাল।
কিন্তু পাকিস্তানিরা তো তাকে চেনে। বেগম মুজিব এত দিন ধরে পাকিস্তানি মিলিটারিকে বলে এসেছেন, আমার ছেলে হারিয়ে গেছে। তোমাদের বন্দিশালায় ছিল সে। কেমন করে হারাল? তাকে বের করে দাও। এখন ওরা কী বলবে? বেগম মুজিবের ওপরে না আবার অত্যাচারের স্টিমরোলার চালিয়ে দেয়। ছেলে কী করে মুক্তিবাহিনীতে গেল!
