একদিন তাকে সেমাই খেতে দেওয়া হলো। তিনি বললেন, ব্যাপার কী? সেমাই কেন?
খাবার আনা লোকটা বলল, হুজুর, আজকে ঈদ।
একটু পরে এল কতগুলো ফল।
তিনি সেসব ছুঁয়েও দেখলেন না। তিনি বললেন, আজকে ঈদ। আমাকে নামাজ পড়তে জামাতেও যেতে দিল না? এর আগেও তো নিঃসঙ্গ সেলে ছিলাম। তখনো তো ঈদের দিন জামাতে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হতো। ঠিক আছে। দরকার হবে না।
আমি ২৫ মার্চ দেখেছি, তোমরা ঘুমন্ত দেশবাসীকে কামান, ট্যাংকের গোলা দিয়ে হত্যা করছিলে, তাদের ঘরবাড়িতে আগুন দিচ্ছিলে। আমি জানি না আমার দেশবাসী ঈদ করতে পারছে কি না। আমি এখন সেমাই, ফল খেতে পারব না।
তিনি অজু করলেন। দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ ছয় তাকবিরের সঙ্গে পাঠ করলেন। তারপর দুহাত তুলে ধরে বলতে লাগলেন, হে আল্লাহ, আমি আমার দেশ আর আমার দেশের মানুষের নিরাপত্তার ভার তোমার হাতে তুলে দিলাম। তুমি তাদের রক্ষা করো। তুমি তাদের ভালো রেখো। আমিন।
এই তার ঈদ।
৭৭
মওলানা ভাসানী এখন দিল্লিতে। অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সের হাসপাতালে একটা কেবিনে।
তার পেটের পীড়া হয়েছিল। অবস্থা বেশ সংকটাপন্ন হলে তাকে উড়িয়ে দিল্লি আনা হয় দেরাদুন থেকে।
ঈদের দিন। মওলানা ভাসানী ঠিক করেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দাওয়াত খাওয়াবেন। প্রধানমন্ত্রী আসবেন হাসপাতালে।
ইন্দিরা গান্ধীর জন্য কী কী খাবারের আয়োজন করতে হবে, তা তিনি ধরিয়ে দিলেন ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে। শুনেন, বিরিয়ানি হইতে হইব খুঁটি ঘিয়ের। ডালডা দিয়া বানাইলে হইব না।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তিনি যখন যা চাইতেন, তা-ই অক্ষরে অক্ষরে পালন করত। তিনি বলেছেন, ওরসে যাব। গেছেন। জনসভায় বক্তৃতা দেব। দিয়েছেন। তিনি প্রায় অসম্ভব ধরনের ফরমাশ দিতেন। টাকি মাছের ভর্তা খাব। ঢেঁকিশাক ভাজি খাব। তাঁর সেই চাওয়া পূরণ করা পাহাড়ি শহরগুলোতে কঠিন হতো। তবু ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা প্রাণপণ চেষ্টা করতেন। হঠাৎ করে তিনি বলে বসতেন, মৌসুরী যাব। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হতো। এইভাবে তিনি কত জায়গা যে বেড়িয়েছেন। তার সচিব সাইফুল ইসলাম তার বইয়ে লিখেছেন, লছমনঝুলা, গীতাভবন, মহেশ যুগীর হিমালয়ের আশ্রম, ঋষিকেশ, হরিদ্বার, নরিন্দনগর, দক্ষযজ্ঞের ভিটা, বশিষ্ঠ মুনির তপোবন, মিরাট, অরুন্ধতীর গুহা আরও কত জায়গা যে গেছেন। তিনি বললেন, আসাম যাব। আসাম বিষয়ে ভারতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের দোনোমনা ছিল। কিন্তু শেষে আসামের ভাসানের চরেও তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে তিনি স্বাধীন ছিলেন। কিন্তু সব জায়গাতেই নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে ঘিরে দূর থেকে নজরে রাখত। কাজেই তিনি নজরবন্দী ছিলেন।
এখন, ২০ নভেম্বর ১৯৭১ তিনি দিল্লির হাসপাতালে বিরিয়ানি, ফিরনি, সেমাইয়ের ব্যাপক আয়োজন করতে বলেছেন। জাদুর মতো তা-ও হয়ে গেছে। ডাক্তার, নার্স, আমন্ত্রিতরা চলে এসেছে। কিন্তু বিরিয়ানির ডেকচির ঢাকনা খুলে তিনি বললেন, এই বিরিয়ানি তো ঘিয়ের না। ডালডার।
ওরা বলল, না হুজুর, ঘিয়ে পাকানো।
ঘিয়ে পাকানো হইলে গন্ধ কই?
এটা মোষের দুধের ঘি।
না, হইব না। খাঁটি গব্যঘৃতের বিরিয়ানি লাগব।
মওলানা ভাসানীর সঙ্গে তর্ক করা নিষেধ। ভারতীয়রা দৌড়াল খাঁটি গব্যঘৃত দিয়ে বিরিয়ানি রান্না করে আনতে। এক পাতিল বিরিয়ানি এল। তিনি ঢাকনা খুলে চামচে বিরিয়ানি তুলে বললেন, দেখলা সাইফুল, এইবার
সুবাসটা কী রকম ফার্স্টক্লাস!
জি হুজুর। খুব ফার্স্টক্লাস।
ইন্দিরা গান্ধী সেদিন এলেন না।
তবে তাঁর পাঠানো উপহার, ফুল, মিষ্টি, ফল নিয়ে এলেন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, সেবক, কর্মচারীরা।
মওলানা ভাসানীই গেলেন ইন্দিরা গান্ধীর সফদরজং রোডের কার্যালয়ে। ইন্দিরা গান্ধী ভবনের বাইরে এসে গাড়ির দরজা খুলে জোড় হাতে নমস্কার করে হুজুরকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন।
সাইফুল সঙ্গে ছিলেন। তিনি প্রমাদ গুনছেন, এই বুঝি হুজুর ইন্দিরা গান্ধীকে বলে বসেন বিরিয়ানিতে ঘি সমস্যা হয়েছিল। ভাসানী তা করলেন না। বললেন, আপনার বাবার সঙ্গে আমার দোস্তি ছিল। মওলানা আবুল কালাম আজাদ আমার বন্ধু ছিলেন। আপনি আমার মেয়ের মতো।
ইন্দিরা হেসে বললেন, আমি তো আপনার মেয়েই। তো মেয়ের মেহমানদারিতে কোনো ত্রুটি হচ্ছে না তো?
না না। আর কোনো ত্রুটি হলে তা কি আপনার কানে না উঠিয়ে ছাড়তাম। তবে এসেছিলাম যুদ্ধ করতে, থাকলাম রাজ-অতিথি হয়ে। এই আরকি!
মেয়ের বাড়িতে বাবা এসে যদি সমাদরে ত্রুটি দেখতে পান, মেয়ের বদনাম হবে। কিন্তু আপনি বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা কমিটির মিটিংয়ে যাচ্ছেন না কেন?
গেলেই ঝগড়াঝাটি লেগে যাবে।
ঝগড়াঝাটি কোথায় হয় না? এক পরিবারের মধ্যে হয় না? এক পার্টির ভেতরে হয় না?
তা ঠিক।
আপনি কাইন্ডলি উপদেষ্টা পরিষদের মিটিংয়ে যাবেন।
যাব। খালি একটা কথা। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেন না কেন?
সময় হলেই দেব। কিন্তু লড়াইটা আপনাদের। আপনাদেরই করতে হবে। আপনারা লড়াই ঠিকভাবে করুন। আমার কাজও আমি করব।
আচ্ছা আমি কমিটির মিটিংয়ে যাব। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের মুক্তিসংগ্রামে আমাদের পাশে থাকবার জন্য।
কথা হলো উর্দুতে। মওলানা ভাসানী এরপর বিশাল লেকচার দিলেন চীন আর রাশিয়া যদি এক হতে পারে, তার সুফলটা পৃথিবীতে দেশে দেশে নির্যাতিত মানুষের মুক্তির জন্য কীভাবে কাজে লাগবে তা নিয়ে।
