রেহানা কান খাড়া করলেন…সময় হয়েছে নতুন খবর আনার।
রেডিও বন্ধ করলেন। সন্ধ্যা নেমে আসছে। ইফতারের সময় হয়ে এল।
৭৫
রিমি বলল, আজ ঈদ। আজকেও আলু আসবে না।
রিপি বলল, নিশ্চয়ই আসবে।
দুপুরে আজ কী দিয়ে ভাত? আম্মু। রিমি চিৎকার করল।
রান্নাঘর থেকে লিলি গলা উঁচিয়ে বললেন, বেগুনভর্তা, আলুভর্তা আর ডাল। শোনো, আমি পোলাও-কোরমা রাঁধতে পারতাম। কিন্তু ভেবে দেখো, শরণার্থীশিবিরে কত লক্ষ লক্ষ মানুষ কী খাচ্ছে, আদৌ খেতে পাচ্ছে কি না আমি তো জানি না।
সোহেলের জ্বর। লিলি একবার করে গিয়ে তার কপালে হাত দেন।
.
২০ নভেম্বর ১৯৭১ সকালে নামাজ হয়েছে থিয়েটার রোডের বাড়ির মাঠে। তাজউদ্দীন নামাজ পড়েছেন, কর্নেল ওসমানী, শেখ কামাল নামাজ পড়েছেন। শেখ কামালের সঙ্গে নামাজ শেষে তাজউদ্দীন কোলাকুলি করছেন, এই ছবি জয় বাংলা পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হয়েছিল।
রিমি, রিপি সারা দিন অপেক্ষা করে। আব্বু আসবেন। তাদের আব্বু এলেন না।
ব্যারিস্টার আমীর, জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম আসেন রিমি রিপিদের বাসায়।
লিলি বললেন, আপনাদের ভাইকে একটু বাসায় আসতে বলেন। কত দিন দেখা হয় না। আজকে ঈদের দিন একবার এলে কী হয়!
আমীর বললেন, তাজউদ্দীন ভাইয়ের কতগুলো আবেগ আছে। যে কেউ বলতে পারেন, তরল ভাবালুতা। আমি বলব, তার ইনোসেন্স এবং সিনসিয়ারিটি। এক রাতে ঝড় এসেছে। বৃষ্টির পানি ঢুকছে জানালা দিয়ে। তিনি জানালা বন্ধ করতে গিয়ে করলেন না। জানালায় মুখ লাগিয়ে বাইরের ঝড়বৃষ্টি দেখতে লাগলেন। তারপর কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, শরণার্থীশিবিরে লক্ষ লক্ষ মানুষ এই ঝড়ে না জানি কত কষ্ট করছে। যে কেউ বলবে, আমিও বলব, এটার কোনো মানে হয় না। উনি জানালা বন্ধ করলেই কী, না করলেই কী। তাতে শরণার্থীশিবিরের মানুষদের দুঃখ-শোক কমবে বা বাড়বে না। তাদের দুঃখ দূর করতে হবে দেশ শত্রুমুক্ত করে। সেটা তিনি মানবেন না। বুঝবেনও না। এখানে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দেখা করে গেলে মোটেও কোনো ক্ষতি ছিল না। কিন্তু তিনি এটা করবেন না। তিনি যাবেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ফ্রন্টে।
লিলি বললেন, উনি না এলে আপনারা কাইন্ডলি ওনাকে জোর করে আনবেন।
রিমি-রিপি বুঝে গেল, আব্বু আসবেন না।
.
তাজউদ্দীন জিপে উঠেছেন। জনসংযোগ অফিসার নজরুল ইসলামও আছেন তাঁর সঙ্গে। গাড়ি ডা. সুন্দরীমোহন অ্যাভিনিউয়ের ফ্ল্যাটবাড়ির সামনে দিয়ে গেল। এই বাড়িতেই মন্ত্রীদের পরিবার থাকে। জোহরা তাজউদ্দীন থাকেন।
নজরুল ইসলাম বললেন, স্যার, গাড়িটা থামাই। ভাবি একটুক্ষণের জন্য যেতে বলেছেন। আমাদের বলেছেন আপনাকে জোর করে ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
তাজউদ্দীন বললেন, নো।
গাড়ি চলছে। কলকাতা থেকে তারা সোজা যশোর সীমান্তের দিকে রওনা হয়েছেন। বিকেলের আলো এসে পড়ছে তাদের চোখেমুখে।
সন্ধ্যার পর রাতের অন্ধকার নেমে এল। গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠল। খানিকক্ষণ চলার পর ড্রাইভার বললেন, এসে গেছি।
তাঁরা নামলেন। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি। মুক্তাঞ্চল। মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা এখানে ক্যাম্প করে আছে। মাথার ওপরে গাছগাছড়ার ছাদ। তাজউদ্দীন এগিয়ে যেতে লাগলেন ক্যাম্পের দিকে। তাঁর সঙ্গের সিকিউরিটির লোকেরা দৌড়ে আগে গেল। ক্যাম্পের কমান্ডার এলেন। তাজউদ্দীন কমান্ডারকে জড়িয়ে ধরলেন।
পেছনের গাড়িতে ফল, বিস্কুট, খেজুর ছিল। তাজউদ্দীন কমান্ডারের হাতে সেসব তুলে দিয়ে বললেন, ডিস্ট্রিবিউট করে দিয়ো।
তাদের ক্যাম্পের ভেতরে বসতে বলা হলো। চেয়ার নেই। তারা মাটিতে বসলেন। ছেলেরা সেমাই রান্না করেছে। তাজউদ্দীনকে একটা বাটিতে করে সেমাই এনে দেওয়া হলো।
তাজউদ্দীনের ডায়াবেটিস। আজ সারা দিনের পর প্রথম তাজউদ্দীন মুখে খাবার তুললেন। তারপর বললেন, ভাইয়েরা, আর কটা দিন কষ্ট করো। আজ বাংলার ঘরে ঘরে ঈদের আনন্দ নাই। আছে স্বজন হারানোর কান্না। কিন্তু আমি তোমাদের কথা দিচ্ছি, আগামী ঈদ আমরা মুক্ত স্বদেশে পরিপূর্ণভাবে করতে পারব।
.
রাত বাড়ছে। রেডিওতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিশুতি রাতের অনুষ্ঠানও শেষ হয়ে গেল।
রিপি বলল, আব্বু আজকে বোধ হয় আর আসবেন না।
রিমি বলল, আম্মু, আব্বু ঈদের রাতেও আসবেন না।
লিলি বললেন, তোমাদের আব্বু মুক্তিযোদ্ধাদের দেখতে গেছেন বলে খবর পেলাম। কলকাতা আসতে আসতে ভোর হয়ে যাবে। তোমরা ঘুমিয়ে পড়ো।
দুই বোন চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগল।
৭৬
শেখ মুজিবুর রহমানকে একটা সেলে বন্ধ করে রাখা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বিচার অকারণে দীর্ঘ হচ্ছিল। এক দিকে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানান এই ঘোষণার মাধ্যমে যে এই বিচার অবৈধ, অন্য দিকে সাক্ষীদের যখন মি. ব্রোহি জেরা করেন, তখন প্রমাণিত হয়ে যাচ্ছিল যে সাক্ষীদের সাজিয়ে শিখিয়ে-পড়িয়ে আনা হয়েছে। যা তারা বলছে, তা তারা দেখেনি, শোনেনি। ইয়াহিয়া তখন নতুন আইন জারি করেন, সাক্ষীদের জেরা করারও দরকার নেই, ম্যাজিস্ট্রেটের সইসহ প্রাপ্ত সাক্ষ্যই যথেষ্ট। শেখ মুজিবকে তাই আর বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় না। ফলে সেলের বাইরেও তাকে বেরোতে দেওয়া হয় না। তিনি এক জায়গায় একা একা থাকতে থাকতে দিনক্ষণের হিসাব ভুলে গেছেন।
