মা চিঠি পড়ে চোখের পানি মোছেন। আর বলেন, বাইরে মেশিনগান ফিট করে মিলিটারিরা দাঁড়ায়ে আছে, এদের কি জানের মায়া নাই?
রাসেলের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযোদ্ধা খেলেন রেহানা। রাত হলে প্রথম কাজ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনা। আব্বার ৭ মার্চের ভাষণ রোজ প্রচার করা হয়। বজ্রকণ্ঠ। পিজি হাসপাতালের কেবিনে কামাল ভাইয়ের বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা জিল্লু ভাই বলেন, সব মুক্তিযোদ্ধা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শোনে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ রোজ রাতে শোনে, তবু আবার শুনতে ভালো লাগে। জিল্লু ভাই বলেন, ৭ মার্চের ভাষণটা শুনলে রক্তে আগুন লাগে। মনে হয়, এক্ষুনি ছুটে যাই রণাঙ্গনে। গুলি করে শত্রুদের নির্মূল করি।
রাসেল বলে, এই দেনা আপা, তোমার সৈন্য মরে গেছে তো। মুক্তিরা গুলি করেছে তো।
মা বলেন, রাসেল, আস্তে কথা বলো। বাইরে ওরা শুনলে কি-না-কি ভাববে।
হাসু আপা বলেন, রেহানা, জয়কে একটু নে। আমি একটু রান্নাঘরে যাই।
রেহানা জয়কে কোলে নেন। জয় চোখ গোল গোল করে তাকায়। একা একা কী যেন বলে।
রাসেল বলে, জয় বলো, জয় বাংলা।
জয় একটা কিছু বলে। রাসেল বলল, বলেছে বলেছে। জয় বাবু জয় বাংলা বলেছে।
.
বিকেলবেলা তাঁরা শুয়ে বসে আছেন।
একা একা কষ্ট করতে করতে রেনু অসুস্থ বোধ করেন। মেঝেতে শুয়ে থেকেও বোধ হয় ঠান্ডা লেগে গেছে। তিনি হাঁচি দিচ্ছেন।
হাসিনা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন।
একটা আশার খবর শোনা যাচ্ছে। চারদিকে পাকিস্তানি সৈন্যরা মার খাচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা এরই মধ্যে অনেক জায়গা দখল করে নিয়েছে। মুক্তাঞ্চলের আয়তন ক্রমাগত বাড়ছে। ঢাকাতেও গেরিলা অভিযানের সংখ্যা ও তীব্রতা বেড়ে গেছে। প্রায়ই গোলাগুলি হয়। গভর্নর মোনেম খানকে ঢাকায় তার বাসার ভেতরে মুক্তিবাহিনী গুলি করেছিল। পরে তিনি মারা গেছেন।
ঢাকায় গভর্নর বদল হয়েছে। চোখের ডাক্তার মালিক হয়েছেন গভর্নর। রেডিওতে এই সব খবর শোনা যায়। মা বলেন, এই ডা. মালিকটা আবার কেডা? তার মন্ত্রীগুলানও হয়েছে একেকটা দশাসই। আবুল কাশেম, এ এস এম সোলায়মান, মওলানা এ কে এম ইউসুফ, আব্বাস আলী খান, আখতারউদ্দীন আহমদ, নওয়াজেশ আহমদ, মওলানা ইসহাক, ওবায়দুল্লাহ মজুমদার, শামসুল হক, মং সু প্রো। টিক্কা খান আর গভর্নর নেই। পরাজয় আসন্ন দেখে কেটে পড়েছে, নাকি তাঁকে সরানো হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের অগ্রযাত্রা দেখে। মালিক গভর্নর। নিয়াজি সামরিক আইন প্রশাসক। রাও ফরমান আলী বেসামরিক প্রশাসক। ওরা কি আমেরিকাকে বোঝাতে চাইছে। বাংলাদেশে এখন বাঙালির শাসন। বাঙালিকে সবকিছু দেওয়া হয়েছে। এরপর কেন ওরা স্বাধীনতা চায়?
পাকিস্তান রেডিওর খবর শুনতে শুনতে হাসিনা বললেন, যুদ্ধে হেরে যাবে বলে পাকিস্তানি মিলিটারিরা পালাচ্ছে, আর এই বেইমানগুলো মিরজাফরি করতে এগিয়ে এসেছে। এরা চিরটাকাল এই রকম বেইমানিই করেছে। এদের পরিণতি হবে মোনেম খানের মতোই।
রোজার মাস। রেনু, রেহানা, রমা রোজা আছেন। একটু পরে ইফতারের সময় হয়ে আসবে। রেনু উঠলেন। হাসিনা বললেন, মা তোমার শরীরটা ভালো না। তুমি শুয়ে থাকো। আমি ইফতারি সাজাচ্ছি।
রেহানা একটা ঠোঙা পড়ছেন। কাগজের ঠোঙায় করে বাজার এনেছিল রমা।
রাজাকারদের সাফল্যজনক অভিযান। দৈনিক পাকিস্তান। সিলেট থেকে প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ, রাজাকারদের আলশামস বাহিনী সুনামগঞ্জে উত্তর পশ্চিম এলাকায় টহল দেওয়ার সময় দুটো সন্দেহজনক নৌকাকে আটক করলে আরোহীরা তাদের প্রতি গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। ফলে একজন রাজাকার আহত হয়। রাজাকাররা সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা গুলি চালালে নৌকার আরোহীরা পানিতে লাফিয়ে পড়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের ৪ জন নিহত হয়। রাজাকাররা নৌকা থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধার করে।
রেহানা মন খারাপ করেন। কে জানে, এই মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে জামাল ভাই, কামাল ভাই, জিল্লু ভাই বা তাদের বন্ধুবান্ধবও আছে কি না!
মাকে এই খবর বলা যাবে না। রেহানা রেডিও ঘোরাতে থাকেন।
পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্বমন্ত্রী এ কে এম ইউসুফ গত সোমবার সাতক্ষীরায় স্থানীয় অফিসার ও রাজাকারদের সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন। মন্ত্রী জাতির প্রতি রাজাকারদের সেবার উচ্চ প্রশংসা করেন। স্থানীয় পৌরসভা হলে এক জনসভায় ভাষণদানকালে মন্ত্রী বলেন, যদি ভারত পাকিস্তান আক্রমণ করে, তবে তাকে উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে।
রেহানা রেডিও খুলে আকাশবাণী ধরলেন। গান হচ্ছে : রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে, রানার ছুটেছে খবরের বোঝা হাতে। রানার গ্রামের রানার, সময় হয়েছে নতুন খবর আনার। হেমন্তের গানের সঙ্গে রেহানা নিজের গলা মেলান আর জয়কে হাঁটুর ওপরে রেখে দোলাতে থাকেন।
সত্যি তো সময় হয়েছে নতুন খবর আনার! তা পেতে হলে রাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনতে হবে। বিবিসিতেও ভালো ভালো খবর থাকে।
রাসেল বলল, দেনা আপা খেলবা না!
আমি যে জয়কে কোলে করে রেখেছি ভাই! রেহানা বললেন।
আকাশবাণী কলকাতা। খবর পড়ছি দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও রাজাকাররা দলে দলে আত্মসমর্পণ করছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
