কী বাড়ি ছিল। কী রকম ফাঁকা হয়ে গেল। ৩২ নম্বর লোকজনে সারাক্ষণ গমগম করত। ১৮ নম্বর রোডের এই বাড়িতে গৃহবন্দী হওয়ার পরও তো খোকা চাচি, মমতাজ চাচি, তার বাচ্চাকাচ্চারা ছিল। জামাল ভাই চলে যাওয়ার পর খোকা চাচাকেই সন্দেহ করল মিলিটারি। বলল, তুমিই গাড়ি করে পার করে দিয়েছ। মমিনুল হক খোকা চাচাকে হত্যা করার অর্ডার হয়ে গিয়েছিল। কী বিবেচনায় কে জানে, ধরে নিয়ে গিয়েও তাকে ছেড়ে দেয় শেষ মুহূর্তে। একটা ফোন এসেছিল। মেজর নাকি বলেছিল, তোমার ভাগ্য ভালো। আধঘণ্টা পরে যদি এ ফোনটা আসত, ততক্ষণে তুমি আজরাইলের ঘরে।
শুনে মা তাকে বলেছেন, ভাইডি, তুই এই বাড়িতে আর থাকিস না। তোকে আবার কবে ধরে নিয়ে যায়, কোনো ঠিকঠিকানা আছে। ধরে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেললে আমি ভাইহারা হব। এটা আমি চাই না।
ভেজা কাথা থেকে পানি পড়ছে টপটপ। রেহানা সেদিকে তাকালেন। খোকা চাচা, চাচি ও তাঁদের বাচ্চারা চলে গেছেন। যে ফুফু-খালারা ছিলেন, তারা তো আগেই গেছেন। দুলাভাই ছিলেন, তাঁরও শরীরটা খারাপ। তিনি ভর্তি হয়েছেন পিজি হাসপাতালে।
বাড়িতে ফরিদ নামের যে চীনাম্যান কাজের ছেলেটা ছিল, সে একদিন বাজার করতে গেছে। আর ফেরে না। মা যে কত দুশ্চিন্তা করলেন। পাকিস্তানি মিলিটারি, রাজাকার, বিহারি, আলবদর, চারদিকে মৃত্যুদূতেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে।
হাসু আপা জয়কে কোলে নিয়ে পায়চারি করছেন, আর ছড়া শোনাচ্ছেন।
খোকা ঘুমুল পাড়া জুড়ল, বর্গি এল দেশে। বুলবুলিতে ধান খেয়েছে, খাজনা দিব কিসে! সত্যি দেশে বর্গি এসে গেছে, রেহানা মনে মনে বললেন।
মায়ের ওপর দিয়ে যা ধকল যাচ্ছে। আম্বিয়ার মা থাকলে রান্নাবান্নার কাজে মা অনেক সাহায্য পেতে পারতেন। কোটা-বাছা, থালাবাসন মাজা, মসলা পেষা। এখন আবদুল নেই। ফরিদ নেই। শুধু রমা একা। রমা কাজে কিছুটা সাহায্য করেন। কিন্তু তরকারি কোটা তো আর রমাকে দিয়ে হয় না। মা আবার জয়ের কাপড়চোপড় অন্য কারও হাতে ধোয়া হোক, এটা চান না। রেহানা যতটুকু পারেন, মাকে কাজে সহযোগিতা করেন। হাসিনাও মাঝেমধ্যে জয়কে ঘুম পাড়িয়ে রেখে কিংবা রেহানার কোলে দিয়ে সংসারের কাজে হাত লাগান। কোনো দিন রান্না করেন। কোনো দিন মাছ কুটে দেন। একদিন তো মাছ কোটা নিয়ে হাসির কাণ্ড ঘটে গেল। হাসু আপা মাছ কুটেছেন। আবদুল মাছ ধুয়েছে। রান্না করলেন মা। দেখা গেল, মাছ তিতা। মানে হলো পিত্তথলি ফেলা হয়নি। পিত্ত গলে তরকারির সঙ্গে মিশে তিতা হয়ে গেছে। আপা বলেন, আবদুল কেন ধোয়ার সময় ফেলেনি! শুনে মা হাসলেন। বললেন, ঠিকই তো আবদুল, তুই কেন মাছ ধোয়ার সময় পিত্তিটা বার করে ফেলে দিলি না!
রাসেল এল বারান্দায়। দেনা আপা কী করো?
এই তো আকাশ দেখি।
আসো খেলি। খেলবা?
কী খেলা?
যুদ্ধ যুদ্ধ।
ঘরে আসবাব নেই। দুইটা মাত্র মিলিটারি খাট।
তার একটাতে থাকে জয়। আরেকটাতে চাচি থাকতেন। এখন এটা রাসেলের দখলে। তারা বিছানায় গেল। খেলার নিয়ম হলো, বালিশের আড়ালে দুইটা কাপড়ের বানানো পুতুল নিয়ে রাসেলের মুক্তিবাহিনী। আর দুইটা পুতুল নিয়ে রেহানার পাকিস্তানি মিলিটারি। রেহানা বালিশের আড়াল থেকে তার সৈন্য বের করলে রাসেলের মুক্তিবাহিনী গুলি করবে।
রেহানা আর রাসেল সত্যিকারের গুলি হাতে নিয়ে দেখেছে। সত্যিকারের গ্রেনেড নাড়াচাড়া করেছে। দাদা-দাদি পিজি হাসপাতালের কেবিনে। সেখানে মা, খোকা চাচা যেতেন রাসেল রেহানাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে। পেছনে থাকত আর্মির গাড়ি। কেবিনে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র রেখে যেত। টিফিন ক্যারিয়ারের বাটিতে সেই গ্রেনেড নিয়ে রেহানা রাস্তায় গিয়ে অপেক্ষমাণ আরেকজন মুক্তিযোদ্ধার হাতে তুলে দিতেন।
মুক্তিযোদ্ধা ভাইয়ারা বলেন, আমাদের ওপর কঠোর নির্দেশ আছে। যে বাসায় থাকবা, সে বাসায় অস্ত্র রাখবা না। অপারেশন শেষ হলে সেই বাসায় ফিরতে পারবা না। আমরা থাকি এক জায়গায়, অস্ত্র রাখি আরেক জায়গায়। হাসপাতাল অস্ত্র রাখার জন্য সেইফ। আর আমরা তো আশপাশেই অপারেশন। করব। তারপর অন্যখানে চলে যাব।
ফলের ঝুড়িতে করে রিভলবার আসে। ডানোর কৌটায় আসে গ্রেনেড। একদিন তো বেডপ্যানের ভেতরে এল একটা মেশিনগান।
আবার সেটা নিচে মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের হাতে তুলে দিয়ে আসতে হয়। ডাক্তার সেজে একজন এলেন। রেহানা তো দেখেই বুঝলেন কে এসেছেন। তিনি বললেন, তুমি এই ব্যাগটা নাও। রাসেল বলে, আমি এই ব্যাগটা নিই। তারা অস্ত্র নিয়ে ডাক্তারবেশী গেরিলার পেছন পেছন নিচে চলে যান। আর ডাক্তার নাসিম নামে একজন আছেন পিজি হাসপাতালে। তাঁর সঙ্গে কানেকশন মুক্তিযোদ্ধা গেরিলাদের। তিনি প্রায়ই অস্ত্র নিয়ে এসে দাদা-দাদির খাটের নিচে রেখে দিতেন ওদের কাপড়ের ঝুড়িতে।
দাদা-দাদির কেবিনটা অস্ত্র রাখার একটা ভালো আস্তানা হয়ে যায়।
কামাল ভাই এখন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। আর্মির ট্রেনিং নিয়ে অফিসার হয়ে গেছেন। সে খবরও তারা পান। জামাল ভাই ট্রেনিং নিয়ে ৯ নম্বর সেক্টরে গেছেন। যশোর, সাতক্ষীরার দিকে। মুজিবনগর থেকে লোকজন এসে খবর দিয়ে যায় চুপি চুপি। আবদুল বাজার করতে গেলে তার পিছু নেয় গেরিলারা। ফট করে একটা চিঠি দিয়ে কেটে পড়ে। একদিন তো রেহানা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। অমনি একটা ঢিল এসে পড়ল তাঁর পায়ের কাছে। তাকিয়ে দেখলেন, সাইকেল নিয়ে জামাল ভাইয়ের এক বন্ধু চলে গেলেন। ঢিলটা হাতে তুলে দেখলেন, চিঠি। জামাল ভাই খবর পাঠিয়েছেন। তিনি এখন রণাঙ্গনে। মাকে বলেছেন, দোয়া করো।
