যখন বৃষ্টি পড়ছিল, বাড়িটার আঙিনায় জমা পানিতে বেশ একটা মজার দৃশ্য রচিত হচ্ছিল। জমা পানি সুচের মতো আকার নিয়ে বৃষ্টির ফোঁটার দিকে উঠে আসছিল। অনেকটা সুন্দরবনের মাটি থেকে উঠে আসা শ্বাসমূলের মতো। এখন বৃষ্টি নেই। এখন জমা পানিতে ওই রকমের কোনো সুচ তৈরি হচ্ছে না।
দরজায় নক হলো। তাজউদ্দীন বললেন, আসেন।
ভেতরে এলেন যিনি, তাঁর গায়ে একটা রেইনকোট। হাতে একটা ছাতা। তিনি ছাতাটা বন্ধ করলেন। রেইনকোটের আবরণ দিয়ে তার মাথা ঢাকা।
তাজউদ্দীন বললেন, সিরাজুল আলম খান সাহেব, আপনি মাথার ঢাকনাটা খুলুন। ঘরে বেশ গরম। আপনি পুরা রেইনকোটটাই খুলে রাখুন। আমি আপনাকে গামছা এনে দিচ্ছি। আপনি মাথা মুছে নিতে পারবেন।
সিরাজুল আলম খান দাড়ি হেঁটেছেন। তবু অযত্নে বেড়ে ওঠা ঘাসের মতো নাতিদীর্ঘ দাড়ি আছে গালজুড়ে। গোঁফের রেখায় শুধু যত্নের ছাপ।
সিরাজুল আলম খানের ওজনটা একটু বেড়ে গেছে মনে হলো।
সিরাজ দেখলেন, তাজউদ্দীন ভাই শুকিয়ে গেছেন। তার চোখ গর্তে বসে গেছে। তবু চোখ দুটো ভাসা-ভাসা। চোখের মধ্যে অসহায় হরিণের মায়া।
সিরাজ বললেন, আমাদের ট্রেনিং ক্যাম্পগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পগুলোতে আমাদের ট্রেনারদের একপ্রকারের বন্দী করে রাখা হয়েছে। তাদের বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। এটা আপনি এবং আপনার সরকার করেছেন।
তাজউদ্দীন বললেন, আপনাদের বাহিনী আমি তৈরি করি নাই। ট্রেনিং সেন্টার আমি বসাই নাই। আমি বন্ধ করবার কে? যারা বানিয়েছে, বন্ধ যদি হয়ে থাকে, তারাই কেবল তা করতে পারে।
সিরাজ বললেন, আমাদের বলা হয়েছে আমাদের বাহিনীকে হয় নিরস্ত্র করতে হবে, না হয় নিরস্ত করতে হবে।
তাজউদ্দীন বললেন, কথাটা কী হলো।
সিরাজ বললেন, হয় ডিজআর্ম করতে হবে, না হলে ডিঅ্যাক্টিভেট করতে হবে। এই রকমই নির্দেশ।
তাজউদ্দীন বললেন, সিরাজ সাহেব, আপনি খুবই ইন্টেলিজেন্ট মানুষ। লার্নেড় মানুষ। একটা যুদ্ধে দুইটা আর্মি আলাদা কমান্ডে চলবে, এটা হয় না। আমার কাছে রিপোর্ট আছে, মোট কত জায়গায় মুক্তিবাহিনী আর বিএলএফ নিজেরা যুদ্ধ করেছে। আপনারা ওসমানী সাহেবের কমান্ডো বাহিনীকে মার্জ করান। অথবা মুভ করান।
সিরাজ বললেন, তাজউদ্দীন ভাই, আমার সঙ্গে মণির মতপার্থক্য আছে, সেটা জানেন। পার্থক্যটা আদর্শের। আমি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি। মণি করে না। আপনিও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করেন। এই জায়গায় আমরা এক হতে পারি।
তাজউদ্দীন বললেন, এখন জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম। এটা হয়ে গেলে পরের ফেজ হলো সমাজতন্ত্র। এখন আমাদের কমন এবং ভয়াবহ অত্যাচারী দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিততে হবে।
সিরাজ বললেন, আমাদের ফোর্স পলিটিক্যাল ফোর্স। প্রায় সাড়ে আট হাজার বিএলএফ দেশের মধ্যে আছে। তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে রাজাকার নিমূলের। দেশে এক লাখ রাজাকার আছে। ওদের নির্মূল করলে তা আপনাদেরকেই হেল্প করবে।
তাজউদ্দীন বললেন, হেল্প করবে যদি তারা মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র না ধরে। আপনি এটা এনশিয়ের করেন।
সিরাজ বললেন, আমি সেই মেসেজ পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি ওসমানী সাহেবের বাহিনীকে নির্দেশ দেন মুজিববাহিনীকে যেন ঢুকতে বাধা না দেয়।
তাজউদ্দীন একটু ভাবলেন। আপনারা এক কাজ করুন। আপনাদের কমান্ডারদের নির্দেশ দেন, নিজ নিজ সেক্টর কমান্ডার, সাব-কমান্ডার, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে রিপোর্ট করে ভেতরে ঢুকতে। একটা কোড ঠিক করে নিলেই তো সেমসাইড হবে না।
তাঁরা ব্যাপারটা নিয়ে আরও খানিকক্ষণ আলোচনা করলেন। সিরাজ বললেন, আপনি মণিকে বলবেন না যে আমি এসেছিলাম। আমরা এখন মুক্তিযুদ্ধের কাজ করব। দেশ শত্রুমুক্ত হলে আমরা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য কাজ করব। মুজিব ভাইকে বোঝাতে হবে।
তাজউদ্দীন বললেন, আওয়ামী লীগের কর্মসূচির মধ্যে তো সমাজতন্ত্রের অঙ্গীকার স্পষ্ট ভাষায় বলা আছে। মুজিব ভাই জেনে-শুনে-বুঝে করেছেন। চীন সফর করেছেন দুবার। তিনি ওদের অর্থনৈতিক কর্মসূচির প্রশংসা করেন। তবে আমাদের সমাজতন্ত্র হবে আমাদের মতো।
সিরাজ বললেন, আমাদের মতো সমাজতন্ত্র হয় না। সমাজতন্ত্র একটাই। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। মুজিব ভাই আসুক। তবে এটাকে মুজিববাদ হিসেবে দাঁড় করাতে হবে।
সিরাজ আবার রেইনকোট পরে নিলেন। সিঁড়িতে নামার আগেই বিশাল আকারের ছাতাটা দিয়ে মাথা ঢাকলেন।
৭৪
রেনু জয়ের কথা ধুচ্ছেন। কাপড় চিপে, নিংড়ে তিনি হাঁক পাড়লেন, রেহানা, কাথাগুলান বারান্দায় রোদে মেলে দে।
রেহানা কথা মেলে দিতে লাগলেন বারান্দার তারে। বারান্দায় রোদ পড়েছে ঝাঁঝরির মতো। তিনি আকাশের দিকে তাকালেন। কৃষ্ণচূড়ার পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখা যায়। তার জামাল ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। জামাল ভাই এখন কই? তিনি কি যুদ্ধ করছেন? কামাল ভাইই-বা কই? স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ওই ঘোষণাটা যখন হয়, তখনই কামাল ভাইয়ের গলা শোনা যায়-ওরা মানুষ হত্যা করছে, আসুন আমরা পশু হত্যা করি।
মাঝেমধ্যে রণাঙ্গন থেকে মুক্তিযোদ্ধারা আসেন। জামাল ভাইয়ের দুই বন্ধু জানু ভাই, পান্নু ভাই জামাল ভাইয়ের হাতে লেখা চিঠি নিয়ে এসেছিলেন। এ বাড়ির আবদুল বাজার করতে যেত। খোকা চাচা থাকতে তিনি বাইরে যেতেন। দুলাভাই থাকতে তিনি যেতেন। এদের হাত দিয়ে চিঠি আসত। এখন আবদুলও গেছে নিজের গ্রামের বাড়ি। রমা ছাড়া গৃহপরিচারক আর কেউ নেই এ বাড়িতে।
