সহজবোধ্য কারণে। তোমার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক তোমার মেয়েমানুষগুলোর সঙ্গে তোমার সম্পর্কের চেয়েও মধুর। তুমি পিকিং যাও। চৌ এন লাইয়ের সঙ্গে দেখা করো। মাও সে তুংয়ের সঙ্গে দেখা করো। যদিও চীন আমাদের অনেকবার বলেছে, ইন্ডিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বাধলে তারা চুপ করে থাকবে না, কিন্তু কী করবে, এটা জানা দরকার। চুপ করে থাকব না, গান। গাইব, চুপ করে থাকব না, কান্নাকাটি করব–এসবের কোনো মানে হয় না। তারা কি মিলিটারিলি কিছু করবে? ইন্ডিয়া অ্যাটাক করবে? যাও। তুমি তোমার যে প্রতিভা দিয়ে নারী পটিয়ে থাকো, সেটার চরম ব্যবহার করে এসো। যাও। চীনের কাছ থেকে কথা নিয়ে এসো।
ভুট্টো আরও এক গেলাস ঢকঢক করে খেলেন। ততক্ষণে তার কথাও জড়িয়ে যেতে শুরু করেছে। হুসনাকে তিনি বিয়ে করবেন। নুসরাত কী করবে? ইয়াহিয়া খান আর কত দিন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে বহু আসন খালি বলে ডিক্লেয়ার করেছেন, উপনির্বাচন দেবেন, এর ফলে, ভুট্টোই হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির লিডার, অতএব তিনিই হতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, অতএব নুসরাত হবে অফিশিয়াল ফার্স্ট লেডি। সে কেন আমাকে হুসনাকে বিয়ে করতে দেবে না? কেন? আমি হুসনাকে ভালোবাসি। আমি তাকে বিয়ে করব।
আগাজি, আমি যাচ্ছি পিকিং। সঙ্গে আর কে কে যাবে?
কাকে কাকে চাও। ফরেন সেক্রেটারি সুলতান খান, বিমানবাহিনী প্রধান মার্শাল রহিম খান, চিফ অব জেনারেল স্টাফ গুল হাসান খান।
.
নভেম্বরের ৫ তারিখ বিকেলে প্লেন গিয়ে নামল পিকিংয়ে, বিমানবন্দরে স্বয়ং চৌ এন লাই, চীনের প্রধানমন্ত্রী। জুলফি নিজের জুলফিতে হাত দিলেন। তিনি হলেন এই পৃথিবীর সবচেয়ে স্মার্ট পুরুষ। চৌকে আসতেই হবে।
আরও ২৪ ঘণ্টা পরে, ৬ নভেম্বর বিকেলে, চৌ এন লাইয়ের সঙ্গে কথা শুরু হলো।
ভুট্টো বললেন, চীন আমাদের সবচেয়ে ভালো বন্ধু।
চৌ নির্বিকার মুখে বললেন, সবচেয়ে কাছের বন্ধু এবং প্রতিবেশী। আমাদের বন্ধুত্ব সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।
ভুট্টো বললেন, ভারত তোমাদের পুরোনো শত্রু। আমাদেরও। আমরা দুই দেশই ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি এবং যুদ্ধ করব।
চৌ চুপ করে থাকলেন।
ভুট্টো বললেন, ভারত সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করেছে। যুদ্ধ কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। আমরা ভারতকে ছিন্নভিন্ন করে দেব।
চৌ বললেন, এভাবে না ভেবে বলি, যুদ্ধ এড়ানো ভালো। আমেরিকা ও রাশিয়া ভারতকে যুদ্ধ করতে দেবে না। মীমাংসাই শ্রেষ্ঠ পথ। তোমরা পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে ফয়সালা করে ফেলো।
তা আমরা করছি। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদ থেকে টিক্কা খানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের লোক আর অন্যান্য দলের লোক নিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে শান্তি আসছে।
তাহলে ভালো। যুদ্ধ হচ্ছে না।
যুদ্ধ হচ্ছে। ভারত ছাড়বে না। আমরাই-বা ছাড়ব কেন। যখন মহান চীন আমাদের পাশে আছে।
দেখো বন্ধু, যুদ্ধ যদি হয়ই, তোমাদের কাজ হবে ছোট আকারে যুদ্ধ করা। যুদ্ধটাকে দীর্ঘস্থায়ী করা। কিছু জায়গা যদি ভারত দখলও করে ফেলে, ফেলুক। তোমাদের কাজ হবে সারা পৃথিবীকে দেখানো যে ভারত সম্প্রসারণবাদী। তারা দখলদার। তখন পৃথিবী তোমাদের জন্য এগিয়ে আসবে।
পৃথিবী দিয়ে আমাদের কাজ নেই। আমরা তোমাদের চাই। তোমরা কী করবে?
আমরা তোমাদের সমর্থন দেব। আমরা জাতিসংঘে এক চায়না হয়ে বসছি। এখন আমাদের ভয়েস আরও স্ট্রং হবে।
জাতিসংঘ বাদ দাও। তোমরা আমাদের যুদ্ধে সাহায্য করবে কী করে?
আমরা তোমাদের অস্ত্র দিচ্ছি। অস্ত্র দিয়ে যাব। টাকাপয়সা দেব। আমরা ভারতকে সাহায্য করব না। তবে আমাদের পরামর্শ হলো, যুদ্ধ কোরো না। মীমাংসা করো। রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সমাধান করো।
ভারত আমাদের সীমান্তের ভেতরে রোজ গোলা ছুড়ছে। পূর্ব পাকিস্তানের অনেক জায়গা দখল করে নিয়েছে। এরপরও বলছ যুদ্ধ করব না।
হ্যাঁ। যুদ্ধ কোরো না। করলে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ করো। ওদের ঠেকিয়ে রাখো।
ভুট্টোর মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল বরফের সাপ নেমে যাচ্ছে। চৌ একবারও বলছে না যে তারা যুদ্ধে জড়াবে। সৈন্য সমাবেশ করবে। ভারতের সীমান্তে কিছুটা হলেও গোলাগুলি করবে।
ভুট্টো এবং তার দল খালি হাতে ফিরবেন?
চৌ তাঁদের বউদের জন্য অনেকগুলো ড্রেস তুলে দিলেন তাঁদের হাতে। বললেন, এগুলো তোমাদের সুন্দর বউদের জন্য।
ভুট্টো ভাবলেন, আমার তো আড়াইটা বউ। শেষ অর্ধেকটাই আসল। আমি এই ড্রেস ভাগাভাগি করব কী করে?
চৌ খুব দামি মদের বোতল দিলেন তাদের। বললেন, এটা ১০০ বছরের পুরোনো মদ। কাইন্ডলি আমাদের গুড ফ্রেন্ড আগা ইয়াহিয়াকে পৌঁছে দেবেন।
ভুট্টো ফিরে এলেন।
চীনারা যা বলে, তা করার চেষ্টা করে। তারা পাকিস্তানকে উড়োজাহাজ পাঠানোর নির্ধারিত চালান আটকে দিল। বার্তা পরিষ্কার : যুদ্ধ কোরো না।
৭৩
তাজউদ্দীন আহমদ তার অফিসকক্ষে বসে আছেন। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। তিনি জানালা দিয়ে একবার বৃষ্টি দেখছেন, আরেকবার পথের দিকে তাকাচ্ছেন। বাঁ কবজিটা তুলে সময়ও দেখলেন। তিনি কারও জন্য অপেক্ষা করছেন। অধীর শব্দটা তাজউদ্দীনের জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি সব সময়েই সুধীর। কাজেই। তার অপেক্ষাটাও সুধীর অপেক্ষা। বৃষ্টি থেমে গেল।
