জি পড়েছি।
তারপরেও আপনি মনে করেন তাঁর সঙ্গে দেখা করলে উদ্দেশ্য সফল হবে?
আপনি দেখা করলে বুঝতেন যে কেন আপনার সৈন্য ওখানে সমবেত হয়েছে।
আমি খুব বুঝি কেন সমবেত হয়েছে। কারণ, আমার দেশ বিপন্ন। আমার জনগণ হুমকির মুখে। আপনি জানেন না যে আমি কতটা ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছি। আমার দেশের মানুষ কিন্তু এতটা ধৈর্য ধরতে চাইছে না। আপনি আমার সঙ্গে বসতে বলছেন এমন একটা সরকারকে যারা লাখ লাখ মানুষ মেরে ফেলেছে। হিটলার ইহুদিদের সঙ্গে যা করেছে, তা ছাড়া পৃথিবীর ইতিহাসে এ রকম ঘটনা আর কখনো ঘটেনি।
পূর্ব বাংলার ভাগ্যে কী হবে?
এটা পূর্ব বাংলার নেতারা ঠিক করবেন।
এত শরণার্থী আসছে। কতখানি সহ্য করবেন?
আমরা সহ্য করতে আর পারছি না।
কী করবেন?
আমি একটা কথা বলি, সব ধর্মের সব শরণার্থীকে ফিরে যেতে হবে।
ইন্দিরা কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৪০০ জন শ্রোতার সামনে কথা বলেন। তিনি বলেন, ৯০ লাখ শরণার্থীর ভার আমরা আর সইতে পারছি না। আমরা আপনাদের সমর্থন চাই, সহানুভূতি চাই, সাহায্য চাই। তবে ইন্ডিয়া প্রস্তুত এবং ইন্ডিয়া সক্ষম একাকী এই লড়াই করতে, যে লড়াই করা উচিত বলে সে মনে করে।
ভীষণ জেদ নিয়ে ইন্দিরা গান্ধী উঠলেন বিমানে। আমেরিকা তাঁকে এত অপমান করতে পারল? তবে ছেলের বউদের জন্য কুড়ি মিনিটে ৬টা ড্রেস নিজে ট্রায়াল দিয়ে কিনতে তিনি ভুললেন না।
ঠিক আছে। আমিও এর শোধ নেব। আমিও আমার বাবারই মেয়ে।
তিনি ফ্রান্সে গেলেন। ফ্রান্স ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে চায় না। তারা কথা বলল মেপে। ব্রিটেন বলল, জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক পাঠানো। যায়।
ইন্দিরা বললেন, জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক কী করবে?
মুজিবকে নিয়ে বসলে কী হয়?
মুজিবও স্বাধীনতার চেয়ে কম কিছুতে রাজি হতে পারবেন না।
সৈন্য প্রত্যাহার করুন।
বেশি দূরে নিতে পারব না।
.
হাকসার আর কাউলের সঙ্গে বসলেন অন্য ব্রিটিশ কর্তারা।
সরাসরি মুজিবের সঙ্গে ইয়াহিয়া বসতে পারেন না? ব্রিটিশ কর্তারা বললেন।
পারেন হয়তো। তবে স্বাধীনতার চেয়ে কম কিছুর জন্য না।
তবে ইয়াহিয়া লোকটা তো মাতাল। স্টুপিড। সে তো কোনো আলাপেই রাজি না। বললেন ব্রিটিশরা।
জার্মানদের সঙ্গে কথা একই হলো। ইন্দিরা বললেন, পাকিস্তান শেখ মুজিবের সঙ্গে বসুক। সমস্যার সমাধান করুক। আমরা গেরিলাদের সমর্থন করি। যতটুকু না করলেই নয়। ভারত জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক চায় না।
.
জার্মানরা বুঝল, যুদ্ধ আসন্ন।
৭২
ইন্দিরা গান্ধী আমেরিকায়। কূটনৈতিক সূত্রে খবর, নিক্সন, কিসিঞ্জার তাঁকে পাত্তা দেবেন না। তার মানে, তিনি আরও বেশি করে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকবেন। ইয়াহিয়া সেপ্টেম্বরে ইসলামাবাদে আসা ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত জয় কুমার অটলের মাধ্যমে একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন ইন্দিরার কাছে। ছয় দফার ভিত্তিতে ফয়সালার জন্য আলোচনা শুরু করতে ইয়াহিয়া রাজি আছেন, এই ছিল চিঠির প্রতিপাদ্য। ইন্দিরা চিঠির জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। এই মহিলার উদ্দেশ্য পরিষ্কার। সে যুদ্ধ করতে চায়। আমরাও যুদ্ধ করব। আমাদেরটা জিহাদ। গেলাসে নিজ হাতে হুইস্কি ঢেলে নিয়ে আরেক গ্লাস ভুট্টোর দিকে ঠেলে দিয়ে প্রেসিডেন্ট হাউসে ইয়াহিয়া। খান বললেন, জুলফি, যুদ্ধ হলে আমরা জয়লাভ করব কি না!
ভুট্টো তখনো গ্লাস হাতে ধরেননি। তিনি বললেন, ডিপেন্ড করে দুটো ফ্যাক্টরের ওপরে।
কোন দুটো ফ্যাক্টর?
এক. চীন আমাদের পাশে দাঁড়াবে কি না। ভারতকে আক্রমণ করে বসবে। কি না। দুই. সে ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের কাফেরগুলোকে ঠেকাতে মহান। আমেরিকা আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে কি না-ভুট্টো এবার গ্লাস হাতে নিলেন। এক টুকরা বরফ তার সোনালি পানীয়তে ভাসছে।
নো নো। আমরা জানি আমাদের কে হেল্প করবেন। এটা জিহাদ। আমাদের একজন সৈন্য হিন্দুস্তানের এক শ সৈন্যের সমান।
কিন্তু যে সৈন্যদের প্রধান একজন মাতাল, তাদের পাশে কি আল্লাহ আসবেন?
জুলফি। আমি তো মাতাল নই। আমি কখনো মাতাল হই না। ইয়েস, বেহেশতে গেলে আমি তো ড্রিংক করবই। এখন সামান্য করি। যতটুকুন। ডাক্তার আমাকে অ্যালাউ করেন। আর মাতাল না হলে তার সৈন্যদের অবশ্যই খোদা সাহায্য করবেন। আমি মুসলমান। মুসলমানরা যুদ্ধে কখনো কাফেরদের সঙ্গে হারতে পারে না–ইয়াহিয়া আরেক পেগ হুইস্কি গ্লাসে ঢাললেন।
.
ভুট্টোরও তিন পেগ খাওয়া হয়ে গেছে। হুইস্কি পেটে পড়লেই হুসনা চলে আসে। ভুট্টোর মাথায় তখন হুসনা শেখ, বাঙালি উকিলের তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী, পাঠান-বাঙালি রক্তের এক অপ্রতিরোধ্য-আকর্ষক নারী, দুই সন্তানের জননী, যে চলে এসেছে পশ্চিম পাকিস্তানে, করাচিতে দুটো বাড়ির মালিক, যাকে কারাবাসের দিনগুলোতে ভুলে যেতে চেয়েছিলেন ভুট্টো, সেই ১১ বছর ধরে যার সঙ্গে তার অকথ্য অসহ্য প্রেম, নুসরাত ভুট্টো যার নাম শুনলেই কাঁদতে থাকে। ভুট্টোর প্রথম কাজিন-বউ থাকে লারকানার তাদের বিশাল বাগানবাড়িটিতে। ভুট্টো হুসনা শেখকে কথা দিয়েছেন, তিনি তাকে বিয়ে করবেন ১৯৭১ সালের মধ্যেই।
ভুট্টো বাতাসে হাত নেড়ে হুসনাকে তাড়ানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, আগাজি, আমাকে ডেকেছেন কেন?
