৪ নভেম্বর ওয়াশিংটন ডিসির ওভাল অফিসে ইন্দিরা গান্ধী, হাকসার, নিক্সন, কিসিঞ্জার বসলেন।
নিক্সন বললেন, আপনারা সৈন্য প্রত্যাহার করুন। পাকিস্তান সৈন্য প্রত্যাহার করবে। ইয়াহিয়া খান রাজি আছে প্রাদেশিক সরকারের কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে। আমি অবশ্য বলতে পারি না যে ইয়াহিয়া শেখ মুজিবের সঙ্গে কথা বলবে কি না। এটা তাদের ব্যাপার। আর আমি ইয়াহিয়াকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো কিছু করতে বলতে পারি না। সামরিক পদক্ষেপ খুবই বিপজ্জনক হবে।
ইন্দিরা বললেন, পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান এক থাকবে, এটার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা আর নেই। আর সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, শেখ মুজিবের ভবিষ্যৎ।
নিক্সন আর কিসিঞ্জার পরের দিন এই নিয়ে আলোচনা করেছেন। কথাবার্তা এমন ছিল, নিক্সন বললেন, আগেই বলিনি, ইন্দিরা একটা কুত্তি। আমরা বুড়ি কুত্তির মুখে থুতু ছিটিয়ে দিয়েছি।
ইন্ডিয়ানরা বাস্টার্ড। ও একটা কুত্তি। ওরা একটা যুদ্ধ শুরু করতে যাচ্ছে। সে তো এসেছে যুদ্ধ শুরু করার অজুহাত খুঁজতে। আমি আমেরিকা গিয়েছিলাম, আমেরিকা আমাকে ভালোমতো বরণ করেনি। রাগে-দুঃখে আমি যুদ্ধ শুরু করলাম।–এটা আর সে বলতে পারবে না।
নিক্সন ইন্দিরা গান্ধীকে বলেছেন, তারা পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করেন। না, ইয়াহিয়াকে বলেছেন পূর্ব পাকিস্তানি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে, তারা শরণার্থীদের মানবিক সাহায্য দিতে থাকবে। কিন্তু ভারত যদি পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ বাধায় তার পরিণতি খুব খারাপ হবে। সুপারপাওয়ারগুলো নাক গলাবে।
নিক্সন জানান, আমরা কিন্তু চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করছি।
ইন্দিরা গান্ধীও জানিয়ে দেন, আমরা রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছি।
কিসিঞ্জার ভারতের প্রধান সচিব হাকসারকে, যাকে তিনি আড়ালে ডাকেন একজন ক্লাউন বলে, বললেন, গত তিন মাসে তোমরা কী করেছ? সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছ আমরা তোমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু, ক্রমাগতভাবে আমাদের গালিগালাজ করেছ, রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছ আর কেনেডিকে নিয়ে গেছ ভারতে। এখন এসে আমাদের বলছ সব সমস্যার সমাধান করব আমরা। যাও।
বিকেলে তারা আবার বসলেন। নিক্সন বলে রেখেছিলেন, এবার আমি কুল থাকব।
কিন্তু কুল থাকলেন ইন্দিরা। তিনি দক্ষিণ এশিয়া নিয়ে একটা কথাও বললেন না। আমেরিকার বিদেশ নীতি নিয়ে নানান কথা বলতে লাগলেন।
এক মাস পরেও নিক্সন সে কথা ভুলতে পারেন না। মহিলা এমন শীতল। সে তো আমাকে জব্দ করে মারল। আমি তার সামনে সহজ হতেই পারলাম না।
.
ইন্দিরা গেলেন নিউইয়র্কে। সেখানে একটা সাক্ষাৎকার রেকর্ড করা হলো।
পোড়া কমলা রঙের ব্লাউজ, সাদা কমলাটে প্রিন্টের শিফন ধরনের শাড়ি, কান পর্যন্ত চুল, কিছুটা বলা যায় ববকাট চুল, ঈষৎ সাদা, বাকিটা কাঁচা, ৫৩ বছরের ইন্দিরা কথা বলছিলেন মাটির দিকে চোখ রেখে। মনে হচ্ছিল। টেলিভিশনের ক্যামেরা এবং উজ্জ্বল আলোর দিকে তিনি তাকাতে পারছিলেন না।
মিসেস গান্ধী, পাকিস্তান পরিস্থিতি কী রকম? প্রথম প্রশ্ন।
খুবই সিরিয়াস। বলে তিনি থামলেন। তারপর বললেন, দুটো সেনাবাহিনী মুখোমুখি। তারা প্রায়ই একে অপরের দিকে গোলা ছুড়ছে। আমি আসার আগে তা-ই দেখে এসেছি।
এটা কতটা সম্ভব যে পাকিস্তান ভারতকে আক্রমণ করে বসবে?
যখন একটা দেশে অরাজকতা হয়, তখন এই রকম আক্রমণ হতে পারে, যাতে করে বাইরের আক্রমণ একটা দেশকে ঐক্যবদ্ধ করে।
আপনার অবস্থা কী? এমন কি হতে পারে আপনি পাকিস্তান আক্রমণ করে বসবেন?
আমি আশা করি, না। তিনি হাসলেন। আবার বললেন, ভারতের অবস্থান হলো শান্তির পক্ষে, মীমাংসার পক্ষে। কিন্তু আমরা আমাদের নিরাপত্তাকে বিপন্ন করতে পারি না।
আপনি কি মনে করেন যে ভারত-পাকিস্তান একটা যুদ্ধ আসন্ন?
এই প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। কারণ, আমি বলেছি, আমরা যেভাবে করা সম্ভব যুদ্ধ এড়ানোর জন্য করছি।
পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট প্রস্তাব করছেন আপনি আপনার কিছু সৈন্য সীমান্ত থেকে প্রত্যাহার করে নিন।
পাকিস্তান আমাদের আগে সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করেছে। আমাদের বিপন্ন করেছে। তখন কেউ কিছুই বলেনি। তারপর আমরা সৈন্য নিয়ে গেছি। এখন সারা পৃথিবীর ঘুম হারাম হয়ে গেছে। সৈন্য প্রত্যাহারের ব্যাপারে বলি, আমার কিন্তু কোনো দ্বিতীয় চিন্তা নেই। আমরা আর কিছু করব বলে ভেবে রাখিনি। ওরা সৈন্য সমাবেশ করবে, আর আমি সৈন্য প্রত্যাহার করব, আমার দেশের জন্য মানুষের জন্য আমার কর্তব্য তাতে পালিত হয় না। একটা কথা বলি। আমরা কখনো কখনো কখনো কাউকে আঘাত করি নাই। তিনবার আমরা আক্রান্ত হয়েছি।
কিন্তু আপনি কি বাংলাদেশ গেরিলাদের সমর্থন করেন?
এটা সমর্থন করা না-করার ব্যাপার নয়। কথা হলো, কী ঘটতে যাচ্ছে। আপনি আপনার প্রতিবেশী দেশে কী হচ্ছে না-হচ্ছে তার ব্যাপারে চোখ বন্ধ করে থাকতে পারেন না। আমি খোলাখুলিভাবে বলে আসছি, পাকিস্তান রাষ্ট্রটা এখন যেভাবে আছে সেই ভাবে থাকতে পারে না।
আপনি কি মনে করেন না আপনি যদি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করতেন, একে অপরকে বুঝতেন তাহলে আপনার বিপদ কম হতো?
আপনি কি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কোনো ভাষণ কিংবা সাক্ষাৎকার পড়ে দেখেছেন?
