তাঁকে সে জিজ্ঞেস করেছিল, মাতৃভূমি কী। তিনি বলেছিলেন, দেশই হলো মা।
সে কি মায়ের কাছে ফিরতে চেয়েছিল? সে কি চেয়েছিল তার শেষ আশ্রয় হোক মায়ের কোলে? কবরটা হোক দেশের মাটিতে?
তার শহীদ হওয়ার ৩৬ বছর পরে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কবর উত্তোলন করে ত্রিপুরা থেকে ঢাকার মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে নেওয়া হয়।
হামিদুর তার মায়ের কাছে ফিরে আসতে পেরেছে।
৭১
সারা পৃথিবীর বিবেকবান মানুষ পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত গণহত্যার তীব্র নিন্দা করছিলেন। বিশ্ববিবেক নড়ে উঠেছিল। শুধু আমেরিকার নিক্সন ও কিসিঞ্জার ছাড়া পুরো আমেরিকার প্রতিটা সচেতন মানুষই ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। বিশ্বখ্যাত সেতারবাদক পণ্ডিত রবিশঙ্কর ডেকে বললেন আমেরিকার বিখ্যাত পপগায়ক জর্জ হ্যারিসনকে, বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে, কিছু একটা করা দরকার। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ারে অনুষ্ঠিত হলো পৃথিবীর প্রথম চ্যারিটি কনসার্ট। ১ আগস্টের সেই দুপুরে আর রাতে ৪০ হাজার মানুষ উপস্থিত ছিল। বব ডিলান, রিঙ্গো স্টার, এরিক ক্লাপটন, বিলি প্রেস্টন, লিয়ন রাসেলের মতো মহাতারকারা গাইলেন। ব্যাডফিঙ্গারের মতো ব্যান্ড মঞ্চে উঠল। আকবর আলী খান আর রবিশঙ্কর তাঁদের পূর্বপুরুষের ভিটামাটির জন্য জয় বাংলা ধুন বাজালেন। আমেরিকার সাধারণ মানুষ ছোট ছোট নৌকা নিয়ে বাল্টিমোরের বন্দরে পদ্ম নামের জাহাজ ঘিরে ধরেছিল, যাতে পাকিস্তানকে আমেরিকা অস্ত্র পাঠাতে না পারে। আঁদ্রে মার্লে, ৭০ বছর বয়সী ফরাসি দার্শনিক, সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী, লেখক, যিনি স্পেনের গৃহযুদ্ধে লড়াই করেছিলেন, ঘোষণা করেন, তিনি বাংলাদেশে যাবেন, বাংলাদেশের মানুষের হয়ে পাকিস্তানি নিপীড়কদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবেন। ১৯৭১ সালে পৃথিবীর দেশে দেশে যে প্রবাসী বাঙালিরা ছিলেন, তাঁরা একযোগে তৎপরতা শুরু করেন। রাজপথে মিছিল করে, গান গেয়ে, অবস্থান। ধর্মঘট করে, লবি করে তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলেন। বিভিন্ন দেশে পাকিস্তানে দূতাবাসের বাঙালি কূটনীতিকদের অনেকেই পক্ষ ত্যাগ করেন। এমনকি খোদ পাকিস্তানে বহু সাহিত্যিক বাংলাদেশের পক্ষে কলম ধরে। অ্যান্থনি মাসকারেনহাস নামের এক পাকিস্তানি সাংবাদিককে পাকিস্তানি জান্তা পূর্ব পাকিস্তান সফরকারী সাংবাদিক দলে অন্তর্ভুক্ত করে সবকিছু স্বাভাবিক আছে এই কথা লেখার জন্য, তিনি ফিরে গিয়ে প্রথমে তাঁর পরিবার-পরিজনকে বিলেতে পাঠান, তারপর নিজে বিলেত গিয়ে ১৩ জুন সানডে টাইমস-এ প্রকাশ করেন এক ভয়াবহ প্রতিবেদন, যার শিরোনামই ছিল জেনোসাইড। যেমন লিখেছিলেন সায়মন ড্রিং, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে সেনাবাহিনীর নজর এড়িয়ে পালিয়ে গিয়ে, ডেইলি টেলিগ্রাফ-এ ৩০ মার্চ ১৯৭১, আল্লাহ ও পাকিস্তানের নামে শুরু করা লড়াইয়ে ঢাকা এখন ধ্বংস ও ভীতির নগরী। ক্রমাগত লিখে গেছেন নিউইয়র্ক টাইমস-এ সিডনি শনবার্গ। আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশের পক্ষে সক্রিয় হয়েছিলেন হোর্হে লুইস বোর্হেস আর ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর মতো সাহিত্যিকেরা। অ্যালেন গিন্সবার্গ কবিতা লিখেছিলেন : সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড। জোয়ান বায়েজ গান বেঁধেছিলেন : বাংলাদেশ। বাংলাদেশে এমন কোনো পরিবার নেই, যারা দেশের ভেতরে বা বাইরে পালায়নি, আবাস বদল করেনি। এমন থানা নেই, যেখানে হাজারো মানুষ মারা যায়নি। প্রায় এক কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। কলেরায়, অনাহারে, অপুষ্টিতে, পথের ক্লান্তিতে তাদের কতজন যে মারা গেছে। দুই লাখ থেকে চার লাখ নারী ধর্ষিতা হয়েছেন। পৃথিবীর বিবেকবান সচেতন মানুষ প্রতিবাদ করেছে, নিন্দা করেছে, কিন্তু যাদের হাতে ছিল মানুষকে বাঁচানোর ভার, সেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সন আর তাঁর উপদেষ্টা কিসিঞ্জার একটিবারের জন্যও ইয়াহিয়া আমাদের বন্ধু এই নীতি থেকে সরেননি। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাজনৈতিক সমাধানের জন্যই চাপ সৃষ্টি করছিল।
ইন্দিরা গান্ধী দেখলেন তিনি একা। ৫৩ বছরের ভারতীয় নারী প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা একা। তবে তাঁর সঙ্গে আছে দেশের মানুষ। বিরোধী দলের ভীষণ চাপ, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দাও। তিনি বেরিয়ে পড়লেন বিশ্বজনমতকে নিজের দিকে নেওয়ার জন্য।
প্রথমে ব্রাসেলস, তারপর ভিয়েনা। তারপর গেলেন লন্ডন। তিনি শুধু সরকারপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করলেন তা নয়, সিভিল সোসাইটির সঙ্গে বসলেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললেন।
বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয় : ভারত কি গেরিলাদের অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়ে শরণার্থীর স্রোত তৈরি করছে না। সেটা বন্ধ করে কি পরিস্থিতি শান্ত করা যায় না?
ইন্দিরা গান্ধী দৃঢ়কণ্ঠে বললেন : তার মানে কি আমরা ম্যাসাকার চলতে দেব? এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়েছে তখন, যখন একজনও গেরিলা সেখানে ছিল না। পরিস্থিতি শান্ত করা মানে কী? আমি কি একটা প্রশ্ন করতে পারি? যখন হিটলার তার হত্যাযজ্ঞ শুরু করল, তখন কেন আপনারা বলেননি যে এসো শান্ত হয়ে থাকি। শান্ত হয়ে থাকা মানে কী? এর মানে কি আপনি গণহত্যা চলতে দেবেন? আপনারা কেন বলেননি ইহুদিদের মরতে দাও, বেলজিয়ামকে মরতে দাও, ফ্রান্সকে মরতে দাও? এই ঘটনা ঘটতেই পারত না, শুরুতে যখন আমরা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম, তখন যদি ব্যবস্থা নেওয়া হতো।
