কুয়াশার চাদরে ঢেকে তারা ধীরে ধীরে পা রাখে পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তের ভেতরে। ধলই পোস্টটার চারদিকে গাছগাছালি কেটে ওরা পরিষ্কার করে রেখেছে। সেটা ১৬০০ বর্গগজের বেশি জায়গা নয়।
কিন্তু তার চারপাশে চা-বাগান, পাহাড়ের চড়াই-উতরাই, গাছগাছালি প্রচুর। আক্রমণ করার জন্য আদর্শ জায়গা। অসুবিধা হলো, ওদের পোস্টটা ওরা বানিয়েছে উঁচুতে। সেখান থেকে গুলি ছুড়লে নিচের আক্রমণকারীরা অসুবিধায় পড়বেই।
তিন দিক থেকে ঘেরাও করে ফেলা সম্পন্ন। লে. কাইয়ুম প্রথম ফায়ারটা করবেন। তারপর তিন দিক থেকে একযোগে প্রচণ্ড আক্রমণ করবে মুক্তিযোদ্ধারা। প্রথমেই প্রচণ্ড গোলাবর্ষণ করলে অনেক সময় কাজ হয়। শত্রুরা শক্তির প্রচণ্ডতা আঁচ করে সহজেই রণে ভঙ্গ দেয়।
কিন্তু কুয়াশা এত নিচু হয়ে আছে যে ঠিকভাবে ওদের পোস্টটা দেখা যাচ্ছে না। গাছের ওপরে আলো ফুটে আছে। কিন্তু মানুষসমান উচ্চতায় কুয়াশা। তারা সামনে কিছুই দেখছে না।
একটা উপায় আছে। একজনকে গাছে তুলে দেওয়া।
সে ওপর থেকে দেখুক, এক্সাক্টলি কোন জায়গায় পাকিস্তানি সৈন্যদের ঘাঁটিটা।
একজন মুক্তিবাহিনীর ছেলে উঠে পড়ে গাছে। স্যার, ঠিক এই বরাবর স্যার।
বলতেই না বলতেই শত্রুবাহিনী গুলি ছুঁড়তে শুরু করে। মুহূর্তেই গর্জে ওঠে লে. কাইয়ুমের রাইফেল। আর তিন দিক থেকে শত্রুবাহিনীর গুলির উৎস। অভিমুখে একযোগে পাল্টা গুলি চালাতে থাকে মুক্তিবাহিনী।
উভয় পক্ষ গুলি চালাচ্ছে। কিন্তু মুক্তিবাহিনী এগোতে পারছে না। ওদের এলএমজি পোস্টটা বড় জ্বালাচ্ছে। ঠিকমতো বসিয়েছে তারা এলএমজি। সেই। এলএমজির নাগালের মধ্যে কিছুতেই ঢোকা যাচ্ছে না।
না। আর তো সহ্য করা যায় না। আজ যে করেই হোক, ধলই তারা শত্রুমুক্ত করবেই।
একটাই করণীয়।
একজনকে সাহস দেখাতে হবে। ক্রল করে যেতে হবে পোস্টের একেবারে হাতের নাগালে। হ্যান্ড গ্রেনেড ছুঁড়ে মারতে হবে এলএমজি পোস্টের বাংকারে। তাহলেই নিষ্ক্রিয় হবে শত্রুর এলএমজি। তারপর ধলই দখল মুহূর্ত কয়েকের ব্যাপার।
লে. কাইয়ুম তখন একটা নালার ভেতরে। দুপাশে নলখাগড়া, ঢোলকলমি, কলমিলতা, ধঞ্চে, লজ্জাবতী, শটির ঝোঁপঝাড়। কাশেমের পায়ে সেঁক গেঁথে বসেছে। নলিনের কনুই ছড়ে গেছে কাঁটাগাছে। রক্ত ঝরছে। কিন্তু যুদ্ধের এই পরিস্থিতিতে এগুলো কোনো খেয়াল করার মতো ব্যাপারই নয়।
মাথার ওপর দিয়ে শাই করে শাঁই করে গুলি উড়ে যাচ্ছে।
পাখিরা আর্তনাদ করে উড়ে উড়ে পালিয়ে যাচ্ছে যেদিকে পারে।
লে. কাইয়ুম বললেন, একজন সাহসী জওয়ান আমার দরকার। কে যাবে? এলএমজি পোস্টে যাবে পেছন দিক দিয়ে। ক্রল করে, চা-পাতা, ঝোঁপঝাড়ের আড়ালে দ্রুত। দুটো গ্রেনেড দিচ্ছি সঙ্গে। বাংকারের ভেতরে গ্রেনেড ছুঁড়তে হবে। এলএমজিটা থামিয়ে দিতে পারলেই উই উইল ব্রেক ইন। আমরা সঙ্গে সঙ্গে তিন দিক থেকে একযোগে ঢুকে যাব। ওদের বাকি লোকেরা তখন পালানোর পথ পাবে না। ওদের এলএমজি পোস্ট হবে আমাদের এলএমজি পোস্ট। কে যাবে?
হামিদুর বলল, আমি যাব স্যার।
সময় নেই। দ্রুত দুটো গ্রেনেড তুলে দেওয়া হলো হামিদুরের হাতে।
হামিদুর ক্রল করছে গুইসাপের মতো। কিন্তু দ্রুত। চা-পাতা নড়ছে। বিষকাটালির ঝোঁপ দুলছে।
লে. কাইয়ুম বললেন, শত্রুর দৃষ্টি ঘোরাতে হবে। ডান দিকে সরে যাও। আক্রমণ বাড়াও।
ডান দিক থেকে হঠাৎ আক্রমণ। শত্রু বিভ্রান্ত।
বাইনোকুলার দিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন কাইয়ুম। কুয়াশাটা কি আজকে যাবেই না। না যাওয়াই ভালো। তাহলে কুয়াশার আড়ালে হামিদুর পৌঁছে যেতে পারবে শত্রুর পোস্টে।
.
দ্রিম দ্রিম। দুটো গ্রেনেড চার্জের শব্দ।
তারপর স্তব্ধতা। মানে এলএমজি পোেস্ট নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।
কুইক মার্চ।
এক দল মুক্তিবাহিনী ছুটে গেল এলএমজি পোস্টে। তখনো সেখানে ধোঁয়া উড়ছে। সেখান থেকে নিজেদের এলএমজি বসিয়ে এবার তারা গুলি ছুঁড়তে লাগল শত্রুসেনাদের ওপরে। শত্রুরা দ্রুত পশ্চাদপসরণ করছে।
ধলই শত্রুমুক্ত হলো। সেকেন্ড ইন কমান্ড দ্রুত পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে ফেলল। সেখানে উড়িয়ে দেওয়া হলো স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। মুক্তিসেনারা জয় বাংলা বলে স্যালুট করল স্বাধীন বাংলার পতাকাকে।
কিন্তু হামিদুর কই?
লে. কাইয়ুম চিৎকার করে উঠলেন, হামিদুর, হামিদুর।
পাহাড়ের ঢালে ঢালে সেই ডাক ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠতে লাগল।
স্যার। স্যার…মা গো!
ছুটে গেল সবাই। এলএমজি পোস্টের ১০ গজ নিচে পড়ে আছে হামিদুর। রক্তে তার কাঁধ ভেসে যাচ্ছে। পেটের দিকটায় রক্তের বন্যা।
হামিদুর বলল, স্যার, একটা কথা। আমি তো যাচ্ছি। আপনারা কথা দেন, দেশকে স্বাধীন করবেনই, আমার মা…
আর কথা বলতে পারল না সে। স্তব্ধ হয়ে গেল সবকিছু।
মুক্তিযোদ্ধারা তার বডি কাঁধে তুলল।
নিয়ে এল তাকে আম্বাসার হাতিমারাছড়ায়। ত্রিপুরা জেলায়।
সেখানেই কবরস্থ করা হচ্ছে তাকে। কাঁচা মাটি দেওয়া হচ্ছে তার বডির ওপরে। দেশের মুক্তির জন্য সে শহীদ হয়েছে। হে আল্লাহ, তাকে শহীদের মর্যাদা দাও। তার গোরটা বেহেশতের বাগানে পরিণত করো।
কাইয়ুম মোনাজাত ধরেন। সবাই তাঁর সঙ্গে বলে ওঠে আমিন।
.
বহুদিন লে. কাইয়ুমের মনে হয়েছিল, হামিদুর কী বলতে চেয়েছিল শেষ মুহূর্তটিতে?
