ভ্যাবাচেকা খেয়ে গিয়েছিলে। তাই আমাদের বিদ্রোহী দলে না এসে ঝিনাইদহ চলে গেলে।
হামিদুর লজ্জা পায়। গোধূলির আলোয় তার মুখখানা আরও লাজরাঙা হয়ে ওঠে। সে বলে, না স্যার। ভ্যাবাচেকা খাই নাই। মায়ের মুখটা মনে পড়ে গেল স্যার। ঝিনেদাতে স্যার মুজাহিদ বাহিনীতে জয়েন করেছিলাম। লেখাপড়া তো বেশি দূর করিনি। ক্লাস ফাইভ পাস দিয়েছি। পরে গিয়েছিলাম হাইস্কুলে। পড়াশোনা করার সামর্থ্য তো ছিল না স্যার। বাবা দিনমজুর। ববাঝেনই তো। তো জয়েন করলাম মুজাহিদ বাহিনীতে। সেখানেই দেখি, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকেরা ট্রেনিং করছে। কী সুন্দর মার্চ করে, পিটি প্যারেড করে। খোঁজখবর নিয়ে আমিও জয়েন করে ফেললাম। সেখান থেকে ট্রেনিং করতে চলে গেলাম চট্টগ্রামে। ট্রেনিং আর কী স্যার। খালি গুজুর গুজুর ফুসুর ফুসুর। শেখ সাহেব তো দেশ স্বাধীন করে ফেলবেই। পাঞ্জাবিরা বিদায় নিবে। যদি দরকার হয় আমরা হাতিয়ার হাতে নিব। শেখ সাহেব একবার হুকুম দিলেই হয়। তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। আমরা তো প্রস্তুত হয়েই ছিলাম স্যার। তাই ভ্যাবাচেকা খাই নাই। কিন্তু মায়ের মুখটা মনে পড়ল স্যার। মা তো স্যার। আমারে দেখতে চায়। চট্টগ্রাম মেসে থেকে বের হব, দেখি হলুদ পোস্টকার্ড। মায়ের চিঠি। মা লেখাপড়া তেমন জানে না। তবু চিঠি লেখে। লিখছে, বাবা হামিদুর তোমাকে কত দিন দেখি না। মনটা পোড়ে। দেশের পরিস্থিতিতেও তোমাকে নিয়া ভাবনা হয়। চিঠিটা পড়ে ভাবলাম, দেশের লাইগে যুদ্ধে তো যাবই। যাই, মায়ের মুখটা একটু দেখে আসি। মায়ের দোয়া হলো আসল দোয়া। কী বলেন স্যার।
নিশ্চয়ই। রাতের বেলা ডালটা তুমি রাধবে তো, হামিদুর?
অবশ্যই স্যার। ডাল রাঁধব। আজ রাতে স্যার রুটি না স্যার। ভাতই পাক করব স্যার। আপনে আমার হাতের পাক পছন্দ করেন। আপনি আমাকে বাবুর্চি থেকে সিপাহিতে প্রমোশন দিয়েছেন। আপনি যা বলবেন, আমি তা-ই করব স্যার। আপনি বললে স্যার এখনই জান দিয়ে দেব। ধরেন স্যার পাকিস্তানি ট্যাংক আসতেছে। আপনি বললেন, যাও হামিদুর এই মাইন বুকে বেঁধে ট্যাংকের সামনে শুয়ে পড়ো। লাই ডাউন। আমি বলব, ইয়েস স্যার। থ্যাংক ইউ স্যার। জয় বাংলা। আমি আল্লাহর নাম নিয়ে শুয়ে পড়ব।
তা তুমি করবে আমি জানি।
চট্টগ্রামে ট্রেনিং একাডেমিতে স্যার আমাদের বাঙালি অফিসারদের আর জওয়ানদের স্যার ২৫ মার্চ রাতে যেভাবে ওরা পাইকারিভাবে ক্লোজ করে লাইন করে গুলি করেছে স্যার…আমাকে স্যার অর্ডার দেন স্যার আমি এখনই চলে যাব স্যার…মাইন দেন…গ্রেনেড দেন…।
ঠান্ডা হও হামিদুর। এক দিনে লড়াইয়ে জেতা যায় না। একটা একটা করে ব্যাটল লড়তে হয়। অনেক ব্যাটলে তুমি সামনে এগোবে। অনেক ব্যাটলে পেছনে হটবে। আসলে তুমি জিততে চাও ওয়ার। রাইট?
ইয়েস স্যার।
সূর্যের আলো কমে আসছে। আকাশে ঝাঁক বেঁধে পাখিরা ঘরে ফিরছে। আর্মি ব্যাটালিয়নের মতো একজন তার পেছনে দুজন তার পেছনে তিনজন–এই অর্ডারে পাখিরা উড়ছে। মাথার ওপরে একটা কামরাঙাগাছ। টিয়াপাখি ঝাঁক বেঁধে হল্লাচিল্লা করা শুরু করেছে।
যাও হামিদুর। আজকে রাতের খাবার রান্নাটা তুমি একটু টেককেয়ার করো।
স্যালুট স্যার। আমি নিজ হাত পাক করব স্যার।
.
হামিদুর লঙ্গরখানার দিকে যায়। স্যারের জন্য সে আজকে ভাত রাঁধবে। মুরগি জোগাড় করতে হবে। এই শিবিরে খাবারের অবস্থা তেমন ভালো নয়। রাতে দুটো করে রুটি আর খোসাসমেত ডাল। দুপুরে ভাত আর সবজি। মাছ বা মুরগি সপ্তাহে দুদিন। নিজেদের ডেইলি ভাতা থেকে চাঁদা দিয়ে তারা মাঝেমধ্যে একটু ভালো খাওয়ার চেষ্টা করে। লে. কাইয়ুম বলেন, খাওয়া ভালো দরকার সৈনিকদের। তাহলে তারা যুদ্ধটা ভালোমতো করতে পারবে।
.
অক্টোবর মাস। ২৮ তারিখ। হেমন্তের এই দিনেই এবার শীত পড়েছে ভয়ংকর। সারা রাত কুয়াশায় ঢাকা থাকে চা-বাগান, ছায়াবৃক্ষ আর পাহাড়ের ঢাল ভরে থাকা বিচিত্র বৃক্ষরাজি। এরই ফাঁক দিয়ে বয়ে যায় স্রোতস্বিনী পাহাড়ি ঝরনা। দুপুরের দিকে রোদ পড়লে দূর থেকে মনে হয় গলে যাওয়া রুপার বিছা যেন কোনো পাহাড়ি রমণীর শ্যামল কোমর ঘিরে ঝকমক করছে।
সীমান্তের ওপারে শ্রীমঙ্গলের ধলই। সেখানে পাকিস্তানি পোস্ট। ওই পোস্ট আক্রমণ করা হবে। দখলমুক্ত করা হবে ধলই। সেখানে উড়বে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-হলুদ-সবুজ পতাকা।
লে. কাইয়ুমের নেতৃত্বে চলেছে মুক্তিবাহিনীর দল। কুয়াশার আড়ালে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওপারে যাওয়া সহজ হবে। ওরা টেরও পাবে না। তিন দিক থেকে ঘিরে ধরবে ওরা শত্রুদের। পেছনের দিকটা খোলা রাখবে যাতে শত্রুরা পশ্চাদপসরণ করতে পারে।
তাদের হাতে অস্ত্র, গোলাবারুদ আছে পর্যাপ্ত। এই যুদ্ধে জয়লাভ না করার কোনো কারণ নেই। তবে যথাসম্ভব বেশি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তাদের লক্ষ নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি যত কম করা যায়। আর শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করা যায় যত বেশি। ওদের অস্ত্র, গোলাবারুদ, রসদ দখল করা যায় যত বেশি।
তাদের মুক্তিসেনার দলে এবার থাকছে সিপাহি হামিদুরও। রান্নার কাজ থেকে প্রমোশন দিয়ে তাকে লে. কাইয়ুম তাঁর রানার বানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রথমে মুজাহিদের ট্রেনিং পাওয়া আর পরে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ট্রেনিং তার মনোবল আর সাহস বাড়িয়ে দিয়েছে। সে তাই সরাসরি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়া শুরু করেছে। কোদালকাঠি পাকিস্তানি পোেস্ট দখলের লড়াইয়ে দেখা গেছে হামিদুর ভালো করেছে। অল্প বয়স, শরীর-স্বাস্থ্য সুঠাম, আর বেসিক ট্রেনিং অনেক এফএফের চেয়ে ভালো। যোদ্ধা হিসেবে তাই তার ভালো করারই কথা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তার সাহস আছে, সে কথা শোনে, যা বলা হবে, তা-ই পালন করবে। এমন সৈনিকই তো অধিনায়কদের প্রথম পছন্দের।
