কিন্তু এই সুখবর আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে আলোচিত হলো। ২৭ ও ২৮ অক্টোবর। তাতে লাভ হলো এই যে তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে আর কেউ কোনো কথা বললেন না। আর ক্ষতিটা হলো, এ তো বড় খবরের গোপনীয়তাটা আর বজায় থাকল না।
কিন্তু এই সুখবর আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে আলোচিত হলো। ২৭ ও ২৮ অক্টোবর। তাতে লাভ হলো এই যে তাজউদ্দীনের বিরুদ্ধে আর কেউ কোনো কথা বললেন না। আর ক্ষতিটা হলো, এ তো বড় খবরের গোপনীয়তাটা আর বজায় থাকল না।
হামিদুর ছেলেটা গায়ে গতরেই বেড়েছে। পেশল বাহু, চিতানো বুক, পেটানো। হাত-পা। নাকের নিচে গোঁফের রেখা। আসলে তো কিশোরই। বয়স কত হবে? ১৮? কিংবা এক বছর কম বা বেশি।
মনের বয়সে সে কিশোরই রয়ে গেছে।
লেফটেন্যান্ট কাইয়ুম বলেন, সিপাহি হামিদুর।
স্যার।
হামিদুর ক্যানভাসের জুতা মাটিতে ঠুকে স্যালুট দেয়। নামের আগে সিপাহি পরিচয়টা তাকে খুশি করে তোলে।
তোমার হাতের ডাল রান্নাটা কিন্তু পৃথিবীর এক নম্বর। আমাদের লঙ্গরখানার বাবুর্চি আক্কেল আলীর ডাল যা হয়, তাকে ঠিক পাক করা বলে না। ওটা হলো খুঁটা। তোমারটা হলো পৃথিবীর এক নম্বর। কী বলো?
স্যার। সিপাহি আপনার কথায় একটুখানি ওজর আপত্তি করে স্যার।
আমার কথায় ওজর! বলো কী!।
আপনি পারমিশন দিলে বলতে পারি স্যার।
পারমিশন দিচ্ছি। বলো। শুনি তোমার কী আপত্তি!
সিপাহি হামিদুর তার হাত দুটো একত্র করে। বিনয়ের ভঙ্গি আনে চেহারায়। হাত কচলাতে কচলাতে বলে, স্যার, পৃথিবীর সেরা ডাইলটা পাক করে আমার মা স্যার। আমার মায়ের হাতের পাক করা ডাইল যদি খেতেন, তাহলে স্যার কী যে বলতেন! জান্নাতি সুবাস স্যার। মায়ের হাতের ডাইলের কোনো তুলনা হয় না স্যার। আল্লাহ বাঁচি থুলে দেশ স্বাধীন হলে আপনাকে স্যার খাওয়াব স্যার। আপনার কথা স্যার মাকে কত বলিছি। মা বলেছেন, তোর স্যারের এক শ বছর পরমায়ু হবে। নেকদার আদমি।
তাহলে তুমি বোধ হয় ডাল পাক করার কায়দাটা মায়ের কাছ থেকেই শিখেছ। তোমার রান্নার হাতও খুব ভালো।
স্যার। সেটি হয়তো ঠিক কয়ে থাকবেন স্যার। আমার মা তো স্যার পশ্চিমবঙ্গের মেয়ে। চব্বিশ পরগনার ডুমিয়া থানার চাপড়া গ্রামে ছিলেন। তাঁরা। পাকিস্তান হওয়ার পর ইন্ডিয়া থেকে এইপারে চইলে এসেছে। আসার সময় আর তো কিছু সাথে করে আনতে পারেনি। ডাইল আর লাবড়া পাক করার কায়দাকানুন সাথে করে এনেছে। বলে সিপাহি হামিদুর হাসে। তার দাঁতগুলো ঝকঝকে। তার কচিমুখে দাঁতগুলোকেই সবচেয়ে বেশি করে চোখে পড়ে। আর হাসলে তার চোখের তারাও ঝিলিক তোলে। লে. কাইয়ুম স্নেহের চোখে তাকান। দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসতে চাইছে। সেটা তাঁকে চেপে ধরতে হবে। তিনি সৈনিক। আছেন যুদ্ধের ময়দানে। এখানে মায়া-মমতার স্থান যে নেই বললেই চলে।
ত্রিপুরার এক পাহাড়ের ঢালে তাদের ক্যাম্প। একটা মিউনিসিপ্যাল অফিসের লাগোয়া দুটো টিনে ছাওয়া পাকা ঘর। তারই পাশে ঘন গাছগাছালির আড়ালে তাঁবু। সেই তাঁবুর রংও ধূসর। দূর থেকে দেখে কেউ বুঝবে না এখানে ক্যাম্প গাড়া হয়েছে। মাঠে সবুজ ঘাস। এই এলাকায় বৃষ্টি হয় খুব বেশি। পশ্চিম দিকে শ্রীমঙ্গল। চা-বাগান সীমান্তের ওপার ওপার দুই পারেই। সমান মাপে কাটা চা-বাগানের মাথার ওপারে ছায়াবৃক্ষের সারি।
সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। পশ্চিমাকাশে কে যেন হলদি গুঁড়ো ছিটিয়ে দিয়েছে। অস্তরাগ এসে পড়েছে হামিদুর রহমানের মুখের এক পাশে। চুলের এক পাশটায় রঙিন আলো ওর মুখে শৈশবের লালিত্যকে উসকে দিতে চাইছে। কিন্তু তার শক্ত চোয়াল ফুটিয়ে তুলতে চাইছে সৈনিক জীবনের দৃঢ়তা। অবরুদ্ধ দেশকে শত্রুমুক্ত করতে তারা লড়ছেন। ভারতের মাটিতে আশ্রয় নিয়ে তারা প্রায়ই ঢুকে পড়ছেন দেশের ভেতরে। মুক্তিবাহিনীর জীবন, কঠিন জীবন।
হামিদুর বলে, স্যার। আপনার কথা শুনে আমার আরেকটা কথা বলতে ইচ্ছে করতিছে। বলি স্যার?
বলো। লে. কাইয়ুম বসে আছেন একটা টিপয়ের ওপরে। মিউনিসিপ্যাল ঘরটার বারান্দায়। হামিদুর রহমান মাঠে। মাঠের ঘাস চারদিকে লেফট-রাইট করার লাইন ধরে মরে একটা ট্র্যাক তৈরি করে রেখেছে।
হামিদুর বলে, স্যার। আপনি বললেন না, পাক করার কায়দার কথা। আমার মায়ের নামও স্যার কায়দা।
লে. কাইয়ুম বলেন, মানে?
আমার মায়ের নাম স্যার কায়েদাতুননেসা। তাইলে স্যার কায়দাই হলো?
তা হলো।
আর তোমার বাবার নাম?
আমার পিতার নাম স্যার আক্কাস আলী মণ্ডল।
তার দ্বারা কী বোঝা গেল?
স্যার?
তার দ্বারা বোঝা গেল তোমার পিতা মোড়ল ছিলেন।
না স্যার। জমিজমা কিছু নাই স্যার। সে আমাদের দাদা বা দাদার দাদার কোনো দিন কিছু ছিল কি না তা তো জানি না। কিন্তু আমাদের স্যার কিছু নাই তো। বাবা তো দিনমজুরি করে খায়। এই ধরেন আমাকে নিয়েই তাদের যত আশা। আমি তো স্যার বলেছি, তোমাদের চিন্তা করতে হবি নানে, আমার স্যার আছেন। আমাকে তিনি রান্নার কাজ থেকে প্রমোশন দিয়ে সিপাহি করেছেন। তোমরা দোয়া করো। দেশ স্বাধীন হলে তোমাদের অভাব থাকবিনে। কারও অভাবই থাকবে না। আমিও তো সিপাহি হয়েই গিয়েছি। দেশ স্বাধীন হলে স্যার মানুষ কি আর না খেয়ে কষ্ট পাবি স্যার?
না। তা কেন পাবে?
স্যার। মা বলিছেন, মা আপনের জন্যি অনেক দোয়া করেন স্যার। নামাজের শেষে নামাজের জায়গায় বসেই দোয়া করেন।
কবে বললেন তিনি তোমাকে এত কথা?
আমি স্যার গেলাম না মার্চ মাসের শেষের দিকে। চট্টগ্রাম থেকে চলে গেলাম তো ঝিনাইদহে। সেখান থেকে ধরেন আমাদের কালীগঞ্জের খদ্দ খালিশপুর গ্রামে। অল্পের জন্যে না সেই রাতে বেঁচে গেলাম। আপনিও বাঁচলেন, আমাদেরও বাঁচালেন। আগে থেকেই তো বলে রেখেছিলেন যে ওরা আক্রমণ করার আগেই আমরা রিভোল্ট করব। তবু তো স্যার কত বাঙালি জওয়ান আর অফিসারকে পাঞ্জাবিরা মেরে ফেলল। আমরা না হয় আপনার অর্ডারে আর বুদ্ধি-বিবেচনায় সটকে যেতে পারলাম। তবে স্যার আমি প্রথমে বাড়ি গিয়েছিলাম।
© 2023 BnBoi - All Right Reserved
© 2023 BnBoi - All Right Reserved