ইয়াহিয়া উঠলেন। তিনি গাড়ির জন্য এই প্রাসাদের নিচে নামলেন লিফটে। গাড়িতে উঠবেন, এই সময় পেশাবে তাঁর তলপেট ফেটে যাওয়ার উপক্রম হলো। তাঁর সামনে দুটো উপায় আছে। গাড়িতে পেশাব করা। পার্কিং লটে পেশাব করা। মদ খেলেও তার মাথা পরিষ্কার। গাড়ির চেয়ে গাড়ির বাইরে পেশাব করা ভালো। তিনি দেয়ালের দিকে মুখ করে জিপার নামিয়ে ছরছর শব্দ তুলে পেশাব করে দিলেন।
৬৯
তাজউদ্দীন জয় বাংলা পত্রিকা হাতে বসে আছেন তার অফিসরুমে। ৫ নভেম্বর ১৯৭১ জয় বাংলা পত্রিকার শিরোনাম করেছে, হাতে বড় বড় ফন্টে লিখে :
ডিসেম্বরের আগেই ঢাকায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়বে। বিমান আক্রমণ উপেক্ষা। সকল রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীর অগ্রগতি।
খবরে বলা হচ্ছে :
সকল রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনী দুর্বার বেগে এগিয়ে চলেছে। প্রতিটি সেক্টরে মুক্তিবাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও মৃতদেহ ফেলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দ্রুত বেগে পলায়ন করছে। দলে দলে রাজাকার মুক্তিবাহিনীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করছে। যশোরে হানাদারদের তিনটি চৌকি এখন মুক্তিবাহিনীর দখলে। যশোর ক্যান্টনমেন্ট নাটোরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মুক্তিবাহিনীর দুর্বার অগ্রগতি দৃষ্টে আশা প্রকাশ করা যাচ্ছে, ডিসেম্বরের আগেই অধিকৃত ঢাকায় স্বাধীন বাংলার পতাকা সগর্বে উড্ডীন হবে। বাংলাদেশের বিভিন্ন রণাঙ্গনে ব্যাপক সফর শেষে মুজিবনগরে পৌঁছে বাংলাদেশ বাহিনীর প্রধান কর্নেল ওসমানীও এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন একই কথা।
তাজউদ্দীন মাথা নাড়ছেন। যাক। অল্পের ওপর দিয়ে গেছে। ওসমানী সাহেবের সংবাদ সম্মেলনকে নিউজের সোর্স হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে তাঁদের আলাপের কোনো রেফারেন্স দেওয়া হয়নি। ভাগ্যিস।
আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা ছিল মুজিবনগরে। মানে। থিয়েটার রোডের বাড়ির সুপ্রশস্ত আঙিনায়।
তাজউদ্দীন আহমদ ভেবেছিলেন না জানি কত বড় ঝড়ই তাঁকে সামলাতে হবে। ২০ অক্টোবর সভা শুরু হলো। দেখা গেল, বড় কোনো বিরোধিতা আসছে না। এর মধ্যে দিল্লি থেকে খবর এল, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মন্ত্রিসভার সঙ্গে কথা বলবেন। জরুরি যেতে হবে দিল্লি। কারণ, এরপরেই তিনি চলে যাবেন ইউরোপ-আমেরিকা। ২৪ অক্টোবর থেকে যাত্রা শুরু। ১৯ দিন থাকবেন না।
এই খবর ওয়ার্কিং কমিটির সভায় দেওয়া হলো। বলা হলো, ২১ অক্টোবর সভা হবে। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক শেষে এসে বাকিটা হবে ২৭ ও ২৮ অক্টোবর।
প্রথম দুই দিনের সভা শেষে কতগুলো প্রস্তাব পাস হলো, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, যা তাজউদ্দীন, সৈয়দ নজরুলের চাওয়ার অনুবর্তী :
১. স্বাধীনতা ছাড়া আর কোনোভাবে সমস্যার সমাধান করা হবে না।
২. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
৩. ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তিকে এই সভা স্বাগত জানায়। এটা বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামকে শক্তিশালী করবে।
৪. ভারত যে ৯০ লক্ষ শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে এবং বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য করছে, এ জন্য তাদের ধন্যবাদ।
৫. সব শরণার্থীকে স্বাধীন, মুক্ত বাংলাদেশে ফেরত নেওয়া হবে।
.
তারা গেলেন দিল্লিতে। সৈয়দ নজরুল ইসলামের উপস্থিতিতে তাজউদ্দীন ইন্দিরা গান্ধীকে বললেন, মুজিববাহিনী বাংলাদেশ সরকার কিংবা সেনাপতির নির্দেশ মানছে না। তারা বহু জায়গায় মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে। এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। মুজিববাহিনীকে অবশ্যই বাংলাদেশের সেনাধ্যক্ষের চেইন অব কমান্ড এবং বাংলাদেশ সরকারের অধীনে আসতে হবে। তারা এই রকম অবাধ্যতা করতে পারছে, কারণ র তাদের প্রশ্রয় দিচ্ছে। বাংলাদেশের নিয়মিত অফিসাররা সারাক্ষণ এই এক অভিযোগই আমার কাছে পাঠাচ্ছে।
ইন্দিরা গান্ধী ডি পি ধরকে বললেন, মুজিববাহিনীকে নিবৃত্ত করুন। আপনি ব্যবস্থা নিন। কী ব্যবস্থা নিলেন, আমাকে জানাবেন।
তাজউদ্দীনের মুখে হাসি ফুটে উঠল।
সৈয়দ নজরুল বললেন, আমাদের মুক্তিবাহিনী বহু জায়গা শত্রুমুক্ত করে ফেলেছে। প্রতিদিন আমরা বিজয়ের খবর পাচ্ছি। এখন কি আমরা আশা করতে পারি না যে ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে?
প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা হাসলেন। বললেন, আমি পশ্চিমা দেশগুলো সফর করে আসি। আমি চেষ্টা করব যুদ্ধ এড়িয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার মাধ্যমে সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান আনতে। কিন্তু আমার মনে হয় না তা হবে। আমি সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছ থেকেই রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া আর কোনো কথা বের করতে পারছি না। আমেরিকা ব্রিটেনের কাছ থেকে পাব, এই আশা আমি করি না। তা যদি হয়, তাহলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে রাস্তাঘাট শুকানোর জন্য। আমাদের উত্তরে তুষারপাতের জন্য। এরপর একটা এসপার-ওসপার তো করতেই হবে। এখনই স্বীকৃতি দিয়ে আমি এখনই যুদ্ধ বাধাতে চাই না। আমাদের নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
আওয়ামী লীগ নেতারা এই কথা শুনে আকাশে ভাসতে লাগলেন। ইন্দিরা গান্ধী বললেন, এটা গোপন রাষ্ট্রীয় কথা। এটা একটা স্ট্র্যাটেজিক্যাল কথা। আপনাদের গোপন রাখতে হবে। একেবারে গোপন।
