হাজি হাশেম কুমিল্লা এলাকার একজন এমএনএ। তিনি তাঁর নিজের জিপ নিয়ে এসে শরণার্থীশিবির থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে দিবারাত্রি শ্রম ও
সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। হাজি হাশেম একজন শিল্পপতি। জবা টেক্সটাইলসমেত বিভিন্ন টেক্সটাইল মিল এবং হারিকেনের ফিতা বানানোর কারখানা আছে তার। দানশীল ব্যক্তি। নিজের জমানো টাকা সব নিয়ে এসে আগরতলার শরণার্থীশিবিরে আর মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে দান করে দিচ্ছেন। বয়স ৪৫-৪৬ হবে।
হাজি হাশেম বললেন, আমি তো আগরতলার থানা থাইকা কত ছেলেরে যে। বাইর কইরা আইনা ট্রেনিং ক্যাম্পে দিছি, কোনো ঠিক আছে? গিয়া কইছি, আটকাইছেন ক্যান? ইন্ডিয়ান পুলিশ কয়, পিকিংপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন করে। আমি কই আরে মিয়া, ওইটা আমার ছাত্রলীগের পোলা। অরে ছাড়েন। কইয়া নিয়া আইছি। বাচ্চা বাচ্চা ছেলে। মুখে অহনো দুধের গন্ধ। পরে জিগাই, ওই মিয়া ছাত্র ইউনিয়ন করো? অরা কয়, ছাত্র ইউনিয়ন তো ছাত্র ইউনিয়ন, কোনো ইউনিয়নও জীবনে করি নাই। শাহিন স্কুলে, রেসিডেনসিয়াল স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ি। টেনে পড়ি। রাজনীতি বুঝি না। দেশ বুঝি। স্বাধীনতা বুঝি। বঙ্গবন্ধুর হুকুম বুঝি, তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।
তাজউদ্দীন হাজি হাশেমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সত্যি, ট্রেনিং ক্যাম্পে, মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে তিনি অনেক কিশোরকে দেখেছেন।
খালেদ মোশাররফ বললেন, আমি ঢাকার ছেলেদের ঢাকার ভেতরে পাঠিয়েছি। ওদের বলেছি, আরবান গেরিলা। ঢাকা শহরকে অস্থির করতে না পারলে পৃথিবীর মানুষকে বোঝানো যাবে না যে যুদ্ধ চলছে।
তাজউদ্দীন বললেন, আমরা খবর পাচ্ছি। আপনার ছেলেরা ঢাকা শহরকে আতঙ্কের শহর বানাতে সক্ষম হয়েছে। গ্রেট জব ইন ডিড।
চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী, এম এ হান্নান, মালেক উকিল সবার সঙ্গে দেখা হলো। নেতারা সামরিক মালবাহী বিমানে উঠে বসলেন।
খালেদ মোশাররফ তাঁদের স্যালুট দিয়ে বিদায় দিলেন।
৬৮
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আরও এক পেগ হুইস্কি বরফ ছাড়াই ঢকঢক করে খেয়ে নিলেন। তার পা টলছে। জিব জড়। কিন্তু তার মাথা ঠিক আছে। তার সামনে বসে আছেন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট পদগোর্নি। পারসোপলিস, ইরান। পারস্য সাম্রাজ্যের আড়াই হাজার বছর পূর্তি উপলক্ষে ইরানের শাহ এক বিশাল উৎসবের আয়োজন করেছেন ছবির মতো সুন্দর এই শহরে। সারা পৃথিবীর রাজা, রানি, রাজকন্যা, রাজপুত্র প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী এতে যোগ দিয়েছেন। ৬০০ জন বিশ্ব ভিআইপির উপস্থিতিতে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার নৈশভোজ গিনেস রেকর্ড বুকে জায়গা করে নিল। তার মধ্যেও ইরানের শাহ পাকিস্তান আর সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্টকে আলাদা করে বসিয়ে দিলেন। এদের দুজনের মধ্যে বৈঠক হওয়া খুব জরুরি।
ইয়াহিয়া খানকে পররাষ্ট্রসচিব সুলতান খান বললেন, স্যার, আর খাবেন না। এই মিটিংটা খুব জরুরি।
ইয়াহিয়া খান বললেন, ইয়েস। ভেরি ভেরি ইম্পরট্যান্ট। এই জন্য আমাকে আরেক পেগ খেতে হবে। কারণ, না খেলে আমার মাথা খুলবে না।
তিনি আরেক পেগ খেলেন ঢকঢক করে। আহ, ইরানের মেয়েগুলো এত সুন্দর কেন!
প্রেসিডেন্ট নিকোলাই পদগোর্নি তাঁকে বললেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আপনি পূর্ব পাকিস্তান সমস্যার সমাধান কবে করতে পারবেন বলে আশা করছেন?
ইয়াহিয়া খান বললেন, পূর্ব পাকিস্তানে কোনো সমস্যা নেই। আমি উপনির্বাচন করছি। যে এমএনএরা ইন্ডিয়া গেছে, তাদের পদ শূন্য করা হয়েছে। সেসবে নির্বাচন হবে। তারপর শাসনতন্ত্র হবে। তারপর আমি ক্ষমতা ছেড়ে দেব। জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেব। তবে কিছুই হচ্ছে না, কারণ ইন্ডিয়া অ্যাটাক করছে। আমার কিছু করার নাই। যা করার তা করতে হবে ইন্ডিয়াকে। অথচ আপনি ইন্ডিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছেন। তারা আমার দেশে হামলা বাড়িয়ে দিয়েছে। আপনি কেন আমার দেশের বিরুদ্ধে চুক্তি করলেন?
আপনার দেশের বিরুদ্ধে চুক্তি করিনি। আপনি ভারত আক্রমণ না করলে এই চুক্তি আপনার দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে না। আর আপনি কাদের জনপ্রতিনিধি বলছেন। আপনার কথা বলতে হবে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে। আপনি তাকে মুক্তি দিয়ে তাঁর সঙ্গে চুক্তি করুন। তাহলেই তো সমস্যা মিটে যায়।
সঙ্গে সঙ্গে ইয়াহিয়ার মাথা গরম হয়ে গেল। তিনি পরপর তিন কে মদ খেয়ে নিলেন। তাঁর কান জ্বলতে লাগল। তিনি বললেন, শেখ মুজিব। সে তো বিশ্বাসঘাতক। সে দেশের শত্রু। আমি তার সঙ্গে কথা বলব না। আমি নির্বাচন দেব।
আপনি সময় পার করছেন। তাতে আরও আরও মানুষ মারা যাবে। আরও ঘরবাড়ি পুড়বে। যা সম্ভব নয়, আপনি তা করতে চাইছেন। এটা করবেন না। এরপর পদগোর্নি গলাটা নামিয়ে বললেন, পাকিস্তান আমারে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। তার সঙ্গে আমরা সদ্ভাব বজায় রাখতে চাই। আপনার হাতে সময় কিন্তু আছে খুব অল্প।
মাতাল ইয়াহিয়া বললেন, আপনি কি ইরানের মদের প্রশংসা করবেন? এই মদ কি স্কটল্যান্ড থেকে আনা? নাকি এদের আঙুর দিয়ে, নাকি বার্লি দিয়ে তৈরি? আমি আপনাদের ভোদকাও খুব পছন্দ করি, মিস্টার প্রেসিডেন্ট।
পদগোর্নি ভাবলেন, লোকটাকে আমি একটা ইঙ্গিত দিলাম। সময় কম। আজকে অক্টোবরের ১২। আর বড়জোর ৬ সপ্তাহ সময় লোকটা পাবে। তারপর ইন্দিরা তাঁকে আর সময় দেবে না।
