ব্যাঙ্গমি বলবে, নজরুল ইসলাম-তাজউদ্দীন সরকারের প্রথম দিকের সিদ্ধান্ত আছিল, মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং আর অস্ত্র শুধু আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ কর্মীদের দেওয়ার জন্য। বামেগো হাতে অস্ত্র ট্রেনিং গেলে তারা নকশালি হইয়া যাইতে পারে, এই আছিল ভয়। কিন্তু খালেদ মোশাররফ তাঁর ক্যাম্পে ছাত্র ইউনিয়নের উভয় অংশসহ সব দল মত আর দলনিরপেক্ষ তরুণগো ট্রেনিং দিতে থাকেন হাজারে হাজারে। মেজর হায়দারের নেতৃত্বে এদের দেওয়া হয় গেরিলা ট্রেনিং। পাঠানো হয় ঢাকায় গেরিলা অপারেশন করতে। রুমি, বদি, বাকের, জুয়েল, হাবিবুল আলম, কাজী কামালগো মতো গেরিলারা আছিল খালেদ মোশাররফের রিক্রুট।
.
ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন বেরিয়েছেন সীমান্ত বরাবর এক দীর্ঘ সফরে। তারা যাচ্ছেন শরণার্থীশিবিরে। তারা যাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ শিবিরে। তাঁদের সঙ্গে আছেন ব্যারিস্টার আমীর।
সকালবেলা। আকাশে মেঘ। ছাইরঙের মেঘে বৃষ্টির পূর্বাভাস। গাড়িবহর ছুটে চলেছে মেলাঘর ক্যাম্পে। ঘন বনের মধ্যে আঁকাবাকা মাটির পথ। সৈয়দ নজরুল ও তাজউদ্দীন একটা জিপে। পেছনে তাদের নিরাপত্তাকর্মীরা বসা। আরেকটা জিপে ব্যারিস্টার আমীর। সঙ্গে সাংবাদিক। আরও জিপে পাবলিক রিলেশন বিভাগের কর্মীরা। আরেক গাড়িতে নিরাপত্তারক্ষীরা।
গেটে তাদের সালাম জানালেন মেজর হায়দার। তারা আরও ভেতরে চললেন।
বাঁশের তৈরি ব্যারাক। খড়ের চাল।
মেজর খালেদ মোশাররফ ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন একটা গাছের নিচে। তার অফিসে রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নেওয়ার জন্য।
তিনি নেতাদের স্যালুট করলেন। করমর্দন করে তার ছাউনিতে নিয়ে গেলেন।
খালেদ বললেন, চলেন, যুদ্ধের মাঠে যাই।
তাজউদ্দীন বললেন, চলেন।
জঙ্গলের মধ্যে হাঁটছেন খালেদ। তার গায়ে জলপাই রঙের শার্ট। ধূসর রঙের প্যান্ট। পায়ে বুট জুতা। হাতে একটা লাঠি। তিনি সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীনের হাতেও একটা করে স্টিক দিয়েছেন, যাতে চলতে সুবিধা হয়। তারা খালেদকে অনুসরণ করছেন। এই পথের মধ্যে কাটাগাছ। সেসব মাড়িয়ে সবাই এগোচ্ছেন।
সীমান্ত পেরিয়ে তারা বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকলেন। সুন্দর ছিমছাম গ্রাম। গ্রামের অধিবাসী সবাই মুক্তিযোদ্ধাদের বন্ধু। গ্রামের পথের দুই ধারে বর্ষার জলে ভরা পুকুর। গ্রামের নারীরা এসেছেন পানি নিতে। কলসি কাঁখে তারা আসছেন, যাচ্ছেন। পাশ দিয়ে বড় বড় মর্টার হাতে যাচ্ছে এক সারি মুক্তিযোদ্ধা। একটু দূর থেকে গোলার শব্দ আসছে। তারা একটা আমবাগানের মধ্যে ঢুকলেন। তারপর দেখা গেল, মুক্তিযোদ্ধাদের কামানের পোস্ট। আমবাগানের ভেতরে অনেক বড় কামান বসানো হয়েছে। পুরোনো আমলের কামান, কিন্তু বেশ শক্তিশালীই মনে হচ্ছে। বাঙালি গোলন্দাজরা লুঙ্গি পরা। গায়ে গেঞ্জি। তারা ফায়ার করছে।
খালেদ বললেন, স্যার, আসেন। কামানের সামনে যাই।
সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীন, আমীরসহ দলটি কামানের সামনে চলে গেল। গোলা ছোঁড়া হলো। মাথার ওপর দিয়ে কামানের গোলা যাচ্ছে। আকাশ বিদীর্ণ করে শব্দ হচ্ছে। সৈয়দ নজরুল তাজউদ্দীনের বাহুতে খামচি মারলেন।
খালেদ বললেন, সামনে যে পাহাড়টা আছে, চলেন, সেটায় উঠি। তাহলে পাকিস্তানিদের পোস্ট দেখতে পাবেন।
পাহাড়ে ওঠা চাট্টিখানি কথা নয়। খালেদ তো অভ্যস্ত। অনায়াসে ওপরে উঠছেন। সৈয়দ নজরুল লাঠিতে ভর দিয়ে সাবধানে পা ফেলছেন। তাজউদ্দীন-আমীর উঠলেন আরেকটু স্বচ্ছন্দ গতিতে।
পাহাড়ে উঠে নিচে দূরে পাকিস্তানি মিলিটারির পোস্ট আর পজিশন দেখা গেল। খালেদ বাইনোকুলার দিলেন প্রেসিডেন্টকে। প্রধানমন্ত্রীকে। তারপর বলতে লাগলেন, ওই দেখুন। ওরা নড়াচড়া করছে। ওই দেখুন। ওই রেস্টহাউসটা। ওইটা ওদের হেডকোয়ার্টার।
পেছন থেকে মুক্তিযোদ্ধারা কামান দাগছে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীর মাথার ওপর দিয়ে কামালের গোলা গিয়ে শত্রুর অবস্থানের কাছে পড়ছে।
খালেদ বললেন, আমরা চট্টগ্রাম, কুমিল্লা রোড অচল করে রেখেছি। ওই দেখুন। ওইটা চট্টগ্রাম-কুমিল্লা হাইওয়ে। কোনো যানবাহন নাই।
আচ্ছা চলেন এবার ফিরে যাই।
তারা পাহাড় থেকে নামলেন। আবার জঙ্গলের পথ ধরে হেঁটে এলেন ক্যাম্পে। দুপুরে একসঙ্গে খেলেন তারা। এরই মধ্যে ক্যাপ্টেন গাফফার চলে এসেছেন একটা ছোট্ট বাহিনী নিয়ে। ঢাকার ছেলে পাশাও আছে এই দলে। তারা কসবা এলাকায় যুদ্ধ করে করে ফিরলেন।
সৈয়দ নজরুল, তাজউদ্দীন, আমীর মুগ্ধ হয়ে শুনছেন গাফফারের কাছ থেকে রণাঙ্গনের কথা।
বিকেলে অতিথিরা চলে গেলেন আগরতলা সার্কিট হাউসে।
পরদিন সকালবেলা তাঁরা বিমানে উঠবেন। সামরিক মালবাহী বিমান। খালেদ এলেন সকাল সকাল। নেতাদের বিদায় জানাবেন। তিনি জানালেন, কোথায় কোথায় তাদের অসুবিধা হচ্ছে। আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে সমন্বয়ের কোথায় সমস্যা। আওয়ামী লীগ করে না, এমন ছেলেদের রিক্রুট করে যে তিনি সুবিধা পাচ্ছেন, তা-ও জানালেন।
তবে জানা গেল, মুজিববাহিনী মুক্তিবাহিনীর মধ্যে যোগাযোগের সমস্যা ও ভুল-বোঝাবুঝি মিটে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী বললেন, আমাদের আওয়ামী লীগ নেতাদের এই মনোভাব সম্পর্কে আমার জানা আছে। তারা লেফটিস্টদের রিক্রুট করতে চায় না। আপনি আপনার মতো কাজ করুন। আপনার ওপরে আমাদের আস্থা আছে। তবে নকশাল একটা বাস্তব সমস্যা। মুক্তিবাহিনীতে রিক্রুটের সময় অবশ্যই স্ক্যানিং করতে হবে। তা না হলে পাকিস্তানি মিলিটারিদের চরেরাও এসে ঢুকে যেতে পারে। এটা আপনি আমার চেয়ে ভালো বুঝবেন। আপনি আপনার নিজের বিবেচনা প্রয়োগ করবেন।
