তাজউদ্দীন আহমদও বক্তৃতা দিলেন। তিনি বললেন, আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্ত করে আনব খুব শিগগিরই। আর তা করব যুদ্ধে জয়লাভ করার মাধ্যমে। আমরা স্বাধীনতাও আনব, বঙ্গবন্ধুকেও আনব। সেই যুদ্ধ জয়ে আজকের সদ্য উত্তীর্ণ জেন্টলম্যান ক্যাডেট যারা সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হলেন, তারা হবেন আমাদের অনেক বড় হাতিয়ার। আপনারা ইতিহাসের অংশ, কারণ আপনারা আমাদের বাংলাদেশ আর্মির প্রথম ব্যাচ। আপনাদের আমি বলব, আমরা দেশপ্রেমিক হব, আদর্শ সৈনিক হব, কিন্তু আমাদের আদর্শ মানুষ হতে হবে। আপনারা নারী ও শিশুদের প্রতি সম্মান দেখাবেন। সে আমাদের মিত্রপক্ষের হোক, বাঙালি হোক, অবাঙালি হোক, শত্রুপক্ষের হোক, নারী ও শিশু মানেই সম্মানের। তাদের রক্ষা করতে হবে। আর আপনারা যখন যুদ্ধক্ষেত্রে যাবেন, তখন রাজাকারদের এবং ক্ষুদ্র কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার সময় নিজেদের বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করবেন। দুই ধরনের রাজাকার আছে। এক ধরনের হলো, রাজনৈতিক কারণে রাজাকার হয়েছে, যারা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পক্ষ, স্বাধীনতার শত্রু, আদর্শের কারণে রাজাকার, আলবদর, আলশামসে যোগ দিয়ে সীমাহীন নিষ্ঠুরতা করছে। আরেক ধরনের লোক আছে, গরিব মানুষ, অশিক্ষিতও, তারা জানে না, তারা কেন এটাতে গেছে, শুধু দিনের শেষে ভাতা পায়, রেশন পায়, একটা চাকরি জুটেছে, এই ধরনের রাজাকার। আপনারা জানেন কি না জানি না, বহু রাজাকার অস্ত্রসমেত মুক্তিবাহিনীর গেরিলা দলে চলে এসেছে এবং তারা দেশের জন্য ভালো লড়াই করছে। কাজেই বিচার-বিবেচনা দিয়ে কাজ করবেন।
আনুষ্ঠানিকতা শেষে শেখ কামাল গেলেন তার চাচাঁদের সালাম করতে। সৈয়দ নজরুল বললেন, কামাল, কংগ্রাচুলেশনস।
থ্যাংক ইউ চাচা।
তাজউদ্দীন বললেন, তুমি কলকাতা এসে আমার সঙ্গে কথা বলো। ওসমানী সাহেবের এডিসি হিসেবেই কাজ করতে থাকো।
আমি তো যুদ্ধ করতে যেতে চাই, চাচা।
এটাও তো অনেক বড় যুদ্ধ–তাজউদ্দীন বললেন, তোমার নিরাপত্তা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন। তোমাকে কাছছাড়া করলে আমরা বড় টেনশনে থাকব।
আব্বার নাকি মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। জানেন কিছু?
এ রকম খবর জয় বাংলা পত্রিকাতে এসেছে বটে। তবে আমাদের কাছে খবর হলো, বিচার এখনো শেষ হয়নি আর রায়ও হয়নি। মুজিব ভাইয়ের কোনো ক্ষতি করার সাহস ইয়াহিয়া খানের হবে না। আমাদের কাছে এই খবর আছে–তাজউদ্দীন বললেন।
মন্ত্রীরা চলে গেলেন। ৬০ জন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। তাঁদের বিশেষ বিমানে করে কলকাতায় পাঠানো হলো।
ওসমানী সবাইকে পোস্টিং দিলেন। সবাই চলে গেল যুদ্ধক্ষেত্রে।
কামালকে নিজের কাছেই রাখলেন তিনি।
.
ওসমানীর এডিসি কামাল জানেন কার কোথায় পোস্টিং হচ্ছে। শচীন যাচ্ছেন ৯ নম্বর সেক্টরে। কামাল একটা চিঠি লিখলেন। তাতে সেক্টর কমান্ডারকে অনুরোধ করা হয়েছে যেন তার চাচা শেখ নাসেরের পরিবারের দিকে খেয়াল রাখা হয়।
.
তাজউদ্দীন আহমদ মুরতি ক্যাম্প থেকে গেলেন রংপুর-দিনাজপুরের
মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প আর মুক্তাঞ্চল পরিদর্শন করতে।
১০ অক্টোবর ১৯৭১ সালের দিনটা ছিল রৌদ্রোজ্জ্বল। আশ্বিন মাস, শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। বুড়িমারীতে মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের গেরিলাদের শিক্ষা সমাপনী কুচকাওয়াজে সালাম নিলেন তিনি। ভাষণে বললেন, আমাদের চূড়ান্ত মুক্তির দিন এসে গেছে। এবার আমরা চূড়ান্ত হামলা পরিচালনা করব। দেশের এক ইঞ্চিও আর শত্রুর পদানত থাকবে না। স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা সব ঘরে ঘরে উড়বে। আর তা ওড়াবে তোমরাই।
এরপর তিনি ক্যাম্পের ভেতরে একটা শামিয়ানার নিচে বসলেন। পরনে একটা গাঢ় রঙের ফুলহাতা শার্ট, তাতে বোতামসহ শোল্ডার স্ট্র্যাপ, পায়ে কেডস। মাথায় ক্যাপ। তাঁকে দেখতে মুক্তিযোদ্ধা গেরিলাই লাগছে। উইং কমান্ডার বাশার তাঁকে বললেন, আপনার জন্য দুপুরের খাবার রেডি।
তাজউদ্দীন বললেন, যোদ্ধারা খেয়েছে?
ওরা খাচ্ছে।
তাজউদ্দীন শামিয়ানার নিচ থেকে বেরিয়ে ক্যাম্পের ব্যারাকগুলোর দিকে যাত্রা শুরু করলেন। দুই ধারে খড়ের চালা, বাঁশের বেড়ার ব্যারাক। একটা গাছের নিচে তরুণ গেরিলারা মাটিতে বসে টিনের থালায় খাচ্ছে। আজকে একটু উন্নত মানের খাবার। প্রত্যেকের জন্য দুই টুকরা করে মাংস, ডাল। তিনিও একটা টিনের থালা হাতে তুলে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে ভাত-তরকারি নিয়ে যোদ্ধাদের পাশে গিয়ে বসলেন। দুপাশে বসা দুই তরুণ খাওয়া ভুলে প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি দুজনের পাতে নিজের পাতের মাংস তুলে দিয়ে বললেন, খাও। তুমিও যোদ্ধা। আমিও যোদ্ধা। তুমি কি জানো, বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত?
ছেলেটা কথা ভুলে গেছে।
তাজউদ্দীন মুখের ভাত চিবিয়ে নিয়ে বললেন, ৭ কোটি ৩০ লাখ। সাড়ে সাত কোটি থেকে কুড়ি লাখ এরই মধ্যে শহীদ হয়েছেন। তাঁরা শহীদ। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। আমরা সবাই একই মায়ের পেট থেকে হয়েছি। বাংলা মা। আমরা সবাই ভাইবোন। সবাই সমান। নাও খাও।
তাজউদ্দীন হাঁটছেন। সঙ্গে এই সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা নেতা, এমএনএ, যুব শিবিরের সংগঠকেরা। তিনি পায়ে চলা পথ ধরে ধানখেতের ভেতর দিয়ে হেঁটে চলেছেন। শরতের এই দৃশ্যটা অপূর্ব। দুই পাশে ধানখেতে বাতাস বয়ে চলেছে। আজি ধানের খেতে রৌদ্রছায়ায় লুকোচুরির খেলা। বড়খাতা রণাঙ্গনে চলেছেন তাঁরা। হিমালয়ের কাছে এই এলাকায় এরই মধ্যে শীতের বাতাসও বইতে শুরু করে দিয়েছে। মর্টার আর রাইফেলের আওয়াজও কানে আসছে। তারা গিয়ে পৌঁছালেন বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর ডিফেন্স লাইনে। সারি সারি বাংকার। মেশিনগান পোস্টের পেছনে বাংলার তরুণ মুক্তিযোদ্ধা। তাদের শক্ত চোয়াল, কোটরাগত চোখে বিদ্যুতের ঝলক। রাইফেল কাঁধে সদা প্রস্তুত সারি সারি যোদ্ধা। দুরবিনের পেছনে চোখ রেখে দূরে শত্রুর গতিবিধি লক্ষ করছেন একজন।
