ব্যাঙ্গমি বলে, হ। আর চাইর বছর পর।
.
জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা গেছেন। আবু সাঈদ চৌধুরী, সংসদ সদস্য আবদুস সামাদ আজাদ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, ফণীভূষণ মজুমদার, আবদুস সুলতান, এম আর সিদ্দিকী, সিরাজুল হক, ডা. আসহাব-উল হক জোয়ারদার, ফকির শাহাবুদ্দীন, ড. মফিজ চৌধুরী, ড. এ আর মল্লিক প্রমুখ। আবু সাঈদ চৌধুরী গেছেন লন্ডন থেকে। আমেরিকা থেকে যোগ দিচ্ছেন এ এম এ মুহিত, এস এ করিম, আবুল হাসান মাহমুদ আলী, আবুল ফতেহ।
তাদের তো আর সদর দপ্তরে স্বাভাবিক প্রবেশাধিকার নেই। তারা ভিজিটর হিসেবে ঢুকবেন। ভারতের কাছ থেকে ভিজিটর পাস নেওয়া ঠিক হবে না। তাহলে পাকিস্তান বলবে, ওরা ভারতের দালাল। তারা যোগাযোগ করতেন জাতিসংঘ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ভারতীয় বাঙালি সাংবাদিক জি কে ব্যানার্জির সঙ্গে। তাঁদের অতিথি হিসেবে তাঁরা জাতিসংঘ দপ্তরে ঢোকেন।
একদিন ড. এ আর মল্লিক কয়েকজন বাঙালি প্রতিনিধিসহ দাঁড়িয়ে আছেন সদর দপ্তরের নিচের তলায়। সামনের রাস্তা দিয়ে গাড়ি ছুটে চলেছে।
তখন তারা দেখতে পেলেন, ইয়াহিয়া খানও পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করতে পাঠিয়েছেন কজন বাঙালিকে, তাঁরাও জাতিসংঘের সদর দপ্তরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা সহজেই চিনতে পারলেন রাজাকারগুলোকে–শাহ আজিজুর রহমান, মাহমুদ আলী, রাজিয়া ফয়েজ।
এর মধ্যে রাজিয়া ফয়েজ এগিয়ে এলেন এ আর মল্লিকের দিকে। এসে বললেন, আপনার সঙ্গে কি আলাদা করে একটু কথা বলা যাবে।
আলাদা করে? আচ্ছা। রাতে হোটেলে আসুন।
রাতে রাজিয়া ফয়েজ এলেন এ আর মল্লিকের সঙ্গে দেখা করতে।
এ আর মল্লিক বললেন, বসেন। চা খাবেন না কফি? হোটেল রুমে চা কফি বানানোর যন্ত্র আছে।
রাজিয়া ফয়েজ বললেন, চা-কফি কিছুই খাব না। আপনি একজন ভাইস চ্যান্সেলর। যে সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মতো নগণ্য লোক, তার আনুগত্য কীভাবে স্বীকার করলেন?
এ আর মল্লিক বললেন, আপনার মতো একজন শিক্ষিত মহিলা যে ভেতরে-ভেতরে অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট, এটা আপনার এই কথাতেই স্পষ্ট। গণতন্ত্রে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের স্থান বুদ্ধিজীবী হোন, প্রফেশনাল হোন, জেনারেল হোন, তাদের সবার চেয়ে উঁচুতে। এটা আমেরিকাতেও। এটা ভারতেও। ভারতের ইন্দিরা গান্ধী তো পাস করা গ্র্যাজুয়েট না। কিন্তু তাঁর। কথায় সব পিএইচডিরা, জেনারেলরা ওঠবস করে। এটাকেই বলা হয় গণতন্ত্র। আপনি যে ইয়াহিয়া খানের মতো একটা অশিক্ষিত মিলিটারিম্যান, যে ২৪ ঘণ্টা মদ আর মেয়েমানুষ নিয়ে পড়ে থাকে, তার আনুগত্য প্রকাশ করতে এসেছেন, এর দ্বারা বোঝা যাচ্ছে আপনার মানসিকতাই গণতান্ত্রিক। নয়। আপনি শিক্ষিতও নন।
রাজিয়া ফয়েজ চুপ করে গেলেন।
তারপর আস্তে আস্তে বললেন, আমি আসলে আসতে চাই নাই। আমি ৭ মাসের প্রেগন্যান্ট। বুঝতেই পারছেন। আমাকে ভয় দেখিয়ে পাঠিয়েছে।
এ আর মল্লিক বললেন, আপনি ভুল করেছেন। বাংলাদেশ আর কিছুদিনের মধ্যেই স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানি মিলিটারির মনোবল যে
তলানিতে ঠেকেছে, সেটা আপনি টের পান না?,
হ্যাঁ। ট্রাকে ট্রাকে মিলিটারির ডেডবডি যাচ্ছে, আমি দেখেছি। ট্রাকের নিচ থেকে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত ঝরে। রাস্তায় পড়ে থাকে। সেসব লাশ কফিনে পুরে পশ্চিম পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
আপনি অনেক বড় ভুল করেছেন। যান, দেশে চলে যান।
.
ব্যাঙ্গমা বলবে, ১৬ ডিসেম্বরের পর শাহ আজিজ, রাজিয়া ফয়েজরে জেলে ভরা হয়। আর বীর উত্তম জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হইয়া হ্যাঁগো মন্ত্রী বানান। শাহ আজিজ প্রধানমন্ত্রী, রাজিয়া ফয়েজ মহিলা মন্ত্রী। আরেক রাজাকার মশিউর রহমান যাদু মিয়াকে প্রথমে বানান হইছিল সিনিয়র মিনিস্টার। জিয়াউর রহমানের সমস্যাটা আছিল কী?
৬৬
শেখ কামাল প্যারেডে লাইনে দাঁড়ানো। তার পরনে খাকি ইউনিফর্ম। আজ তারা সেকেন্ড লেফটেন্যান্টের ব্যাজ লাভ করবেন। তাদের ওয়ার কোর্স মিলিটারি ট্রেনিং শেষ হয়ে যাচ্ছে। তারা বেশ উত্তেজিত। বন্ধুদের সবাই। এত দিন একসঙ্গে ছিলেন। কারও নাম প্যাঁচা, কারও চিপা, কারও নাম চিকা। মজাই হয়েছে এই ট্রেনিংয়ে। যদিও যুদ্ধক্ষেত্রের প্রয়োজনে ১৮ সপ্তাহের ট্রেনিংকে ১৫ সপ্তাহে কমিয়ে আনতে হয়েছে। এখান থেকে সবাই যুদ্ধের ময়দানের চলে যাবে। এই কোর্সে প্রথম স্থান অধিকার করেছে সাইদ।
বড় দুটো ঝোলানো গোঁফ, মাথায় গোল ক্যাপ, ফুলহাতা জলপাই রঙের জামা, আর ট্রাউজার পরা সেনাপ্রধান ওসমানী আগেভাগে এসেছেন। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনসহ মন্ত্রিপরিষদ চলে এসেছে। সৈয়দ নজরুল প্যারেড পরিদর্শন করে সালাম গ্রহণ করলেন। তারপর সাইদ রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সার্টিফিকেট গ্রহণ করলেন।
সৈয়দ নজরুল ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, বর্ষাকালে আমাদের যুদ্ধকৌশল ছিল হিট অ্যান্ড রান। এবার আমরা প্রস্তুত। এবার আমরা সব রণাঙ্গনে একযোগে হামলা করব। সম্মুখযুদ্ধ করে শত্রুবাহিনীকে বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করব। আমাদের জেন্টলম্যান ক্যাডেটদের পরের ব্যাচের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে সালাম গ্রহণ করবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর সে কুচকাওয়াজ হবে ঢাকায়। বাংলাদেশ পৃথিবীর মানচিত্রে মর্যাদা নিয়ে আছে, আর চিরদিনই থাকবে।
