পায়ে চলা পথ দিয়ে একসার গ্রামবাসী বাক কাঁধে দুই পাশে বড় বড় হাঁড়ি ঝুলিয়ে চলেছে।
তাজউদ্দীন বললেন, ওদের কাঁধে কী?
স্থানীয় লোকজন বললেন, বাউংকা।
ওর মধ্যে হাঁড়িতে কী?
খাবার। গ্রামবাসী মুক্তিযোদ্ধাদের পোস্টে পোস্টে খাবার পৌঁছিয়ে দিচ্ছেন। এখানে তো ক্যাম্প থেকে এত মাইল দূরে খাবার এনে দেওয়া সম্ভব না। সবখানেই আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যখন গ্রামে যান, হাইড আউটে থাকেন, গ্রামবাসী জানামাত্রই তাদের জন্য খাবারদাবার দিয়ে যান। দেশবাসী সাধারণ মানুষেরা যে কী সাপোর্ট দিচ্ছেন আর কী পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করছেন, তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।
তাজউদ্দীনের চোখে জল এল। তিনি বাংকারে বাংকারে গেলেন, প্রতিটা যোদ্ধাকে জড়িয়ে ধরলেন। একটা অল্পবয়সী ছেলের হাতে সাব-মেশিনগান। তাজউদ্দীন বললেন, এই খোকা, তোমার বয়স কত?
আঠারো।
না, তুমি আঠারো নও। তুমি ফিরে যাও। ক্যাম্পে গিয়ে সবাইকে সাহায্য করো। তোমার যুদ্ধের ময়দানে আসার দরকার নাই।
ছেলেটা কেঁদে ফেলল। বলল, স্যার মুই যুদ্ধ করুম। মোক ফেরত না পাঠাইবেন, স্যার। মোক বাদ না দিবেন।
তাজউদ্দীন তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, কেউ তোমাকে ফেরত দেবে না। থাকো তুমি।
সেক্টর কমান্ডার বাশার জানালেন, এই ছেলে সাতটা যুদ্ধে অসমসাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে।
যুদ্ধের মাঠে প্রধানমন্ত্রীকে দেখে মুক্তিবাহিনী চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মুজিব ব্যাটারি, বাংলার আর্টিলারি বাহিনী, কাঁধে মর্টার নিয়ে যারা যুদ্ধক্ষেত্রে লড়ে থাকে, তারা তাদের দক্ষতা দেখানোর এই সুযোগ ছাড়বে কেন। তারা মর্টার চার্জ করল। ভীষণ শব্দ হলো। তাজউদ্দীন বাইনোকুলার চোখে লাগালেন। চার শ গজ দূরে শত্রুর বাংকার। সেখানে তাদের নড়াচড়া শুরু হয়ে গেছে।
আবার হেঁটে হেঁটে ক্যাম্পের দিকে ফিরছেন তাজউদ্দীন। মুক্ত অঞ্চলের গ্রামবাসী খবর পেয়ে ছুটে এসেছে পথের ধারে। নারী, পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ। তারা স্লোগান দিচ্ছে জয় বাংলা। তিনি পথের মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে জনতার উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। আমরা জয়লাভ করতে যাচ্ছি। আপনাদের দুঃখের দিন শেষ হতে চলেছে। দোয়া করবেন। জয় বাংলা।
রাত আটটায় পৌঁছালেন পাটগ্রাম। সেখানে হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করছে তার জন্য। তিনি জনসভায় ভাষণ দিলেন। জয় বাংলা স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত।
পাটগ্রাম বেশির ভাগ সময় মুক্ত। এখানে বাংলাদেশ সরকারের অধীনেই সব চলছে। পোস্ট অফিস আছে, পুলিশ স্টেশন, বালিকা বিদ্যালয়, আওয়ামী লীগ অফিস। এখান থেকে পত্রিকা বের হয়। আর আছে এদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক দল।
রাতের বেলা তারা খাওয়াবেই। তাজউদ্দীন মুক্ত অঞ্চলে বসে সবার সঙ্গে খেলেন। এবার তাঁরা জিপ নিয়ে যাবেন বুড়িমারী। সেখানেই ক্যাম্পে রাত কাটানোর প্ল্যান। কিন্তু পাটগ্রামবাসী ধরে বসেছে। তাদের আছে বিপ্লবী সাংস্কৃতিক পরিষদ। তারা অনেক রিহার্সাল করে রেখেছে। তাদের বড় শখ : প্রধানমন্ত্রীকে তারা অনুষ্ঠান দেখাবেন।
তাজউদ্দীন রাতে থাকলেন হাশর উদ্দীন উচ্চবিদ্যালয়ে। সকাল আটটায় থানা মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলো। প্রধানমন্ত্রী বসে পুরো অনুষ্ঠান। দেখলেন। গণহত্যা এবং বাংলার প্রতিরোধ নিয়ে শিল্পীরা একটা গীতিনকশা
পরিবেশন করলেন। প্রথমে রংপুর বেতারের ভাওয়াইয়া শিল্পী মোহাম্মদ সিরাজউদ্দীন গলা খুলে গাইতে শুরু করলেন :
দেশ হামার স্বাধীন বাংলারে,
হামার জন্মস্থান এই দেশেতে,
মহান নেতা মুজিবুর রহমানরে।
কারার ওই লৌহ কবাট, রুখে দাঁড়াও, রুখে দাঁড়াও থাকিতে প্রাণ, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, ছোটদের বড়দের সকলের, আবার আসিব ফিরে, তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে…একের পর এক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান গাইলেন তাঁরা।
সবশেষে শিল্পীরা গাইতে শুরু করলেন, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি…।
সবাই দাঁড়িয়ে তাদের সঙ্গে গলা মেলালেন। এ এমন একটা গান, যেটা গাইতে গেলে চোখের পানি আটকানো যায় না।
আবার জিপে চড়ে তারা ছুটলেন ভূরুঙ্গামারী ফুলবাড়ী রণক্ষেত্রে। ভূরুঙ্গামারী যাওয়ার পথে গাড়িবহরের একটা জিপ রাস্তা থেকে ছিটকে পড়ে গেল পাশের খাদে। তাতে ছিলেন ক্যামেরাম্যান আসিফ আর আলম। তাজউদ্দীন বললেন, জিপ থামান।
তাঁরা নেমে ছুটতে লাগলেন জিপের দিকে। একগলা পানি থেকে আসিফ, আলম, ড্রাইভার উঠে এলেন ডাঙায়। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, আমরা ভালো আছি। তাঁদের জড়িয়ে ধরলেন তাজউদ্দীন। তাঁর নিজের কাপড় ভিজে যেতে লাগল।
ভূরুঙ্গামারী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে তারা যখন পৌঁছাচ্ছেন, তখন সূর্য পশ্চিম দিগন্তে একটা ডিমের কুসুমের আকার নিয়েছে, আকাশে সার বেঁধে পাখি উড়ে উড়ে ফিরে যাচ্ছে নীড়ে, গরুর দল নিয়ে রাখাল বাড়ি ফিরছে, গরুর খুরে খুরে ধূলি উড়ছে। ভূরুঙ্গামারীতে হাজার হাজার মানুষ অপেক্ষা করছে তাজউদ্দীনের জন্য। সেখানে তাঁকে ভাষণ দিতে হলো। গেলেন ক্যাম্পে। হাত মেলালেন মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণার্থীদের সঙ্গে।
রাতের বেলাই তিনি চললেন ডিফেন্স লাইনে। নেতারা বললেন, না, যাওয়ার দরকার কী! দুই মাইল দূরেই পাকিস্তানি ডিফেন্স লাইন। যেকোনো
